শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০ ১৪ কার্তিক ১৪২৭

পোশাক কিংবা জৈবিক তাড়না নয়, ত্রিমাত্রিক ক্ষমতাই ধর্ষণের মূল
ড. ফারহানা জামান
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২০, ৬:৪৬ পিএম আপডেট: ১৭.১০.২০২০ ৭:০৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ধর্ষণ ঘটনাটি ইদানীং একটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিলক্ষিত হয়। প্রথমে ফেসবুকে ধর্ষণের ঘটনাটি নিউজ আকারে অথবা ভিডিও আকারে ভাইরাল এবং পরে তা টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রকাশের মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগণের গোচরীভূত হওয়া। একই সাথে শুরু হয় বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণধর্মী মতামত এবং টক শো। শুরু হয় নারীবাদীদের আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ সমাবেশ, ফেসবুকে সচেতন জনগোষ্ঠীর সচেতনতামুলক পোস্ট এবং চা এর কাপে সাধারণের জল্পনা কল্পনা। কিছুদিনের মধ্যেই ধর্ষক পুলিশের জালে আটকা পড়ে এবং শুরু হয় বিচারিক প্রক্রিয়া। এরপর ধর্ষক বা ধর্ষিতার জীবনে কি ঘটে কেউ তা জানে না। 

 একটি ধর্ষণ ঘটনা ভাইরাল হবার সাথে সাথে সারা দেশের জনতা, পুরুষ নারী নির্বিশেষে, যেভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তা দেখে সর্বসাধারণের যথাযথ মানসিক বিকাশ ঘটেনি তা বলা মুশকিল। যদি তাই হয় তবে সেই অনুপাতে ধর্ষক নামক আলাদা এই প্রজাতির সংখ্যা খুব বেশি হবার কথা নয় এবং তাকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কোন ধরনের জটিলতা থাকার কথা নয়। একজন ছিনতাইকারীকে গণপিটুনিতে জীবন দিতে কম বেশি সবাই দেখেছি বা শুনেছি। কিন্তু একজন ধর্ষককে গণপিটুনিতে জীবন দিতে আজ অবধি দেখা যায়নি। অবশ্যই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া একটি অপরাধ। তবে ছিনতাইকারী বা কোন একটি ছিচকে চোরের ক্ষেত্রে তা পরিলক্ষিত হয়না। কারণ ছিনতাইয়ের মত বিষয়টির স্বীকার পুরুষ নারী উভয়েই। কিন্তু ধর্ষণের স্বীকার শুধুমাত্র নারীরাই। তাই একজন ধর্ষকের বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে যে ক্ষোভ পরিলক্ষিত হয় বাস্তবে তা কতটা প্রকট সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আবার ধর্ষকের সাথে হাসিমুখে স্লেফি তোলা, ধর্ষকের কারাগারে আয়েশ করার ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশিত হওয়া-  এ সবকিছু থেকে প্রমাণিত হয় যে মুখোশধারী ধর্ষকরা আমাদের আশেপাশেই লুকিয়ে রয়েছে এবং তাদের চিহ্নিতকরণ জরুরি। 
  ড. ফারহানা জামান

ড. ফারহানা জামান

অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতা নারীর পোশাক এবং তার চরিত্র নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে বসে যায় তথাকথিত ধর্ষণবিরোধী মানব সমাজ। যদিও আমাদের দেশের ধর্ষিতাদের অধিকাংশই শিশু এবং শতভাগই শালীন পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই ধর্ষিত হয়েছিলেন, তথাপিও এই সুযোগে বহু পুরুষ তার মনের মধ্যে নারী সম্পর্কএ লালিত পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারনা ধর্মীয় গোঁড়ামির মোড়কে আবৃত করে তুলে ধরেন এবং ধর্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাককেই দায়ী করে থাকেন। এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে পুরুষতান্ত্রিকতা এবং ধর্মান্ধতা  এখনও সেঁটে বসে রয়েছে আমাদের সমাজ কাঠামোয়। 

প্রথমত একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর তার পোশাক নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তিনি কি পরবেন, কিভাবে নিজেকে সমাজে উপস্থাপন করবেন এটা সম্পূর্ণরূপে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আর দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়নের এই যুগে ‘শালীনতা’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করা খুব কঠিন। কারণ, শালীন পোশাকের সংগা ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শিক্ষা, পেশা, স্থান, কাল, পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই একের কাছে যা শালীন অপরের কাছে তা নাও হতে পারে। তাছাড়া কর্পোরেট যুগের অনেক কর্মক্ষেত্রেই মেয়েদের যে পোশাকে অংশগ্রহণ করতে হয় তা গতানুগতিক পোশাক থেকে ভিন্ন। এই পোশাকেই একটি মেয়েকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে বাসে ট্রামে চেপে কর্মক্ষেত্রে আসতে হচ্ছে। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রেও নেই তার পোশাক পরিবর্তনের কাঠামোগত সুবিধা। তাছাড়া মুঠোফোনে কর্মক্ষেত্রে “সেলস গার্ল” এর পোশাক পরিবর্তনের ভিডিওচিত্র ধারণ এবং ব্ল্যাকমেইলিং এর ঘটনাও  কারও অজানা থাকার কথা নয়। তাই পোশাক নয়, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না ঘটলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। 

প্রতিটা শিশুই তার কৈশোরে পদার্পণের সাথে সাথে মুক্ত চিন্তা দ্বারা তাড়িত হয়;  ভেঙ্গে ফেলতে চায় শত বছরের পুরনো ধ্যান ধারণা, মুছে ফেলতে চায় জরাজীর্ণতা। তাই অনেক ক্ষেত্রে চিরাচরিত পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাড়ির সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি। নিজেকে তার ভাইয়ের সাথে তুলনা করে ছুটে চলে মাঠে,  উঠে যায় গাছের মগডালে। তার এই চাহিদা টুকু অন্যায় কিছু নয়। আবার বেড়ে ওঠার এই সময়েই তারা অনুকরণ করে কোন এক একশান মুভির নায়ক কিংবা নায়িকাকে অথবা তার প্রিয় ফিকশানাল চরিত্রকে। এ ধরনের অনুকরণ প্রবণতা থেকেই উৎপত্তি হয় পাখি জামা কিংবা কাটাছেড়া জিনস প্যান্টের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা যা সমাজের দৃষ্টিতে অন্যায় বা দৃষ্টিকটু।  এ সব কিছুই বেড়ে ওঠার একটা পর্যায় মাত্র যে সময়টাতে বাবা মা কে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সন্তানদের বুঝিয়ে প্রচলিত সমাজ কাঠামোর ভেতর দিয়ে চালনা করতে হয় যা কিনা শুধু কঠিনই নয়, বরং অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ একটি কাজ। সুশিক্ষিত কর্মজীবী বাবা মায়েরা পড়ে যান বিপাকে আর জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে কাজ করা স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর বাবা মা এর পক্ষে এই কঠিন কাজটি সুচারু রূপে সম্পন্ন করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। ফলে জটিল এই কাজটি সুচারু রূপে সম্পাদন করতে পারা না পারার মধ্যে ঘটে যায় নানা বিপত্তি। সমাজ সে মেয়েটির পোশাক, চালচলনের ধরণ, এবং ধর্ষণের স্থান কাল বিবেচনায় তাকে চরিত্রহীন বলে কালিমা লেপন করে দিতে এতটুকুও দ্বিধা বোধ করেনা। মুহূর্তেই ভাইরাল হয় অসহায় বাবা মা’র ছবিও। অথচ এই মেয়েটি একবারের জন্যও ভাবতে পারেনি যে সত্যি ই এমন একটি দুর্যোগ তার জন্য অপেক্ষা করেছিল। 

ধর্ষণকে অনেকেই একটি জৈবিক তাড়নার ফল হিসেবে দেখে এই তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যথাযথ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা বলছেন। মূলত জৈবিক তাড়না একটি সহজাত ব্যাপার যা নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়েই মানবসমাজ সভ্যতার পথে এগিয়ে চলেছে। তাহলে প্রশ্ন হল কেন এই ধর্ষণ? এটা কি কোন জৈবিক তাড়না নাকি যখন তখন যেখানে সেখানে এই তাড়নাকে নিবারণ করতে পারার এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক অথবা সামাজিক কাঠামোগত স্বাধীনতা? যেই মেয়েটি তার স্বামীর সাথে ঘুরতে গিয়ে ধর্ষণের স্বীকার হল, সেই ধর্ষকেরা তাদের জৈবিক তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ধর্ষণ করে ফেলেছে বিষয়টি তা নয়।  বরং তাদের মনে হয়েছে ক্ষমতার জোরে আইনের চোখকে ফাকি দিয়ে জৈবিক তাড়নাকে জাগিয়ে তুলে চাইলেই তারা পৈচাশিক আনন্দে মেতে উঠতে পারে। অর্থাৎ এই রুপ একটি ইচ্ছেস্বাধীন চিন্তার জায়গা থেকেই ধর্ষণের সিদ্ধান্ত। আবার অনেক ক্ষেত্রে পাশের গ্রামে অথবা পাশের বাড়িতে স্বামী পরিত্যাক্তা রয়েছেন মানেই তার ওপর সমাজের অনেক লালায়িত পুরুষেরা এক ধরনের অধিকার বোধ করেন যা থেকেই ধর্ষণের সূত্রপাত। আর ধর্ষণের চিত্র মোবাইলে ধারণ এবং তার সম্প্রচার ধর্ষকদের সীমাহীন ক্ষমতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে গভীর আঁতাত এবং অবৈধ লেনদেন, এবং সর্বোপরি ধর্ষকের মানসিক বিকৃতির পরিচায়ক।    তাই ধর্ষণের সাথে নারীর পোশাক, স্থান কাল এর কোন সম্পৃক্ততা নেই। রয়েছে ধর্ষকের এক ধরনের ক্ষমতা- যার উৎস ত্রিমাত্রিকঃ হতে পারে রাজনৈতিক, হতে পারে পুরুষতান্ত্রিক, অথবা পেশি শক্তির ক্ষমতা। আর এই ত্রিমাত্রিক ক্ষমতার সমন্বয় ঘটলে সেই পুরুষ হয়ে ওঠে বেপরোয়া। তাই এই ত্রিমাত্রিক ক্ষমতা থেকে মানবজাতিকে  মানসিকভাবে পৃথকীকরণের মাধ্যমেই ধর্ষণবিহীন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব যা কিনা অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে ধর্ষণের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব। 
অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে একটি খুনের ঘটনাও। তাই ধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী খুনের সরবোচ্চ শাস্তি মৃত্যু দণ্ড হওয়াই বাঞ্ছনীয়। খুন ছাড়াও শুধুমাত্র ধর্ষণের মানসিক প্রভাব বিবেচনা করলে দেখা যায়, ধর্ষিতা নারীর মৃত্যু ঘটে প্রতিদিন। সমাজ তাকে কুকথায় জর্জরিত করে  অনেকক্ষেত্রে আত্মহনণের পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র সহ আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও তা বিদ্যমান। তাছাড়া ভাষা বিশ্লেষণে ‘মৃত্যুদণ্ড’ শব্দটির মানসিক প্রভাব অন্য  যেকোনো শাস্তির তুলনায় বেশি। অন্যদিকে শুধুমাত্র ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ধর্ষিতাকে বাঁচিয়ে রাখার সীমিত সম্ভাবনা টুকুও বিনষ্ট করে, এই বিবেচনায় শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ অথবা তিনগুন করে দেয়ার ব্যাপারটিও আমলে নেয়া যেতে পারত। তবে আইন যাই হোক না কেন, স্বল্পসময়ে সঠিক বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।  [মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন]




লেখক : ড. ফারহানা জামান 
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 


ডেল্টা টাইমস্/ড. ফারহানা জামান/সিআর/জেড এইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], delt[email protected]