শনিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১৭ ফাল্গুন ১৪২৬

স্মৃতিপটে অমলিন পিকনিক ট্র্যাজেডি : বেনাপোলবাসীর শোক ও ভালোবাসায় ৯ শিশুর ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী কাল
বেনাপোল যশোর প্রতিনিধি:
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১:৪৭ পিএম আপডেট: ১৪.০২.২০২০ ৩:০৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বুকে তীর বিদ্ধ অবস্থায় উড়ছে ৯টি কবুতর। শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। আর পাশেই রক্তের স্রোতে বইয়ের বর্ণমালা মুছে যাচ্ছে। তাতে লেখা হয়েছে, ‘আমার বর্ণমালা তুমি ভালো থেকো।’ ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যশোরের বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি ৯ শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়। বেনাপোলে শনিবার দিনভর নিহত শিশু শিক্ষার্থীদের স্মরণ করে তাদের ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী পালন হবে।  সেদিন সকালে মায়ের কোলে বসে সাজুগুজু করে বাবার হাত ধরে পিকনিকের উদ্দেশে গাড়িতে চেপে বসেছিল এসব সোনামণিরা। সেদিন মুজিবনগরে পিকনিক শেষে বাসে বাড়ি ফেরার পথে যশোরের চৌগাছার ঝাউতলা এলাকায় পৌঁছলে তাদের পিকনিকের বাসটি উল্টে ২৫ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এদের মধ্যে ৬ জন ঘটনাস্থলে মারা যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিনের মাথায় মারা যায় আরো ৩ শিশু।

মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় এ অঞ্চল। প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রী শোকবার্তা দেন। মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিহত শিক্ষার্থীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও ৫ মিনিট নীরবতা পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। নিহত সেসব ছোট শিশুর রূহের মাগফেরাত কামনায় ১৫ ফেব্রুয়ারী সারা দেশের মতো চৌগাছা, শার্শা ও ঝিকরগাছার সব স্কুল-কলেজ গুলোতে সরকারিভাবে শোক আর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এদিনকে বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বেনাপোল শোক দিবস ঘোষণা করেন। অকালে ঝরে যাওয়া শিশুদের স্মরণে তিনি ওই বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করেন।
স্মৃতিপটে অমলিন পিকনিক ট্র্যাজেডি : বেনাপোলবাসীর শোক ও ভালোবাসায় ৯ শিশুর ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী কাল

স্মৃতিপটে অমলিন পিকনিক ট্র্যাজেডি : বেনাপোলবাসীর শোক ও ভালোবাসায় ৯ শিশুর ৬ষ্ট মৃত্যুবার্ষিকী কাল

ওই স্তম্ভ নিয়ে বেনাপোল পৌর মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, হারিয়ে যাওয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ছিল উড়ন্ত পাখির মতো। এরা একদিন বড় হয়ে দেশের সম্পদ হতে পারত। সেদিন তাদের বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আঘাত এত গুরুতর ছিল যে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি। আমি চাই, যুগ যুগ ধরে মানুষ তাদের স্মরণে রাখুক হারানো কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের। তাই তাদের নামে এ ধরনের স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে।  স্মৃতি স্তম্ভে সকল স্কুল কলেজ ও রাজনৈতিক সামাজিক ব্যাক্তিত্বরা ফুল দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাবেন।

তাদের স্মৃতিকে স্মরন করে বেনাপোলে আজ বিশাল শোক র‌্যালি বের হবে। শোক র‌্যালিতে বেনাপোলের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠন সহ এ অঞ্চলের সব সামাজিক রাজনৈতিক সংগঠন ও সাধারন জনগন অংশ নিবে। এর পর বেনাপোল বাজার এর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের স্মরনে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।  সেখানে শিশুদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করা হবে। এদিকে শিশুদের মৃত্যুর পর ৬ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত যেন শোক থামেনি নিহতদের পরিবারে। বিশেষ করে আনন্দ উৎসবের দিন এলে তাদের কথা মনে করে কাঁদেন স্বজনরা। আর মৃত্যুবার্ষিকী এলে প্রিয় সন্তানদের ছবি বুকে আঁকড়ে শোকে নিথর হয়ে পড়েন তারা।

ওই দুর্ঘটনায় নিহত মিথিলার মা রেখা বেগম প্রতিদিন একবার হলেও ছুটে যান সন্তানের কবরের পাশে। এ সময় মেয়ের স্মৃতি স্মরণ করে চোখে জলে ভরে যায়। এখানে দাঁড়ালে তিনি যেন বারবার মেয়ের মুখে মা ডাক শুনতে পান। কাঁদতে কাঁদতে বললেন রেখা বেগম। মিথিলা বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী এবং বাবা-মায়ের বড় আদরের সন্তান ছিল। শুধু মিথিলার বাবা-মা নয়। ছেলেমেয়ে হারানো সব পরিবারের অবস্থা একই।  এসব সন্তান হারানো বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল। তাদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে নিজের পরিবার ও দেশ গড়ার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু সে স্বপ্নপূরণ হওয়ার আগেই তাদের যেতে হয়েছে না ফেরার দেশে।

বেনাপোল পৌরসভার কাগজপুকুর গ্রামের সৈয়দ আলীর দুই মেয়ে সুরাইয়া ও জেবা। তারাও সেদিনের বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায়। মৃত্যুর আড়াই বছর আগে তারা তাদের মাকে হারিয়েছিল। এর পর থেকে তার বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত দুই মেয়ের আশ্রয় হয় বেনাপোলের ছোটআঁচড়া গ্রামে মামা সামাউলের বাড়িতে। সেখানে থেকেই তারা লেখাপড়া করত। মামা সামাউল বলেন, তারা খুব আদরের ছিল। আমি আমার ও বোনের সন্তানদের জন্য একই কেনাকাটা করতাম। আজ তারা নেই, তার পরও অনেক সময় ভুল করে তাদের জন্যও কেনাকাটা করে ফিরি!

নিহত সাব্বিরের বাবা সেকেন্দার একদিকে ছেলে হারানোর শোক অন্যদিকে বয়সের ভারে অসুস্থ। পেশায় ফুটপাথের মুড়ি ভাজা বিক্রেতা। আশা নিয়ে ছেলেকে পড়ালেখা করাচ্ছিলেন। এক সময় বড় হয়ে সে পরিবারের হাল ধরবে।  ভয়াবহ সেই সড়ক দুর্ঘটনা বেনাপোল, শার্শা ও চৌগাছার মানুষ আজো ভুলতে পারেননি। স্মৃতির পাতায় আজো অমলিন হয়ে আছে। এ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বেনাপোলসহ জেলা জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

ডেল্টা টাইমস্/মোঃ আনিছুর রহমান/সিআর/জেড এইচ


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]