বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪ ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ভাসমান মানুষের জীবন ব্যবস্থা
রাশেদুজ্জামান রাশেদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৩, ২:২৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

.

.

চলন্ত ট্রেনের কর্মীদের ডাকহাঁক। কফি লাগবে কফি? পানি লাগবে পানি? বিরানি লাগবে বিরানি? ট্রেনের যাত্রীরা যে যার পছন্দ মত কফি, পানি ও বিরানিসহ নানা রকমের খাবার কিনে খাচ্ছে। ট্রেনের মধ্যে ভালোই  বেচা বিক্রি চলছে। ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলছে ট্রেনের বাড়ি কমলাপুর। তবে ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হিমেল ঠাণ্ডা হাওয়া আর বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবে সন্ধ্য ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই চারিদিকে ঘুটঘুটে আঁধার। দূরের ল্যাম্প পোস্টের আলো মিটমিট করে জ্বলে দেখতে কার না ভালো লাগে! এ দৃশ্য দেখে মনে পড়ে গ্রামীণ জনপদে রাতের আধারে বাঁশবাগানে জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলোতে ঝিঝির পোকার নৃত্য। তেমনি রেল লাইনের দূরের ল্যাম্প পোস্টোর আলোতে নাচছে কিশোরীর দল।

কিশোরীদের চুলগুলো এলোমেল। ভাষা গুলো আঞ্চলিক ভাষায় তা বুঝা একটু কষ্টকর। পরনে ময়লা ছেড়া কাপড়। ঠোঁট গুলো লাল টুকটুকে। এ লাল ঠোঁট কোনো লিবিস্টিকের জন্য। তাদের নেই কোনো ঘরবাড়ি। যেখানে যায় সেখানে তাদের বাড়ি। তাই এরা ভাসমান। ফলে কোনো দোকানের কাজ থেকে চেয়ে খেয়েছে পান সুপারি। সেই পান সুপারির রঙে ঠোঁট দুটো লাল টুকটুকে হয়েছে। এ মানুষ গুলোর স্থায়ী ঠিকানা কবে হবে কে জানে? তাদের স্থায়ী ঠিকানা না হলেও নিজের ভাবনা গুলো স্থায়ী করতে বড় ইচ্ছে হয়। কিন্তু পৃথিবীতে স্থায়ী বলতে কোনো কিছু নেই। বিবর্তনের এজগৎতে সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে। কারো পরিবর্তন ধীর গতিতে আবার কারো পরিবর্তন দ্রুতগামী হয়।

তেমনি পুঁজিবাদের বিকাশ এক দিনে হয়নি। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকে বর্তমান ডিজিটাল সমাজ পরিনত হওয়ার পেছনে প্রত্যেকটি সমাজের মানুষের রয়েছে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম। পৃথিবীতে ঠিকে থাকার জন্য সংগ্রাম চলে অবিরাম। প্রত্যেক প্রাণী নিজের প্রজাতির সাথে সারাক্ষণ প্রতিযোগীতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে। যার প্রতিকূলার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা যত বেশি তার জীবন তত উন্নত হওয়ার কথা কিন্তু বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় চিত্রটা ঠিক উল্টো দেখা যায়। উল্টো চিন্তার কারণে অনেকেই গুরুত্ব দেয় না। আবার কেউ কেউ পাগল বলে অভিহিত করে। সমাজে অর্থনৈতিক সাম্যের চিন্তা করা কিংবা মানবমুক্তির চিন্তা করে যদি কেউ পাগল তা মেনে নিতে অসুবিধা নেই।

সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া রিপন বাবুদের জীবন একটু অন্য ভাবে লেখার মাধ্যমে ফুটে তোলার ক্ষুদ্র প্রয়াস চলছে। ট্রেনে বসে লেখা হচ্ছে আমাদের দেশের ভাসমান মানুষের জীবন কেমন হয়? দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জীবন কেমন করে চলে? তারা কেমন করে শিক্ষা অর্জন করে, তারা কেমন চিকিৎসা পেয়ে থাকে। ট্রেনের গন্তব্যের সাথে তাদের জীবন তুলনা করি। আমার ট্রেন ভ্রমণের শেষ ঠিকানা ঢাকা কমলাপুর স্টেশন। কিন্তু অগোছালো ভাবনার কোনো গন্তব্য নেই। মনের মধ্যে জেদ নিয়েছি এখন থেকে কিছু ভাবনা স্থির করব।  ট্রেনের ভ্রমণে এসে ট্রেনের মধ্যে শাসক হতে চাই! হয়তো প্রশ্ন তুলবেন এ আবার কেমন শাসক? চিন্তার কারণ নেই সাধারণ জনগণকে শোষণ করা শাসক নই। মানুষের মনের কথা লুট করা একজন শাসক।

মানুষের মনের কথা গুলো কখনও কখনও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতে পারে। সেই সম্পদ লুণ্ঠন করা কিংবা শোষণ করা বড় বুদ্ধির কাজ।  সম্পদ চুরি করা ব্যক্তি হিসেবে বর্তমানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে ভাবছি। নিজেকে নিয়ে কার না গর্ব করতে ইচ্ছে করবে না একজন সেরা শাসক হিসেবে। অবেশেষে এই যাত্রায় মানুষের মনের খবর নিতে এবং মনের কথা চুরি করতে মিশনে নামলাম। ট্রেনের প্রথম বগি থেকে প্রায় শেষ বগি পর্যন্ত হাটতেছি। আর ভাবছি! ট্রেনের প্রত্যেকটি যাত্রীর মনের ভাবনা গুলো একত্র করে নিজের মত করে ভাবতে থাকব। তারপর তাদের প্রত্যেক ভাবনা গুলো নিজের মত করে নতুন এক ভাবনা তৈরী করে প্রত্যেকের মাঝে বিলিয়ে দিব। এর পর প্রতেক্যেই আমরা দেওয়া ভাবনা গুলো ভাবতে থাকবে। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করবে। কিন্তু ভাবনা গুলো সব মরে গেলে!

সব ভাবনা আশায় গুড়ে বালি। চিন্তা শেষ হতে না হতে চোখে পড়ে এক ছোট্ট ছেলে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম তোমার নাম কি? সে উত্তরে বলল আমার নাম রিপন বাবু। বাড়িতে সবাই তাকে বাবু বলে ডাকে। কয় ভাই জানতে চাইলে, রিপন বাবু বলে সে আর তার বড় বোন আছে। তারপর প্রশ্ন না করতে বলে বাড়িতে মা ও বাবা আছেন। মা গৃহিণী আর বাবা দিনমজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। এবারে তার বোন লিজা আক্তার এসএসসি পরীক্ষায় ৪.৬১ পয়েন্ট পেয়ে পাশ করছে। তার পাশ করার আনান্দে গ্রামের সবার মুখ উজ্জল হয়েছে। কারণ সে বিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী ছিল। বিদ্যালয়ের অনেকেই তাকে অঙ্কের জাহাজ বলেও ডাকে। কিন্তু এত কিছু মুখে বলার পর রিপন বাবুর কপালে ভাজ পড়ে। কারণ তার চিন্তার কোনো শেষ নেই। অভাবের সংসার। তার জন্মের পর থেকে বাবামা তার অনেক চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে পারেনি। তাদের সংসারে অভাব জেকে বসেছে। এ অভাবের গতি অসীম।

 অষ্টম শ্রেণির পাটি গণিতে কিছু বর্গমূলের ফলাফল দেখে মনে হয় এর ফলাফল কখনও শেষ হবে না। তখন বাধ্য হয়ে বলতে হয় অঙ্কটি অমূলদ সংখ্যা। ঠিক তেমনি রিপন বাবুর বাবার সংসারের ফলাফল দেওয়া যায় অমূলদ সংসার। তবে অমূলদ শ্রেণির পরিবার গুলো আমার ভাষায় এ গুলো সর্বহারা শ্রেণি। এ শ্রেণির মানুষের দুঃখ দুর্দশা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। ট্রেনে যতবার উঠেছি ততবার দরজায় সামনে রিপনের মত শত শত ছোট্ট কিশোরকে দেখেছি জরাজীর্ণ শরীর আর ছেঁড়া কাপড় পরা। তাই ওভাবে রিপনকে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কিন্তু আমি যে বড় শাসক। মানুষের মন লুট করা আমার স্বভাব।

হুবহু করে বাতাস ট্রেনের দরজায় দিয়ে বাতাস ভিতরে প্রবেশ করছে। গায়ে হালকা পোশাক। ওর ঠাণ্ডা হাওয়া সহ্য করা জন্মগত স্বভাব। হুহু করে প্রবেশ করা বাতাস তাকে কাবু করতে পারছে না। সে তাকিয়ে আছে কালো আধারের দিকে। আর সাথে কাঁধে ঝুলানো আছে স্কুল ব্যাগ। এ ব্যাগের স্কুলের কোনো জিনিসপত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে ব্যাগে তার জীবন যুদ্ধের আয়োজন আছে। এ যাত্রায় তাকে যে সফল হতেই হবে। ক'দিন আগেই সে তার স্কুলের ৭ম শ্রেণির সব কয়েকটি বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করেছে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠার চিন্তা মাথায় না রেখে খুঁজছে জীবন বাঁচার পথ। ট্রেন থামল।

সে চলে যাচ্ছে কমলাপুর স্টেশন থেকে কারণ তার অপেক্ষায় আছে তার চাচাতো ভাই। তাকে নিয়ে যাবে ময়মনসিংহে। সেখানে কাজে লাগিয়ে দিবে। স্বাধীনতার ৫২ বছরে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে। আর বেড়েছে বিদেশে টাকা পাচারকারীর সংখ্যা, বেড়েছে গরিব মানুষের অর্থনৈতিক সংকট। আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছি য়েখানে লাখ লাখ পশুশিশু পথে ঘুরে বেড়াবে? শিক্ষার সুযোগ না পেয়ে এভাবে কি তারা অন্ধাকার পথ বেঁছে নিবে? চিকিৎসার অভাবে, খাদ্যের অভাবে আর কত কাল অপুষ্টিতে ও বাল্যবিবাহের শিকার হবে? মৌলিক অধিকার তারা কবে পাবে? রাষ্ট্রে কাছে প্রশ্ন করার অর্থ হচ্ছে সংকট সমাধাণের পথ খুঁজবেন। যাতে করে চলন্ত ট্রেনে আর কোনো ভাসমান কিশোরীদের দলকে দেখতে না হয়। শিশু শ্রম যাতে দেখতে না হয় তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।



লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট ।

ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com