বুধবার ২ ডিসেম্বর ২০২০ ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

অহংকার একটি মারাত্মক মানসিক রোগ
মো. আখতার হোসেন আজাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২০, ২:৪৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

দেহের অসুখ হলে প্রতিষেধক হিসেবে ঔষধ সেবন করে সুস্থ হওয়া যায়। কিন্তু মনের রোগ হলে তা থেকে মুক্তি লাভ করা খুবই কষ্টকর। তেমনই অন্যতম মনের বা মানসিক একটি রোগের নাম অহংকার। এটি মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার করে তোলে। অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে (স্বঘোষিত) সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করলেও মানুষের কাছে, সমাজের কাছে সর্বনিম্ন শ্রেনীর মানুষে পরিণত হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে ব্যক্তি, সমাজ, দেশ, অঞ্চল তথা পুরো বিশ্বে অহংকারের মাত্রা দিনদিন মহামারী আকারে বেড়েই চলেছে। এর ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সর্বময় ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী মনে করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নিজস্ব চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করতে হীনপ্রচেষ্টা চালায়। কারো কাছ থেকে পরামর্শ বা উপদেশ শোনার মতো তার মানসিকতা থাকে না। কারণ সে সমাজের সবাইকে ছোট মনে করতে থাকে। অহংকারের বশে আত্মকর্মের জন্য সে কখনো নিজের ক্রুটি পর্যবেক্ষণ করে না। কেউ ধরিয়ে দিলেও তাকে অপদস্থ করে। ধীরে ধীরে তার ক্রুটি-বিচ্যুতির ফলে একদিন সে নিজেই সর্বক্ষেত্রে লাঞ্চনার শিকার হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সে ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মনগড়া ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করতে থাকে। ধর্মীয় বিধি-নিষেধ অমান্য করতে শুরু করে এবং একসময় সে অবিশ্বাসীদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়।
অহংকার একটি মারাত্মক মানসিক রোগ

অহংকার একটি মারাত্মক মানসিক রোগ

সমাজে বিভিন্ন প্রকারের অহংকারী লোকের দেখা মেলে। অথচ এমনটিও হতে পারে, আজ যে নেতা ক্ষমতার দাপটে নিজেকে অহংকারী করে গড়ে তুলেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় দুটি পা হারিয়ে চির পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতে পারে। যে বাগ্মী বা শুদ্ধভাষী নিজের বক্তৃতার জন্য অহংকার করেন, হয়ত কোন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন। অর্থ্যাৎ এই নশ্বর পৃথিবীতে গর্ব করার মতো কিছুই স্থায়ী নয়। মহান আল্লাহতায়ালা অহংকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। সহিহ মুসলিম শরীফে রয়েছে, রাসুল (স.) বলেছেন, আল্লাহ বলেছেন ইজ্জত-সম্মান হচ্ছে আমারই পোশাক এবং গর্ব-অহংকার হচ্ছে আমারই চাদর। যে ব্যক্তি আমার চাদর নিয়ে টানাটানি করবে, তাকে আমি কঠোর শাস্তি দেব।

তিরমিযীর ১৯৯৮ নং হাদিসে বলা হয়েছে, মহানবী (স.) বলেছেন, ‘তিল পরিমাণ অহংকার যার অন্তরে আছে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’। তিল পরিমাণ অহংকারের ব্যাখ্যায় কোন কোন ইসলামী চিন্তাবিদ বলেছেন, কারো পোশাকে যদি কালির দাগ লেগে যায়। এতে সে যদি ভাবে, এটি দেখে লোকে কী বলবে! তবে এটিই হলো অহংকারের সর্বনিম্ন স্তর।

বর্তমানে (বিশেষ করে যুব সমাজের মাঝে) আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। কেউ কেউ ধর্মীয় বা বিভিন্ন মতাদর্শের গুটিকয়েক বই পড়ে স্বল্প জ্ঞানের ভারে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। নিজেকে জ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন রকম ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মূলত জ্ঞানের স্তর তিনটি। প্রথম স্তর হলো যখন সে জ্ঞানার্জন শুরু করে বা বই পড়া শুরু করে আর নিজেকে সবজান্তা ভাবতে শুরু করে। এতে সে অহংকারী হয়ে যায়। জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তর হলো যখন সে বই পড়ে এবং অনুধাবন করতে পারে আমি জ্ঞানার্জন শুরু করেছি। বেশকিছু বিষয়ই আমার অজানা রয়েছে। তৃতীয় স্তরে পৌঁছে সে অনুমান করে জ্ঞানের বিশাল মহাসমুদ্রে সে অতিশয় ক্ষুদ্র এক কণা।
অহংকার থেকে বেঁচে থাকা খুব কঠিন কাজ নয়। মানুষকে সৃষ্টিকর্তা যে সম্পদ, সম্মান, পদ-পদবী দিয়েছেন, মানুষ যদি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ভাবে এই সম্মান ও পদ-পদবী বা ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে না দিয়ে অন্য কাউকেও দিতে পারতেন। যিনি দিয়েছেন তিনি মুহূর্তেই তা ফিরিয়ে নিতে পারেন। বিবেকে যদি এমন উদ্দীপনা জাগ্রত থাকে, তবে একদিকে মানুষ যেমন সৃষ্টিকর্তার খুব প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে, অন্যদিকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সচেষ্ট হয়। ইতিহাস সাক্ষী অহংকারী ব্যক্তিদের পরিণতি খুবই করুণ হয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া আমেরিকার নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প সভা-সমাবেশ আর নিজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বারবার বলছিলেন, আমাকে কেউ হারাতে পারবে না। বিরাট ব্যবধানে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে তাকে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইয়া বলসোনারো করোনার প্রারম্ভিক সময়ে বলেছিলেন, আমি একজন প্রাক্তন খেলোয়াড়। করোনা আমাকে কোনভাবেই ছুঁতে পারবে না। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। এমন দাম্ভিকতার বক্তব্যের কিছুদিন পরেই তিনি করোনা আক্রান্ত হন। তৎকালীন সময়ের প্রায় ৭৫ লাখ ডলার ব্যয়ে নির্মিত টাইটানিক জাহাজের নির্মাতা বলেছিলেন, ‘টাইটানিক কোনোদিনও ধ্বংস হবার নয়’। তিনি আরেকটি দাম্ভিকতার সুরেই বলেছিলেন, এমনকি স্বয়ং ঈশ্বরও এর কোন ক্ষতিসাধন করতে পারবেন না’। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রথম সমুদ্র যাত্রাতেই ডুবে থাকা এক বরফ খন্ডের ধাক্কায় বিলীন হয়ে যায় আটলান্টিকের অতলান্তিক গভীরতায়। সলীল সমাধি ঘটে ১,৫১৩ জন যাত্রীর। আবরাহা কাবা ঘর ধ্বংস করতে গিয়ে নিজেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। নমরুদ নিজ দাম্ভিকতার দরুণ ৪০ বছর পাদুকা দিয়ে নিজের মাথায় আঘাত করতে করতে মৃত্যুবরণ করেছিল। ফেরাউন নিজ জাতির কাছে নিজেকে খোদা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। নীলনদের জলে করুণ পরিণতির কথা কেই বা না জানে! মহান আল্লাহ তায়ালাকে ইবলিশ বলেছিল, আমি আদমের থেকেও শ্রেষ্ঠ। তখন আল্লাহ বললেন, অহংকার করা তোমার উচিত নয়। যাও লাঞ্চিত হয়ে বের হয়ে যাও এখান (জান্নাত) থেকে।

ইতিহাসের শিক্ষা, দাম্ভিকতার পরিণাম মোটেও ভালো হয় না। ক্ষণস্থায়ী দূষিত আনন্দ উপভোগ করলেও পৃথিবীতে রয়েছে অপমান আর লাঞ্চনা এবং পরকালে রয়েছে কঠোর শাস্তি। এজন্য কোরআনে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, মাটির বুকে গর্বের সাথে চলবে না। নিশ্চয়ই তুমি কখনো পদচাপে জমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না ( সূরা বনী ইসরাইল: ৩৭)। আল কোরআনে মাহন আল্লাহতায়ালা অহংকার থেকে বাঁচার জন্য সূরা আরাফের ২৩ নং আয়াতে একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। ‘রব্বানা জলামনা আংফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতারহামনা লানা কুন্নানা মিনাল খসিরিন’। অর্থ: ‘হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয় আমরা আমাদের নফসের উপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’। রাতে ঘুমানোর পর আগামীকাল সকালের সূর্য দেখতে পাবো কি না যখন তার নিশ্চয়তা নেই, এমন নশ্বর পৃথিবীতে অহংকার আর দাম্ভিকতার বৈশিষ্ঠ্য যত দ্রুত অন্তর থেকে মুছে ফেলা যাবে, ততই তা মানব জীবন ও মানব জাতির জন্য কল্যাণকর হবে।



লেখক: শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]