বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২০ ১২ কার্তিক ১৪২৭

পেঁয়াজ সমাচার এবং আমাদের কৃষকের অবস্থা
আফরোজা রোজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ২:৫৮ পিএম আপডেট: ২৫.০৯.২০২০ ৩:১২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ।  এদেশের প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম।  আমাদের দেশে পেঁয়াজের গুরুত্ব অপরিসীম ।  কারণ হিসেবে প্রথমেই আসে বাঙ্গালীর ভোজনপ্রিয়তা যা আমাদের কারোরই অজানা নয়।  আর এই ভোজন রসিক বাঙ্গালীর নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় পেঁয়াজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।  এছাড়াও পেয়াজে আমিষ,ভিটামিন,ক্যালসিয়াম লৌহ,ম্যাগনেসিয়াম,ফসফরাস,পটাসিয়াম ইত্যাদি পুষ্টি উপাদান রয়েছে এবং সেই সাথে রোগ প্রতিরোধী  ঔষধি গুণের কারণে বিশ্বজুড়ে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।  কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ হওয়া স্বত্বেও প্রতি বছরের একটা বিশেষ সময়ে পেঁয়াজ নামক মশলাটির তীব্র সংকট দেখা যায় ।  যার দরুণ আমাদের দারস্থ হতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছে।  এক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানরা বিশেষকরে ভারতের উপর নির্ভর করে থাকেন।  তাই প্রতি বছর একটা হ্যান্ডসাম পরিমাণ পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করা হয়।  কিন্তু মাঝে মাঝেই আমাদের এই পরম বন্ধু রাষ্ট্রটি বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি করতে অস্বীকৃতি জানায়।  ফলাফল স্বরূপ দেশে পেয়াজের দাম আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।  যার কারণে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। এই কিছুদিন আগেও আমরা এর সত্যতা দেখেছি।  হঠাৎ করে ৭০/৮০ টাকার পেঁয়াজ ২৫০ টাকা পর্যন্ত কেজি দরে কিনতে হয়েছে।  এমনকি গত বছর এই সেপ্টেম্বর মাসেও ভারত যখন পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিলো তখন পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছিলো।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে তীব্র সংকট এর পেছনের কারণ কি? এই সংকট আসলেই যুক্তিযুক্ত নাকি বেচিরভাগই কৃত্তিম?
লেখক: আফরোজা রোজা

লেখক: আফরোজা রোজা

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় পেঁয়াজ দিয়ে এ দেশের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ সম্ভব হলেও পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।  কারণ, অধিকাংশ পেপারলেস ব্যবসায়ী হওয়ার সুবাদে আমদানিকৃত পেঁয়াজ দিয়ে সহজেই ক্রেতাকে বোকা বানানো যায়।  যেহেত আইনি কাগজপত্র দেখানোর ব্যধ্যবাধকতা থাকে না তাই সহজেই ক্রেতাদের বোকা বানিয়ে দফায় দফায় দাম বাড়ানো যায়।  আর এই কারসাজির পেছনে আছেন বৈধ আমদানির ছাড়পত্র, এলসি খোলার ছাড়পত্র বিহীন আমদানিকারকের কমিশন এজেন্ট, আড়তদার পরিচয়ের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।

তাইতো দেশীয় পেঁয়াজের যোগান থাকলেও সেটা পাওয়া দুষ্কর।  কারণ, কমিশন এজেন্ট, আড়তদাররা দেশীয় পেঁয়াজ বিক্রিতে আগ্রহী না কেননা দেশীয় পেঁয়াজ বিক্রি করতে গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ভোক্তা অধিদফতরের প্রতিনিধি বিক্রেতার ক্রয় রশিদ দেখতে চাইবে।  আর তখনি তাঁদের জালিয়াতি ফাঁস হয়ে পড়বে  ।  যার কারণে ব্যবসায়ীরা বরাবরই দেশীয় পেঁয়াজ বিক্রীতে অনিহা দেখান।  সুতরাং এটা সহজেই বোধগম্য যে প্রতি বছর পেঁয়াজের যে সংকট তার সিংহভাগই কৃত্তিম।

বাংলাদেশ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ৩০ লক্ষ টনের মত।  সেখানে ২০২০ সালে দেশে উৎপাদনের পরিমাণ ২৫ লক্ষ ৫৭ হাজার টন।  কিন্তু, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে মূল উৎপাদন থেকে গড়ে ২২-২৫ শতাংশ নষ্ট হওয়ার দরুণ অবশিষ্টাংশ ছিলো ১৯ লক্ষ ১৭ হাজার টন।  কিন্তু, প্রশ্ন উঠেই আসে যেহেত বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ সেহেতু, পেঁয়াজের উপাদনই বা এত কম কেন? এই যে মোট উৎপাদনের ২২-২৫ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে তার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কিছু বিষয় সামনে আসে যেমন; ন‌্যায্য মূল্যের অভাব, সংরক্ষণ ব্যবস্থার সংকট, ভালো বীজের অপ্রতুলতা ইত্যাদি।

যখন দেশীয় কৃষকের পেঁয়াজ ঘরে উঠে, ঠিক তখনি আমদানিকৃত পেঁয়াজে দেশী বাজার সয়লাব হয়ে যায়।  যার ফলে কৃষক নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়।  এবং তাঁরা বেশ বড় সর লোকসানের সম্মুখীন হয়।  উল্লেখ্য, গত বছর এপ্রিলেও পেঁয়াজের মন ছিলো ৪০০ টাকা অথচ কৃষকের উৎপাদন খরচ ছিলো ৬০০ টাকা।  এমনকি এ বছরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে।  যার ফলে অনেক কৃষক ইচ্ছে পূর্বক  অনেক পেঁয়াজ নষ্ট করে ফেলেছে।  সুতরাং দেশীয় পেঁয়াজ মৌসুমে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ রাখলে কৃষক লাভবান হবেন এবং তারা অধিক উৎপাদনে আগ্রহী হবেন।

এছাড়াও আমাদের দেশে সর্বত্র পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থার বেহাল দশা পরিলক্ষিত হয়।  যার ফলে প্রতি বছর উৎপাদিত পেঁয়াজের একটা বড় অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  সুতরাং এখন সময় এসেছে দেশীয় পদ্ধতির পরিবর্তে  আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ পদ্ধতির ব্যবস্থা করার।  কারণ পেঁয়াজের জন্য ১২-২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা দরকার এবং আদ্রতা থাকা প্রয়োজন ৩৫-৪০ এর মধ্যে।  সুতরাং এ পদ্ধতি ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কমবে।  এবং কৃষকদের মানসম্মত বীজের যোগান  দিতে পারলে উৎপাদনের হার অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছি।  এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের কৃষকগণ যদি সব ধরনের সহায়তা পায় তাহলে সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশে ৩৫ টনের মত পেঁয়াজ উৎপাদন করা সম্ভব।

সুতরাং এমত অবস্থায় সরকারের উচিত মনিটরিং এর মাধ্যমে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং সর্বপরি কৃষকদের স্বার্থের প্রতি পূর্ণ  দৃষ্টি দেওয়া।  কারণ, একজন কৃষক যখনই তাঁর পরিশ্রম তথা উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্যায়ন পাবে তখনি আরো বেশি উৎপাদনে আগ্রহী হবে।  আর একমাত্র তখনই এই সংকট দূর করা সম্ভব হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশকে সমৃদ্ধশালী করা সম্ভব হবে।  তাই আমাদের সবসময় একটা কথা মনে রাখতে হবে, "কৃষক বাঁচলেই বাঁচবে দেশ আর আমরা পাবো একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ।"   [মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]

আফরোজা রোজা 
শিক্ষার্থী, ইংরোজি বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]