বুধবার ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৮ মাঘ ১৪২৯

সিলগালার ৩ দিন পর ফের কারখানা চালু
বগুড়ার শেরপুর এখন ভেজাল পশু খাদ্য তৈরির রাজধানী!
শহিদুল ইসলাম শাওন, শেরপুর (বগুড়া) :
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২২, ৪:২৩ পিএম আপডেট: ২৯.১১.২০২২ ৫:০৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ভেজাল ও মানহীন পশুখাদ্য তৈরি করে পশু সম্পদ খাতকে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছে বগুড়ার শেরপুরের একটি চিহ্নিত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ভেজাল পশুখাদ্য তৈরি ও সরবরাহ করলেও লোক দেখানোর জন্য মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা ছাড়া প্রশাসন কার্যকর কোন উদ্যোগ নিচ্ছেনা। ফলে পশুখাদ্য বিধ্বংসী এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

অভিযোগ রয়েছে, পশু খাদ্য তৈরির প্রধান উপকরণগুলোই ভেজালে ভরপুর। বিশেষ করে ডিওআরবি ও রাইচ ব্রানে মেশানো হচ্ছে খাবার অযোগ্য পণ্যসামগ্রী। এমনকি মারাত্মক ক্ষতিকর কেমিক্যাল। দ্বিগুণ লাভের আশায় ভেজাল কারবারিরা পচা ডিওআরবি ও রাইচ ব্রানের সঙ্গে মেয়াদ উর্ত্তীণ আটা, স্লিকি, বালি মাটি, টাইলস’র এক প্রকার সিরামিক্সের ধুলা মিশিয়ে তৈরি করছে পশুখাদ্য। এই কারবারের মাধ্যমে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্রটি লাভবান হলেও ভেজাল খাদ্য খেয়ে গবাদি পশু, মাছ-মুরগি বিভিন্ন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়া নির্ধারিত দামে ভেজাল পশু খাদ্য কিনে লোকসান গুনছেন খামারিরা। ফলে এই পোল্ট্রি সেক্টর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তাঁরা।
 
বগুড়ার শেরপুর এখন ভেজাল পশু খাদ্য তৈরির রাজধানী!

বগুড়ার শেরপুর এখন ভেজাল পশু খাদ্য তৈরির রাজধানী!

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার রনবীরবালা ঘাটপার থেকে শালফা-বথুয়াবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ৪-৫টি গোডাউনে পশুখাদ্য তৈরির উপাদান ডিওআরবি ও রাইচ ব্রানে মেশানো হচ্ছে এক প্রকার সিরামিক্সের ধুলা ও ডলোচুন। যাতে করে ওই পণ্যটির ওজন বৃদ্ধি পায়। পরে সেটি স্থানীয় মজুমদার ফুড প্রোডাক্স ও ওয়েস্টান ওয়েল মিলের বস্তায় ভরে পশুখাদ্য তৈরির কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া শেরুয়া বটতলা থেকে ব্র্যাক-বটতলা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গোডাউন, তালতলা ফরেষ্টগেট হয়ে শেরুয়া বটতলা রোডের কয়েকটি গোডাউন, মির্জাপুর থেকে খানপুর রোডের একাধিক গোডাউন, মির্জাপুর হতে রানীরহাট এলাকায় এবং উপজেলার ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন গোডাউন, সাউদিয়া পার্করোডের কয়েকটি গোডাউনে একই চিত্র দেখা যায়। পরবর্তীতে পশুখাদ্য তৈরির এসব ভেজাল উপাদান ডিওআরবি ও রাইচ ব্রান কমিশনের ভিত্তিতে খাদ্য তৈরির কারখানায় ফিডমিলে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও এই ভেজাল উপাদান ব্যবহার করেই পশুখাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই এই উপজেলায় অন্তত অর্ধশতাধিক এই ভেজাল পশুখাদ্য তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।

সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিনটি ভেজাল পশু খাদ্য তৈরির সন্ধান পাওয়া যায়। পরে জরিমানাসহ কারখানাগুলো সিলগালা করে দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরমধ্যে খানপুর ইউনিয়নের শুবলী গ্রামস্থ জোয়াদ্দার পোল্ট্রি ফিড কোম্পানি সিলাগালাসহ পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা, মির্জাপুর বাজার ও ভীমজানি গ্রামস্থ শামিম হোসেনের মালিকানাধীন দুইটি কারখানা সিলগালাসহ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা। অভিযানের পর দুই থেকে তিনদিন বন্ধ রেখে আবারও নব উদ্যামে চালানো হচ্ছে কারখানাগুলোর কার্যক্রম। ভেজাল উপাদান, ক্ষতিকর কেমিক্যাল দিয়েই মাছ-মুরগি ও গবাদি পশুর খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে। যা পশুকে খাওয়ানোর পর কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং প্রাণিগুলো বিভিন্ন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে।

খামারি আতাউর রহমান ও আব্দুল মান্নান অভিযোগ করে বলেন, ভেজাল ও মানহীন পশুখাদ্যে বাজার সয়লাব হয়ে পড়েছে। এমনকি নামিদামি কোম্পানির প্যাকেটে ও লেভেল লাগিয়ে বিক্রি করায় কোনটি আসল আর কোনটি নকল সেটি চেনাই এখন কঠিন। অথচ এসব ভেজাল খাদ্যের প্যাকেটে লেখা নির্ধারিত দামেই কিনছেন তাঁরা। কিন্তু এসব খাদ্য খাওয়ানোর পর কাঙ্খিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে খামারের প্রাণিগুলো। তাই বিষয়টি গুরুত্বেও সঙ্গে দেখার জন্য প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী খামারিরা।

এদিকে সোলায়মান আলী ও শফিকুল ইসলাম নামে দুই ব্যবসায়ী জানান, ডিওআরবি ও রাইচ ব্রানের বাজার খুবই বেশি হওয়ায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী ওই দুই ধরণের পণ্যে ভেজাল দিচ্ছেন। তারা দ্বিগুণ লাভ করে রাঁতারাঁতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসার মাঠে আমরা ঠিকে থাকতে পারছি না। তাই আমরাও সেই পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছি। ভেজাল ডিওআরবি ও রাইচ ব্রানের প্রতিটি গাড়িতে (পনের টনের ট্রাক) বিশ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভবান হচ্ছেন বলে স্বীকার করেন তারা।

প্রাণি সম্পদ বিভাগের আইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আইন দিয়ে কি হবে? দুই মাস আগে অভিযান চালিয়ে তিনটি কারখানা সিলগালাসহ জরিমানা করা হয়। কিন্তু অভিযানের কয়েকদিন পরেই স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আবারও ওই ভেজাল পশুখাদ্য তৈরির কার্যক্রম শুরু করা হয়। তাই এহেন কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের অভিযান কার্যকর করার দাবি জানান। অন্যথায় এসব অভিযান কেবল লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রায়হান পিএএ জানান, এসব ভেজাল খাবার খাওয়ানোর পর পশু ফুডপয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়। সেইসঙ্গে মানহীন পশুখাদ্য কিনে খামারিরা প্রতারিত হচ্ছেন। কাঙ্খিত ফল না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। তাই বিষয়টি গুরুত্বের দেখা হবে। খোঁজখবর নিয়ে অনুমোদনহীন ভেজাল পশু খাদ্য তৈরীর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. সানজিদা সুলতানা এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, আমি এই উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি। তাই অনেক বিষয় এখনো অজানা। তবে এই ধরণের ভেজাল কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভেজাল পশুখাদ্য তৈরির কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলেও দাবি করেন তিনি।


ডেল্টা টাইমস্/শহিদুল ইসলাম শাওন/সিআর/জেড এইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]o.com