বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪ ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদান চিরস্মরণীয়
ইসরাত জাহান চৈতী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০, ১২:৩২ পিএম আপডেট: ২৯.১২.২০২০ ১২:৪৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ গুটি গুটি পায়ে পৌঁছে গেলো স্বাধীনতার অর্ধশত বার্ষিকীতে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে। আজকের এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাঙ্গালী জাতিকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে দীর্ঘ নয় মাস। দেশের সকল শ্রেণী পেশার লোক জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পরেন পাক বাহিনীর হাত থেকে দেশমাতৃকা কে রক্ষার তাগিদে। এ যুদ্ধে অংশ নিয়ে ৩০লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশ নেয় সমানতালে। তাইতে স্বাধীনতা অর্জনে ৯লাখ মা বোন কে হারাতে হয়েছে সম্ভম। এত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত আজকের বাংলাদেশ। আর এই স্বাধীনতা আর্জনে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশি কিছু বন্ধু তাদের অকৃএিম সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন যুদ্ধের শুরু থেকেই। তাদের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়তো আরো কঠিন হতো।

বিদেশি এই বন্ধুরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করে গেছেনে প্রত্যক্ষভাবে আবার কেউ পরোক্ষভাবে। কেউ খাদ্য সহায়তা দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ বিশ্বদরবারে জনমত তৈরী করে, গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে, কলম হাতে লেখনীর মাধ্যমে আবার কেউ বা পাক হানাদারদের নির্মম অত্যাচারের স্থির চিত্র ধারন করে মুক্তিযুদ্ধের আসল চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে দেশের সকল মানুষের তাদের এই অকৃত্রিম অবদানের কথা জানা জরুরি। আজীবন বাঙ্গালী জাতির তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা কর্তব্য।
ইসরাত জাহান চৈতী

ইসরাত জাহান চৈতী


শুরুতেই স্মরণ করতে হয় প্রতিবেশী বন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে মুক্তিযুদ্ধের ধাত্রী বলা হয়ে থাকে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক হানাদারদের পাশবিক নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে প্রায় ১ কোটি লোক আশ্রয় নেয় ভারতে। সেসময় ইন্দিরা গান্ধী এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশে ফেরত না পাঠিয়ে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্নদেশে ঘুড়ে বাংলাদেশের জন্য সমর্থক যুগিয়েছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চুক্তি করেছেন মূলত বাংলাদেশকে রক্ষার তাগিদেই। তার এই অবদান কোন কিছুর বিনিময়ে শেষ হবার নয়। তাই বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করবে তাকে।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ শব্দটির সাথে পরিচিত প্রায় সব বাঙ্গালী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের নির্যাতন শুরু হলে ভারতের সেতার সম্রাট খ্যাত রবিশঙ্কর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য করতে নিজের ভেতর থেকে তাগিদ অনুভব করলেন। ঠিক করলেন বাদ্যযন্ত্রের দ্বারা সঙ্গীতের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবেন। সে সময় তার সাথে যুক্ত হলেন বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। মহান এ দুজন ব্যক্তির উদ্যোগে ১৯৭১ সালে ১আগষ্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে প্রায় ৪০হাজার দর্শক নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক এক কনসার্ট। বিখ্যাত এ কনসার্টে একের পর এক গেয়েছেন বব ডিলান, লিওন রাসেল, রিঙ্গো স্টার সহ আরো অনেকে। সবশেষে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন বিখ্যাত বাংলাদেশ গানটি। যা ইতিহাসে স্মরণীয় এক গানে পরিণত হয়েছে। রবিশঙ্কর ও হ্যারিসনের উদ্যোগে 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' নামক এই কনসার্ট হতে প্রাপ্ত প্রায় ২কোটি ৪৩হাজার ৫শত মার্কিন ডলার ইউনিসেফের মাধ্যমে ভারতে আশ্রিত ১কোটি শরনার্থীদের সাহায্য ব্যয় করা হয়।

যতদিব রবে বাঙ্গালী জাতি তত দিন শ্রদ্ধাভরে স্মরন করবে বিদেশী বন্ধু ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ডকে। কেননা একজন বিদেশী হয়েও তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়। ১৯৭০সালের শেষের দিকে তিনি বাটা স্যু কোম্পানির প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে ঢাকায় আসেন। ২৫মার্চের ভয়াবহতা তিনি লুকিয়ে দেখেন এবং অসহ্য নির্যাতনের কিছু স্থির চিত্র ধারন করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। পাকিস্তানিদের ভয়াবহ নির্যাতন নিপিড়ন দেখে তিনি অবস্থান নেন হানাদারদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সে টঙ্গীতে অবস্থিত বাটা কোম্পানির ভেতর গোপনে গেরিলা ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন। মুক্তিবাহিনীর ২নম্বর সেক্টরে অংশ নিয়ে টঙ্গী ও এর আশেপাশের বেশ কয়েকটি গেরিলা হামলায়ও অংশগ্রহন করেন তিনি। এছাড়াও যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ঔষুধ ও খাদ্য দিয়ে সহায়তা করেন বাংলাদেশ কে। তার এ অসামান্য অবদানকে স্বীকৃত দিতে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরপ্রতীক খেতাপে ভূষিত করেন। ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশেই বসবাস করতেন ওডারল্যান্ড।

যুদ্ধে অবদান রাখা অন্যতম আরো একজন বিদেশি বন্ধু সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। প্রথম বিদেশী সাংবাদিক যিনি প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের গণহত্যা সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরী করেন। কলম আর ক্যামেরার হাতে তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন এদেশের মুক্তিকামীদের পক্ষে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের চাপে পরে যেকজ বিদেশি সাংবাদিকদের দেশে আসার অনুমতি দেন পাকবাহিনী সায়মন তাদের মধ্যে অন্যতম। সে সময় তিনি পাক হানাদারদের বর্বর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন বিশ্বদরবারে। যুদ্ধের পরিস্থিতি তার বিপক্ষে গেলেও তিনি এদেশ ত্যাগ না করে গা ঢাকা দেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ২৫ মার্চের ভয়াবহতার পর ঢাকা শহরের হত্যা, ধ্বংসের চিত্র নিয়ে তিনি চলে যান ব্যাংককে। সেখান থেকে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরেন "ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান " প্রকাশের মাধ্যমে। তার প্রকাশিত খবরই প্রথম বিশ্ববাসীকে নাড়া দেয়।

অ্যালেন গিন্সবার্কের 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড' কবিতা টা সম্পর্কে সকলেই কম বেশি জানি আমরা। মার্কিন কবি অ্যালেন একজন মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেন তার এই কবিতাটির মাধ্যমে। তার এ কবিতাটি আলোড়ন যোগায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অগণিত সাহিত্যপ্রেমিদের মনে। তার এই কবিতার প্রতিটি লাইনে ফুটে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাঙ্গালী জাতির অসহায়ত্বের চিত্র, পাকিস্তানি হানাদরদের নির্মম নির্যাতনের চিত্র। যা এখনও আলোড়িত করে বাঙ্গালি জাতিকে।

এডওয়ার্ড কেনেডি আমৃত্যু তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু। যুদ্ধকালীন সময়ে এডওয়ার্ড কেনেডি কর্মরত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবে। শুরু থেকেই তিনি বাঙ্গালী গণহত্যার বিরোধিতা করেছেন। ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১কোটি শরনার্থীর অমানবিকতা দেখে গিয়ে তিনি সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে 'ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া ' নামে একটি রিপোর্ট পেশ করেন। এত উঠে আসে পাকবাহিনীর নির্মমতার বিস্তারিত চিত্র। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্য বিশ্ববাসীর কাছে সাহায্য আবেদন করেন। বাংলাদেশের অকৃত্রিম এই বন্ধু ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ ভ্রমনেও আসেন।

পল ও কনেট দম্পতি পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যা কান্ডের বিরুদ্ধে লন্ডনে জনমত তৈরীরে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ কে সমর্থন করে তারা 'অপারেশন ওমেগা' প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশে খাদ্য ও ঔষুধ পাঠান। এছাড়াও তারা পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে লন্ডনের ক্যামডেনে 'বাংলাদেশ অ্যাকশন' নামে একটা কার্যালয় স্থাপন করেন। পল বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের প্রতি জনমত তৈরীতে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশ ত্রান সহায়তা পৌঁছে দিতে লুকিয়ে আাসার সময় পল পাকবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হোন। দুই বছরের কারাদন্ড শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।

মার্ক টালি তৎকালীন সময়ে কর্মরত ছিলেন বিবিসিতে। যুদ্ধকালীন সময়ে রেডিও হাতে সময়ে সকাল সন্ধ্যা দেশবাসী অপেক্ষা করতো মার্ক টালির কথা শুনার জন্য। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বর্ববরতার বাস্তব চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের(বিবিসি) সাংবাদিক মার্ক টালি। তার খবরের মাধ্যমে সারা পৃথীবি বুঝতে সক্ষম হয় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র। এর ফলে অনেকাংশেই উপকৃত হয় মুক্তিকামী বাঙ্গালীজাতি।

১৯৭১সালে বিদেশি এসব বন্ধুদের অবদানের কথা বলে শেষ করার নয়। তাদের উপকারের কোন প্রতিশোধ হয় না। তাই বাঙ্গালী জাতিকে আজীবন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে যেতে হবে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের প্রতি, যারা কিনা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে। বাঙ্গালী জাতির চরম সংকটকালে পাশে দাড়িয়ে ছিলেন।

লেখক : ইসরাত জাহান চৈতী
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






ডেল্টা টাইমস্/ইসরাত জাহান চৈতী/সিআর/জেড এইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com