শুক্রবার ৫ জুন ২০২০ ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

একজন সমীর কুমার সাহাঃ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা
রাশিদুল রাশেদ
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২০, ১০:০৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

লেখক: রাশিদুল রাশেদ

লেখক: রাশিদুল রাশেদ

পৃথিবীর মানুষ তার সভ্যতা সংস্কৃতিকে যতটুকু উন্নত করতে পেরেছে, তার মূলে রয়েছে মানুষের বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে গবেষণার ফলাফল। গবেষণা ব্যতীত মানুষ আজকের এই সভ্যতা কোনভাবেই কায়েম করতে পারতো না। অতীন্দ্রিয় কোন রিসোর্স কিংবা প্রাকৃতিক রিসোর্স মানুষের সভ্যতাকে উন্নতি করে নাই এবং ভবিষ্যতেও করবে না। বরং প্রকৃতিকে মোকাবেলা করে শুধুমাত্র মানুষের বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার ইতিবাচক ফলাফল মানুষ সভ্যতাকে উন্নতি করেছে। মানুষ যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছে, তখন থেকেই গবেষণার কাজ মানুষ করে চলছে। হয়তো তখন সায়েন্স ল্যাব ছিলো না, কিংবা ছিলো না মেথড সিস্টেম কিন্তু গবেষণা হয়েছে রীতিমতো বটে। আর গবেষণার মাধ্যমে সে তার সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এবং ধাপে ধাপে উন্নতি করেছে তাঁর সভ্যতাকে।

গবেষণার ইংরেজি শব্দ হলো Research. যা হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় গবেষকদের (বিজ্ঞানীদের) 
কার্যাবলী। যিনি গবেষণা করেন বা গবেষণা কর্মের সাথে জড়িত, তিনি গবেষক বা গবেষণাকারী নামে পরিচিত।

 

আজকে যখন সারা পৃথিবীতে নোভেল করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণে মানবজাতি কাবু প্রায়, তখন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক ছোট্ট দেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। কোভিড-১৯ এ-র আঘাত এদেশেও সমানতালে আঘাত এনেছে। ইতোমধ্যে এদেশে ২০ হাজারের অধিক মানুষ কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত এবং মারাও গেছে কয়েক'শ মানুষ। এসময় আমাদের দেশের একজন অনুজীব বিজ্ঞানী সমীর কুমার সাহা করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স জানার জন্য গবেষণা শুরু করেন এবং তিনি ও তাঁর কন্যা মিলে এ ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। যা এই মহামারীর প্রেক্ষিতে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত।

সমীর কুমার সাহা (জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৯৫৫) একজন বাংলাদেশী অণুজীববিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি শিশুদের জন্য ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজির ডায়াগনস্টিক বিভাগের অধ্যাপক, সিনিয়র পরামর্শদাতা এবং বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দ্য চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) নির্বাহী পরিচালক। তিনি সত্যিকারের একজন আলোকিত মানুষ। যা আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দুর্লভ বটে।

এই দুর্লভ মানুষ মাপে মাত্র ৬ ফুট / ১২ ফুট হবে একটি ঘর, যা বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল লাগোয়া এবং ছোট্ট এই ঘরটাতেই ১৯৮৩ সালে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করেছিলেন। তারপর থেকে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক নিয়ে কাজ করেছেন এই গবেষক সমীর কুমার সাহা। সেজন্য অবশ্য একাধিক সম্মানও তিনি পেয়েছেন ‘ইউনেস্কো’, ‘দ্য আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি’-র মতো সংস্থা থেকে। আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষ্য মতে- "এ বারে ফের মেয়ে সেঁজুতিকে নিয়ে চমকে দিলেন সমীরবাবু। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স উদঘাটন করলেন বাবা-মেয়ে।"

ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স জানা গেলে রোগের গতিবিধি সম্পর্কে জানা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক শরিফ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘‘জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সাহায্যে ভাইরাসটির জেনেটিক পরিবর্তন জানা সম্ভব হবে। রোগের মূল জানা গেলে প্রতিষেধক-সন্ধান সহজ হয়ে যাবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘বিষয়টা এ রকম, এই মুহূর্তে ভাইরাল জিনোম সিকোয়েন্স থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল আমাদের দেশে প্রচলিত নির্দিষ্ট ভাইরাল স্ট্রেনগুলো শনাক্ত করা, সংক্রমণের হটস্পট বা সুপার-স্প্রেডার শনাক্ত করা এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্য কৌশল প্রণয়ন করা।’’ তিনি আরও জানিয়েছেন, এটি বাংলাদেশের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সহায়তা করবে।

 

এ বছর জানুয়ারিতে সমীর ও সেঁজুতিকে নিয়ে নিজের ব্লগ ‘গেটসনোট’-এ লিখেছিলেন বিল গেটস। লিখেছিলেন, কী ভাবে ছোট্ট সেঁজুতি রাতে খাবার টেবিলে বাবার কাছে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার গল্প শুনত। কী ভাবে সেঁজুতিও বাবার মতো মাইক্রোবায়েলজিস্ট হয়ে উঠেছেন। এ-ও লিখেছিলেন, ‘আমার ইচ্ছে হয়, আমিও যদি ওদের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসতে পারতাম। নানা অসুখ নিয়ে কত কী শিখতে পারতাম!’        

সমীর কুমার সাহা তাঁর ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি এবং এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ১৯৮৯ সালে ভারতের বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

কৃতিত্ব সম্পাদনাঃ

সাহা বাংলাদেশে মেনিনজাইটিস এবং নিউমোনিয়া সৃষ্টিকারী দুটি ব্যাকটিরিয়ার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন প্রয়োগে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি দেশের শিশুদের স্বাস্থ্যের উপর প্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।  শিশু বিশেষজ্ঞের শীর্ষস্থানীয় গবেষক হিসাবে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আক্রমণাত্মক শৈশব রোগের উপর নজরদারি করে চলেছেন। কিছু নিউমোকোকাল রোগের চিকিত্সা প্রতিরোধের বিষয়েও তিনি গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সাহা তার দলভিত্তিক বাংলাদেশে চারটি সেন্ডিনেল হাসপাতাল নজরদারি নেটওয়ার্ক ডিজাইন ও স্থাপন করেছিলেন। "কমিউনিটি অ্যাডজাস্টেড হসপিটাল-ভিত্তিক তত্ত্ববধান করার একটি মডেল যা জনসংখ্যা স্তরে রোগের উৎসের তথ্য রেকর্ড করে।  স্ট্রেপ্টোকোকাস নিউমোনিয়া, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, সালমোনেলা টাইফি / প্যারাটিফি, ইত্যাদি দ্বারা আক্রান্ত আক্রমণাত্মক শৈশব রোগের উপর নজরদারি তথ্য তৈরি করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা রয়েছে। 

লেখক সম্পাদনাঃ

সমীর সাহা পিয়ার-রিভিউড জার্নালগুলিতে প্রায় দেড় শতাধিক নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এসব নিবন্ধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শৈশব নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিসের বিষয়গুলি অন্বেষণ করে।

যদিও সমীর সাহা অসংখ্য পুরস্কার দ্বারা স্বীকৃত, তবে উল্লেখযোগ্য হলো-

২০১৭ সালে, ক্লিনিকাল মাইক্রোবায়োলজির গবেষণার জন্য আমেরিকান সোসাইটি ফর মাইক্রোবায়োলজি (এএসএম) পুরস্কার।
২০১৭ সালে, ইউনেস্কো কার্লোস জে মাইক্রোবায়োলজিতে ফিনলে পুরস্কার পেয়েছিলেন ।

আমার লেখার মূল ভাষ্য প্রায় শেষ করে ফেলেছি বটে।কিন্তু আমাদের এই ছোট্ট দেশে নিশ্চিত কিছু মানুষ রয়েছে যারা চিন্তা করতে জানে এবং চিন্তা করতে পছন্দ করে। অর্থাৎ জ্ঞানভিত্তিক চিন্তা করার প্রয়াস পেয়ে থাকেন। তবে আমার এদেশ একটি রাষ্ট্র হিসেবে তাঁদের চিন্তাকে বিস্তৃতি করার উল্লেখযোগ্য তেমন কোন সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। যা রাষ্ট্রীয় একটা ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত হতে পারে বটে। শুধু একটি ব্যর্থতা বললে ভুল হবে বরং এটাকে বড় ধরণের জাতিগত ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাও বলা যেতে পারে। এর মূল কারণ প্রায় ৫০ বছরের এ রাষ্ট্রে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত মাত্রায় বেশী হওয়া। কেননা দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের মানসিকতা কখনো সৃজনশীলতা বিস্তৃত করতে প্রয়াস পায় না। এজন্যই রাষ্ট্রের উচিত হবে যে, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন মানসিকতা দমন করা এবং নৈতিকতা সমৃদ্ধ করা ও  সৃজনশীল মানুষ তৈরির সহায়তা করা। তাহলে এদেশের অনেক মানুষ সমীর কুমার সাহার মতো দুর্যোগে কিছু না কিছু সৃজন বা আবিস্কার করতে পারবে। যাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বীরোচিত হবে সারা পৃথিবীতে। আর এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, গবেষণা থেকে আর কিছু নেই যে সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট হয়েছে এবং উন্নতি করেছে। সুতরাং গবেষণার বিকল্প গবেষণা। আর গবেষকরা হলো আসল তাঁরা/হিরো/নায়ক। যাঁরা মানুষের দুঃসময়ে, পৃথিবীর দুঃসময়ে মানবজাতিকে, পৃথিবীকে বাঁচাতে একমাত্র উদ্যমী হোন।

সহায়কঃ ১.গুগুল উইকিপিডিয়া এবং
              ২. আনন্দবাজার অনলাইন সংস্করণ
                 ১৫.০৫.২০।


(এম আই কে রাশিদুল ইসলাম রাশেদ)
কবি, লেখক, রাজনীতিবিদ।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল থেকে (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]