শনিবার ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২০ মাঘ ১৪২৯

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আশা জাগাচ্ছে রেমিট্যান্স
মোঃ রিফাত খান:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২, ৪:৩১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

.

.

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। দেশের নাগরিক যখন বিদেশে কর্মরত থেকে দেশে অর্থ পাঠায় সেই পাঠানো অর্থকেই রেমিট্যান্স বোঝায়। অধিক বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ, উন্নত জীবনযাপন এবং পরিবার পরিজনদের সুখে রাখার আশা চিন্তা করেই মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে  ভীনদেশে পাড়ি জমায়। এসব প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের মাথাপিছু আয় এবং মোট জিডিপিও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশকে। বিশ্বের অনেক স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আদর্শ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশকে। মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাতের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দামামায় টালমাটাল বৈশ্বিক অর্থনীতি। যুদ্ধের কারণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে। এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো অবস্থা আরো নাজুক। মন্দার হুমকিতে আছে তারা তবে এর মধ্যে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থানে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এই অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ে পৃথিবীর শীর্ষ দশে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। এসকল প্রবাসীরা মূলত স্বল্পশিক্ষিত এবং তারা গ্রামের বাসিন্দা। যারা গত সাড়ে চার দশকে ২১৭ বিলিয়ন ডলার আয় দেশে পাঠিয়েছেন।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশেরও বেশি। রেমিট্যান্সের কল্যাণে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বর্তমানে শুধু রেমিট্যান্সের অর্থ দিয়েই ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। মূলত চারটি খাতে রেমিট্যান্সের ব্যবহার হয়ে থাকে। সেগুলো হচ্ছে প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ, দেনা পরিশোধ, বিনিয়োগ করা এবং যৌথ-বিমা। গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের ৫৬ শতাংশই আসে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার বেড়েছে। ২০১৬ সালের খানা জরিপ অনুসারে ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ খানার অন্তত একজন সদস্য প্রবাসী অভিবাসী। শহরের তুলনায় গ্রাম থেকে অভিবাসনের হার বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৯ সালের রিপোর্ট অনুসারে গ্রামে রেমিট্যান্সের ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ অর্থই ব্যয় হয় নিত্যপণ্য কেনায়। ২৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বিভিন্ন বিনিয়োগে, ২ দশমিক ১৩ শতাংশ বিভিন্ন টেকসই দ্রব্যের বিনিয়োগে এবং বাকি অংশ সঞ্চয়ে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে্র ক্ষেত্রে প্রবাসী পরিবারগুলো অধিক বিনিয়োগ করে। এরফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও রেমিট্যান্সের গুরত্ত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আশা জাগাচ্ছে রেমিট্যান্স

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আশা জাগাচ্ছে রেমিট্যান্স

গত অর্থবছরে (২০২১-২২) প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠান ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। তবে ইতিবাচক ধারা ফিরে আসে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, জুলাই মাসে এসেছিল ২০৯ কোটি ডলার আগস্ট মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২০৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৪১৩ কোটি ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। তবে দেশের ব্যাংক খাতে চলমান ডলার–সংকটের কারনে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে মাসে তা নেমে এসেছে ১৫০ কোটি ডলারে। এর ফলে অনেক অংশেই কমছে প্রবাসী আয়। এর কারণ হিসাবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে ডলারের বিনিময় মূল্য নিয়ে অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব জুড়েই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সের ওপরে।

এদিকে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধিতে সরকারের গৃহীত সময়োচিত প্রণোদনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। আগে এ প্রণোদনা ২ শতাংশ ছিল, তবে ২০২২ সালের প্রথম দিন থেকে তা বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয় এরপরও হুন্ডির প্রভাব কমছে না। প্রবাসীরা বাংলাদেশে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হুন্ডিকে প্রাধান্য দেয়। হুন্ডি হলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ব্যক্তিগত পর্যায়ের অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ পাঠানোর মাধ্যম। ২০০৬ সালে গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টের (জিইপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে পাঠানো প্রবাসী অর্থের ৫৬ ভাগই আসে হুন্ডির মাধ্যমে। তাই আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহারের জন্য সরকার এখন ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া অতীতের তুলনায় সহজ করার ফলে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। প্রবাসীরা যেন বৈধপথে দেশে টাকা পাঠাতে আরো বেশি উৎসাহিত হয় সে বিষয়ে সরকারের আরো কাজ করতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী বাংলাদেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তারা যথাযথ মূল্যায়ন পায় না। বিভিন্ন জায়গায় চরম অবহেলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন স্বল্পশিক্ষিত এই সকল ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’রা। তাদেরকে উচ্চ বেতন ও রাজকীয় জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে পাসপোর্ট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ডাক্তারি পরীক্ষা, ভিসা, ইমিগ্রেশন এবং বিমান ভাড়া ইত্যাদির কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণীর অতিলোভী দালাল চক্র। তারা এই সহজ-সরল মানুষগুলো বিভিন্ন চটকদার সুযোগ সুবিধার ও কাজের কথা বলে পাঠালেও তাদের কথা অনুযায়ী কাজ প্রদান করে না ফলে কাঙ্খীত মজুরি থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শোনা যায় এসকল প্রবাসী বাংলাদেশিরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সেখানে গিয়ে তারা অনেক সময় দুর্বিষহ ও দুর্দিন পার করছে। যখন তারা দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশের মাটিতে পা রাখেন তখনো শিকার হয় বঞ্চনা ও অবজ্ঞার। প্রথমেই সেই শিকার হয় বিমান থেকে নামার পর। তাদের সাথে সেখানে এক প্রকার তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই মূল্যায়ন করা হয়। বিমানবন্দরে এসব হয়রানি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশে ফেরার পর প্রবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক পর্যায়ে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অধিক গ্রহণযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে ।

যেহেতু, বিশ্ববাজারে শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই এই সুযোগকে আমাদের কাজে লাগিয়ে প্রবাসী আয় আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। দেশীয় শ্রমিকের বড় একটি অংশই যেহেতু অদক্ষ, তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। এতে করে তারা শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন পাবে। পাশাপাশি আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে । সরকার এসকল শিক্ষিত বেকারদের আধুনিক ও কর্মমূখী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের এই খাতে কাজে লাগাতে পারে। তাই এইখাতকে আরো এগিয়ে নিতে সময় উপোযোগী বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন। অতএব, সরকার যদি এই খাতকে কাজে লাগানোর জন্য আরো সুদূ্রপ্রসারী পরিকল্পনা ও রাষ্টীয়ভাবে পদক্ষেপ গ্রহন করে। সেই সাথে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রবাসী আয়ে প্রণোদনার পরিমাণ আরও বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমেও অর্থ পাঠানোর পরিমান আরো কমে যাবে। ফলে এইখাত থেকে আরো বিপুল পরিমান রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবে ।


লেখক: শিক্ষার্থী, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।



ডেল্টা টাইমস্/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]