বুধবার ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২৫ মাঘ ১৪২৯

জীবনে এ প্লাস পাওয়াটাই কি সব
মেহেদী হাসান নাঈম
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২২, ৩:০৪ পিএম আপডেট: ২৮.১১.২০২২ ৩:৫৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

জীবনে এ প্লাস পাওয়াটাই কি সব

জীবনে এ প্লাস পাওয়াটাই কি সব

সাধারণত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা হয়। পরীক্ষার ফলাফল যদি ভালো হয় বা শিক্ষার্থী যদি তথাকথিত এ প্লাস পায় তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেই শিক্ষার্থী মেধাবী।  আর কোনো কারণে যদি কোনো শিক্ষার্থী এ প্লাস না পায় তাহলে মনে করা হয় যেই ছাত্র বা ছাত্রী মেধাবী নয়। কিন্তু এ প্লাস নামক যে ভয় আমরা সন্তানদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছি, তা তাদের মানসিকতায় কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে সেটা কি কখনো ভেবেছি?

আমাদের অভিভাবকদের এ প্লাস রোগ হয়েছে। অনেকটা এমন যে সন্তান যদি এ প্লাস না পায়, তিনি পাশের বাসার ভাবির সামনে মুখ দেখাতে পারবেন না। মা-বাবাদের বুঝতে হবে জীবনে এ প্লাস পাওয়া মানের সব নয়। জীবনটা অনেক বড়। দয়াকরে এ প্লাসের মধ্যে জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখবেন না। আজকের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল কিছুদিন পর কেউ জানতেও চাইবে না। শুধু এসএসসি নয় উচ্চমাধ্যমিকেও জিপিএ ৫ না পেয়ে রিতিমত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে অনেকে। লেখা পড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমেও তাদের সফলতা ঈর্ষণীয়। শিক্ষাবিদরা মনে করেন তথাকথিত ভালো ও খারাপ ফলাফল নিয়ে অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম রাফি। এসএসসি পরিক্ষায় তার জিপিএ ছিল ৪.৩১ এবং এইচএসসি পরিক্ষায় জিপিএ ছিল ৪.৭৫। একই বিশ্ববিদালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রুবেলের এসএসসি পরিক্ষায় জিপিএ ছিল ৪.৫০ এবং এইচএসসি পরিক্ষায় জিপিএ ছিল ৪.৯০। রাফি বা রুবেলের মতো শত শত শিক্ষার্থীর দৃষ্টান্ত আমরা দেখাতে পারি যারা এ প্লাস না পেয়েও সফল হয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে জিপিএ ৫ না পাওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তারা দেখিয়ে দিয়েছে এভাবে ফিরে আসা যায়। প্রমাণ করেছে সঠিক শিক্ষা ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য  থাকলে সফলতা আসবেই।

মুদ্রার উল্টা পিঠও আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরিক্ষায় এ প্লাস পেয়েও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাইনি এমন হাজারো শিক্ষার্থী আছে। অভিভাবকদের এগুলো বুঝতে হবে। তারা যখন সন্তানদের এ প্লাস পেতেই হবে এমন কথা বলেন, সেটা অনেকটা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তখন সন্তানরা পড়াটাকে উপভোগ করতে পারে না। সব সময় জিপিএ ৫ এর অশুভ আত্মা যন্ত্রনা দেয়। যা বাধাগ্রস্থ করে স্বাভাবিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশকে।

আমাদের বুঝতে হবে পাঠ্য বইয়ের বাহিরেও একজন শিক্ষার্থীর অনেক কিছু জানার আছে , অনেক কিছু শেখার আছে। জিপিএ ৫ শুধু পাঠ্য বই কেন্দ্রিক। জিপিএ ৫ পেতে গিয়ে সন্তান বাহিরের বিশাল জগৎকে হাড়াচ্ছে কিনা সে খবর কি আমরা রেখেছি? আমি বলছিনা যে জিপিএ ৫ বা তথাকথিত এ প্রাস না পেলেও হবে। তবে এ প্লাস কখনো মেধা মাপকাঠি হতে পারে না। জিপিএ ৫ না পেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিব, প্রায়ই এমন কথা অভিভাবদের কণ্ঠে স্থান পায়। ফলে কোনো কারণে যদি ফলাফল জিপিএ ৫ না আসে ছেলে-মেয়েরা ভয়ে নানা রকম বিপদজনক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়। প্রায় প্রতি বছর পরিক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীর আত্নহত্যার সংবাদ পাওয়া যায়। এর দায় কি অভিভাবকরা এড়াতে পারবে?  

২০১৮ সালে এসএসসি পরিক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ২২ জন কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এদের মধ্যে ১০ জন মারা যায়। মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০২০ এর ফলাফল প্রকাশ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২১ জন কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এদের মধ্যে ১৯ জনই ছিল কিশোরী। একই বছর জানুয়ারি মাসে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও নিম্ন মাধ্যমিকের (জেএসসি) সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে ১৭ জন শিশু আত্মহত্যা করে। এই পরিসংখ্যানগুলো সাধারণ কোনো তথ্য নয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ সেই শিক্ষার্থী তারাই কিনা আত্নহত্যার মতো চরম ভয়াবহ পথ বেছে নিচ্ছে। বার বার অভিভাবকদের প্রসঙ্গ চলে আসে। কারণ হলো তারাই পারে নিজেদের সন্তানকে অভয় দিতে। তোমাকে এ প্লাস পেতে হবে না। তুমি মন দিয়ে পড়, প্রকৃত শিক্ষা লাভ কর। এমন কথা খুব কম বাবা-মাই তাদের সন্তানদের বলেছে। যদি সব বাবা-মা সন্তানদের এমন উৎসাহ দিত, তাহলে ফলাফল কাঙ্খিত না হওয়ার পর আর কোনো প্রদ্বীপ নিভে যেত না।  

আসুন সচেতন হই। সাময়িক কোনো বিষয়কে মেধা যাচাইয়ের মাপকাঠি না বানিয়ে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে সন্তানদের উৎসাহ দেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন বলেছেন “আপনি একজন ভালো সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আপনার সন্তানের জীবন আপনার কাছে নিশ্চয় এ প্লাসের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।” তাই সচতেনতা শুরু হোক আমি আর আপনি থেকে। আর একটি প্রদ্বীপও যেন অকালে নিভে না যায় এখন থেকেই সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।


লেখক: শিক্ষার্থী ,সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।



ডেল্টা টাইমস্/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]