রোববার ১ নভেম্বর ২০২০ ১৬ কার্তিক ১৪২৭

সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নেও এনটিআরসিএ’র গড়িমসি?
জাহিদ হাসান
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ২:৩৫ পিএম আপডেট: ২৬.০৯.২০২০ ৪:৩৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

একটা সময় ছিল যখন দেশের বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি পেতে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির দারস্থ হয়ে লাখ লাখ টাকা প্রদানের মাধ্যমে পিয়ন, আয়া বা সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে লেকচারার পর্যন্ত হওয়া যেত।  এ সময় আয়া, পিয়ন বা ঝাড়ুদারের যোগ্যতা এমনকি শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকদের কোন যোগ্যতাই বিবেচ্য ছিলনা।  নিয়োগের ক্ষেত্রে একমাত্র  যোগ্যতার মাপকাঠি ছিল টাকার অংক।  এভাবেই অবৈধভাবে টাকা লেনদেনের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দানের প্রক্রিয়া। যার দরুণ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড কথাটিকে আমলে নিয়ে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দানের ব্যবস্থা না করে যেন অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে জাতির মেরুদন্ড ভাঙ্গার অন্তিম খেয়াল মেতেছিল একটি গোষ্ঠী।  পরবর্তীতে ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ গঠনের মাধ্যমে আরেক দূরভিসন্ধির সৃষ্টি করা হয়।  কারণ, সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব দিয়ে ২০০৫ সালে গঠন করা হয়েছিল নন গর্ভনমেন্ট টির্চাস রেজিস্ট্রেশন এন্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসিএ)’র।  যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল উত্তীর্ণ প্রার্থীদের সনদ প্রদান করার।  এতে করে স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ থেকেই যায়। 

সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নেও এনটিআরসিএ’র গড়িমসি?

সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নেও এনটিআরসিএ’র গড়িমসি?

কারণ, প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষক নিয়োগের নামে মেতে ওঠে অনিয়মকে নিয়ম করার এক অন্তিম খেলায়।  এ প্রতিষ্ঠানটির এমন অযৌক্তিক বহু কর্মকান্ডে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দেশের লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষিত বেকার।  এনটিআরসিএ মূলত বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিবন্ধন পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে।  ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত একটি বিশেষ পরীক্ষাসহ মোট ১৬টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা হয়েছে।  ইতিমধ্যে আবার দেওয়া হয়েছে ১৭ তম পরীক্ষায় অংশগ্রহণে আবেদনের বিজ্ঞপ্তি। 

তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় যে, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব পরীক্ষা অভিন্ন পদ্ধতিতে এবং অভিন্ন নীতিমালায় অনুষ্ঠিত হয়নি।  কখনো সারা দেশে শূন্য পদ সাপেক্ষে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল, কখনো বলা হয়েছিল উপজেলাভিত্তিক পদ শূন্য সাপেক্ষে।  ফলে কখনো কম নম্বর পেয়েও কেউ উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, আবার কখনো অনেক নম্বর পেয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি অনেকে।  পরীক্ষা পদ্ধতিতেও ছিল ভিন্নতা এ পর্যন্ত নেয়া ১৬ টি নিবন্ধন পরীক্ষা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কখনো শুধু লিখিত পরীক্ষা হয়েছে।  কখনো প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ৩ ধাপেও হয়েছে।  কোনো কোনো নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করানো হয়েছে অনেক বেশী সংখ্যক প্রার্থীকে, আবার কখনো পাশ করানো হয়েছে সামান্যই।  কোনো বছর পাসের হার ছিল ৫২ শতাংশ, কোনো বছর ২ শতাংশের কম।  অর্থাৎ, বছর বছর শুধু শুধু নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে সনদ বিক্রির অবৈধ খেলায় মেতেছিল তারা।  কিন্তু, চাকরি কত জনের নিশ্চিত হয়েছে এ হিসেবের ধারে কাছেও যায়নি প্রতিষ্ঠানটি। 

অবশেষে, ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান (এন আই) খান কর্তৃক নতুন গেজেট জারী করা হয়।  সেখানে বলা হয়- প্রতি বছর একটি নিবন্ধন পরীক্ষার মাধ্যমে উপজেলাভিত্তিক শুন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিয়ে সে অনুযায়ী প্রার্থী টিকানো হবে। যেখানে মোট প্রার্থীর সাথে অতিরিক্ত ২০% প্রার্থী টিকানো হবে (মৃত্যু, চাকরি ত্যাগ বা অবসরে যাওয়া হিসেবে। ) সে অনুযায়ী বিশাল সংখ্যক পরীক্ষার্থীদের মাঝ থেকে পিএসসির আদলে তিন ধাপে পরীক্ষা নিয়ে প্রাপ্ত শুন্যপদ অনুযায়ী টিকানো হয় মাত্র ১৭২৫৪ জনকে।  এভাবেই উত্তীর্ণদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এনটিআরসিএ।  এ গেজেট থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, উত্তীর্ণ সকলের চাকরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোন পরীক্ষার আয়োজন করবেনা এনটিআরসিএ।  গেজেট প্রণেতা নজরুল ইসলাম খান (এন আই) খান নিজেও এমনটিই বলেছেন যে এনটিআরসিএকে একটি সাবলীল পদ্ধতিতে আনতেই এই গেজেট প্রণয়ন করা)। 

এরই প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে ১৩ তম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়, যা তিন ধাপে তথা প্রিলিমিনারী, রিটেন এবং ভাইভা তিনধাপে পরীক্ষা নিয়ে চুড়ান্তভাবে প্রার্থী উত্তীর্ণ করানো হয়।  উক্ত পরীক্ষার কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তৎকালীন শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান (এন আই) খান রচিত নতুন গেজেটের আলোকে বলেন, এই পরীক্ষায় যারা চুরান্তভাবে উত্তীর্ণ হবে তারা নিয়োগ পাবে কেউ তাদের বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা।  কিন্তু, তিন ধাপে উত্তীর্ণ হয়েও ১৩ তম শিক্ষক নিবন্ধনধারীদের নিয়োগ নিয়ে আবারো তালবাহানায় মাতে এনটিআরসিএ। হতাশ হয়ে পড়ে ১৩ তম উত্তীর্ণ প্রার্থীরা। সংক্ষুব্ধ সনদধারীরা এনটিআরসিএসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদানের সাথে সাথে একযোগে ৬৪ জেলা প্রশাসককেও স্মারকলিপি প্রদান এবং  মানবন্ধন করেন।  তাতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক না নড়লে ১৩ তমে উত্তীর্ণ কিছু সংক্ষক নিবন্ধনধারী ২০১৭ সালে মহামান্য হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করেন।

দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২০১৮ সালের ০৫ নভেম্বর বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি খিজির আহমেদের দ্বৈত বেঞ্চ ১৩ তম বেসরকারী শিক্ষক নিবন্ধনধারীদের গেজেট ও পরিপত্র অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে নিয়োগের নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন।  এনটিআরসিএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব আশফাক হোসেন এই রায়কে চেম্বারকোর্টে স্টে করিয়ে গনবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।  ১৩ তম প্রার্থীদের যৌক্তিক নিয়োগ অধরাই থেকে যায়।  পরে, এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপিল করেন।  গত ২০২০ সালের ১২ মার্চ আপিলের রায় প্রকাশ হলেও করোনার কারণে রায়ের কপি প্রস্তুতের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।  পরে চলমান মাসের ১৩ তারিখে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশিত হয়।  এ রায়েও হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রাখা হয়েছে।  কিন্তু, এমতাবস্থায়ও সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে এনটিআরসিএ গড়িমসি করছে বলে জানিয়েছে প্রার্থীরা।

মামলা পরিচালনাকারী প্রার্থীরা শিক্ষাবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করে বলেছেন এখনই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এনটিআরসিএর এমন ধৃষ্টতা খতিয়ে দেখার।  সেইসাথে এসব সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার।  কারণ, এনটিআরসিএ কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কিংবা লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়।  এটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সেই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যে অন্যায় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম প্রতিনিয়ত চালিয়ে যাচ্ছে তা বন্ধ হওয়া জরুরি। 

সাথে সাথে, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) যেভাবে সারাদেশ থেকে আগে শুন্য পদগুলো সংগ্রহ করে উক্ত পদের উপর ভিত্তি করে সার্কুলার দিয়ে ভাইভায় উত্তীর্ণ সকলেরই চাকুরী নিশ্চিত করে একই পদ্ধতিতে এনটিআরসিএর জন্য করা সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর রচিত গেজেটের বাস্তবায়ন আবশ্যক বলে মনে করেন দেশের সকল বোদ্ধারা। আর এটির বাস্তবায়ন হোক ১৩ তমদের জন্য দেয়া সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বাস্তবায়নের মাধ্যমেই।

-লেখক, 
সাংবাদিক, কলামিস্ট


ডেল্টা টাইমস্/জাহিদ হাসান/সিআর/জেডএইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]