শুক্রবার ২৯ মে ২০২০ ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

করোনাকালেও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি (পর্ব-০৪)
অধ্যক্ষ এস এম খায়রুল বাসার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২০, ১১:১০ এএম আপডেট: ০৭.০৫.২০২০ ১১:৩৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি (পর্ব-০৪)

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি (পর্ব-০৪)

প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, 
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে বিশ্ব আজ স্থবির। অন্যান্য বিষয়ের সাথে স্থবির বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা। ইউনেস্কোর সর্বশেষ তথ্য অনুয়ায়ী করোনার প্রকোপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাবার কারণে বিশ্বের ১৯১ টি দেশের প্রায় ১৫৮ কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্থ হযেছে, যা বিশ্বের মোট শিক্ষার্থীর ৯০.২০%। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও সংকটাপন্ন। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মিলে  আমাদের প্রায় পৌনে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আমাদের দেশে আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সকল ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। 

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে তিনি এও বলেছেন, যখন করোনার প্রকোপ থাকবে না, তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে। তবে এটা বলা যায়, প্রতিষেধক বা চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবনে যত দেরি হবে, মহামারির স্থায়িত্বকাল তত দীর্ঘায়িত হবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান  বন্ধের মেয়াদও ততটা বাড়বে।

প্রশ্ন হল, এই দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের তোমরা কি অলস সময় কাটাবে? এক কথায় উত্তর হল, না। দু’দিন আগে হোক আর  দু’দিন পরে হোক করোনার তাণ্ডব থেমে যাবে। জীবন তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। তখনকার হিসাব এখন থেকেই করতে হবে আমাদের। শিক্ষার্থীদের সর্বপ্রথম কাজ হবে, সংক্রামক ভাইরাস করোনা থেকে রক্ষা পেতে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে বাসা/বাড়িতেই অবস্থান করা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এমন খাদ্য গ্রহণ করা। নিয়মিত শরীর চর্চা করা, মাদক থেকে দূরে থাকা। করোনা থেকে নিজে সচেতন থাকা, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, সহপাঠি, বন্ধু-বান্ধবদের মোবাইলে বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে সচেতন করা, পিতামাতার কাজে সাহায্য করা, কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করা।

তবে তোমাদের ভুলে গেলে হবে না যে, তোমরা শিক্ষার্থী। তোমাদের মনে রাখতে হবে, তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ। করোনা পরিস্থিতি, করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি যাইহোক না কেন, তোমরাই জাতির ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে তোমাদের মধ্য থেকেই আমরা পাব একেকজন বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, দক্ষ প্রশাসক, উদ্যোক্তা, খেলোয়াড়, সমাজকর্মী, শিল্পি, কবি-সাহিত্যিক ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বকল্যাণে কাজ করতে হবে তোমাদের। এইজন্য তোমাদের নিজেদেরকে আলোকিত মানুষরূপে গড়ে উঠতে হবে। আলোকিত মানুষ হতে হলে এই দুঃসময়েও দৃঢ় মনোবল দিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে, করোনা থেকে সচেতন থেকে তোমাদের অধ্যবসায়ী ও সময়ানুবর্তী হতে হবে। 

তোমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন  ছুটি রয়েছে। ছুটিকালীন সময়ে পড়ালেখাকেও ছুটি দিয়ে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে একজন মনিষীর উপমা তোমাদের না দিলেই নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অসংখ্য শাখায় সুগভীর পাণ্ডিত্য অর্জনকারী বিখ্যাত জ্ঞানতাপস আল-বেরুনি মৃত্যশয্যায় শায়িত। এই সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এক বিজ্ঞানী বন্ধু এলেন। আল-বেরুনি সে অবস্থায় তার বন্ধুকে গণিত সম্পর্কে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বসলেন। মৃত্যুর দুয়ারে দাড়িয়েও এমন জ্ঞান অন্বেষণ! আল-বেরুনির বন্ধুটি খুবই আশ্চর্য হলেন। বন্ধুটি বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, তুমি কি না এই অবস্থায়ও নতুন কিছু জানতে প্রশ্ন করছো ! আল-বেরুনি বললেন, আমার জন্য কি এটাই বাঞ্ছনীয় নয় যে, একটা প্রশ্নের সমাধান জেনে নিয়েই মৃত্যু সুধা পান করব? এটা কি না-জেনে ইহধাম ত্যাগ করার চাইতে উত্তম নয় ? বন্ধুকে বিদায় দেওয়ার অব্যবহিত পরেই আল-বেরুনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একবার ভাব, জ্ঞানীরা কেন জ্ঞানী হয়েছেন। সুতরাং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পড়ালোখা করে যাওয়াই জ্ঞানীর কাজ।

করোনা থেকে কখন মুক্তি পাব জানি না। বাড়িতে অবস্থান করার ফলে তোমরা এখন অনেক সময় পাচ্ছো। এ সময়টা হেলায় হারানো যাবে না, কাজে লাগাতে হবে। ছুটিকালীন সময়ে নতুন করে দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করতে হবে। যেখানে খাওয়া-দাওয়া, পড়ালেখা, প্রার্থনা, পিতা-মাতাকে সাহায্য করা, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, সহপাঠি, বন্ধু-বান্ধবদের সচেতন করা, বিনোদন, খেলাধুলা, শরীরচর্চা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজের সময় বিভাজন থাকতে হবে।

তোমরা যেন পিছিয়ে না পড়, করোনাকালীন সময়টা যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য ঘরে বসে নিজেদের পাঠ্যবই পড়া চালিয়ে যেতে হবে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সংসদ বাংলাদেশ  টেলিভিশনের ক্লাস দেখতে পার। ক্লাসুগলো এটুআই পরিচালিত কিশোর বাতায়নেও থাকে। ইউটিউবেও ক্লাস অনুযায়ি বিষয়ভিত্তিক অনেক লেকচার আছে।  এছাড়া টেন মিনিট স্কুল, ব্র্যাক ই-শিক্ষা কর্মসূচি, শিক্ষক ডট কম, খান একাডেমিসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিষয়ভিত্তিক কিছুকিছু লেকচার আছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লেখাপড়ার পাতা আছে। সেগুলোর সহায়তা নেওযা যেতে পারে। বুঝতে সমস্যা হলে বিষয় শিক্ষকের সাথে, সহপাঠিদের সাথে মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে বুঝে নিতে হবে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি যারযার ধর্মীয় গ্রন্থ, বিভিন্ন শিক্ষামূলক গল্প, মনিষীদের জীবনী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে পারো।

 প্রিন্ট কপি না পেলে নিয়মিত অনলাইন পেপার-পত্রিকা পড়তে পারো। তবে মূল ধারার পেপার-পত্রিকা পড়তে হবে। ছুটিকালীন সময়ে বাড়ির কাজে পিতামাতাকে সহযোগিতা না করে মাত্রাতিরিক্ত গেম খেলে, ফেসবুক, ইউটিউব, টিভি দেখে অযথা পতিা-মাতার বিরক্তির কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রযুক্তি আসক্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। কোনরূপ দুশ্চিন্তা করা যাবে না। পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্মমতে সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, করোনা থেকে মুক্তি পেতে নিজের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, পরিবার-পরিজন, শিক্ষক, প্রতিবেশী, সহপাঠি, বন্ধু-বান্ধবসহ দেশ-জাতির জন্য দোয়া করতে হবে। আশাকরি তোমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নেবে, তোমাদের নিয়ে নতুন করে সাজবে পৃথিবী।

এস এম খায়রুল বাসার
কলাম লেখক ও
অধ্যক্ষ, পল্লীমঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়
ইছামতি, অভয়নগর, যশোর।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]