বুধবার ৩ মার্চ ২০২১ ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

ঘুমাতে পারি না সারারাত ধরে, বুকের ভেতরটা হাহাকার করে
মো. আখতার হোসেন আজাদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২১, ৩:২৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ক’দিন আগে বাবার সাথে রাতের সংবাদ দেখছি। একটি প্রতিবেদন প্রচার হলো রাজধানীতে গ্রুপ স্টাডির কথা বলে বান্ধবীকে ডেকে ধর্ষণ; অতঃপর নারীর মৃত্যু। বাবা বললেন, এ যুগের ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শিখিয়ে লাভ কী হচ্ছে! না আছে নূন্যতম সভ্যতা, না আছে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। বাবার এমন কথা শুনে লজ্জায় কোনোরকমে খেয়ে দ্রুত আমার রুমে ফিরে গেলাম।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলাম সত্যিই তো। এতো পড়ালেখা শিখে আমরা কী করছি! যে শিক্ষা আস্থার ও ভরসার অন্যতম সম্পর্ক বন্ধুত্বের মান-মর্যাদা ধরে রাখতে সহযোগিতা করতে পারে না, এমন শিক্ষা নিয়ে সর্বোচ্চ কথিত ভালো চাকুরি ছাড়া আদৌ কি জাতিগত কোনো উন্নতি হচ্ছে? আমাদের অবস্থা এমস পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে যত বেশি শিক্ষিত হচ্ছে, সে যেন তত বেশি অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। উচ্চ শিক্ষিত জনসংখ্যার পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও অস্বীকার করার জো নেই দেশে সুনাগরিকের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে অভাবনীয় সাফল্যের পথে এগিয়ে গেলেও আমাদের সামাজিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে।
বর্তমান তরুণ সমাজে চরম মাত্রায় পচন ধরেছে। এই পচনের দুর্গন্ধ আনাচে কানাচে দ্রতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যার ফলে দেশের ভবিষ্যৎ সূর্যসন্তানদের মাদকাসক্ত, চারিত্রিক অবক্ষয়, বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা চর্চায় অনীহা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত, একটি রাষ্ট্র বা জাতির যুবসমাজের মাঝে ঘুণ ধরিয়ে দিলে সময়ের ব্যবধানে সে জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত হলেও বাংলাদেশের তরুণ সমাজ নৈতিকতার মানদন্ডে উন্নীত হতে পারেনি। কারণ আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষা দেয়া হয়, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া হয়, কিন্তু নৈতিকতার শিক্ষা কেবলমাত্র ধর্ম শিক্ষা বইয়ের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কখনো শেখানো হয় না, অন্যের খাতা দেখে লেখাও হলো একটি অনৈতিক কাজ ও অপরাধ। এমন শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে দেশের মেধাবী তরুণরা বিভিন্ন অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ছে।

মো. আখতার হোসেন আজাদ

মো. আখতার হোসেন আজাদ

পরিসংখ্যান মতে, দেশে মাদকাসক্তের পরিমাণ প্রায় ৮০ লাখ। এর সিংহভাগ তরুণ সমাজের সদস্য। প্রতি বছর মাদকের পেছনে ৬০ হাজার কোটির বেশি টাকা নষ্ট হচ্ছে। বিগত ১০ বছরে মাদকাসক্ত সন্তানের কাছে প্রায় দুইশ পিতা-মাতা খুন হয়েছে। পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত দেশের সিংহভাগই যুবসমাজ। সরকারের নজরদারিতে ২৪৪টি পর্নোসাইট বন্ধ হলেও বিভিন্ন কায়দায় অনায়াসেই এসব সাইটে ঢু মেরে আসা যায়। একদিকে যেমন এতে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ছে যুবসমাজ, তেমনই হারাচ্ছে সৃজনশীল চিন্তাশক্তি। এসব অশ্লীল ভিডিও দেখার ফলে তারা নানারকম যৌন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যার প্রভাবে পড়ছে সংসার জীবনে। বাড়ছে তালাকের পরিমাণ। কেবল তরুণরা পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত এমন নয়; সকল বয়সের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এই অশ্লীলতার মাদকতায় নিমজ্জিত। এমন আসক্তির ফলে ক্ষয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা, বাড়ছে ধর্ষণের পরিমাণ। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ৭৩২ জন, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন, ২০২০ সালে ১৩৪৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত বছরে বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৫২ ছেলে শিশু। এমন পরিসংখ্যানের মধ্যে রয়েছে পিতা কর্তৃক কন্যাশিশু ধর্ষণ, ভাই কর্তৃক বোন ধর্ষণ, শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী ধর্ষণের মতো লজ্জাজনক ঘটনা; যা সকলকে হতবাক করেছে।

শুধু তরুণ সমাজের মাঝে নয়, পচন ধরেছে সমাজের সর্বস্তরে। পরিবার হলো সামাজিক কাঠামোর অন্যতম প্রতিষ্ঠান। একটি শিশু মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা পায় পরিবার থেকে। কিন্তু পরিবার কাঠামোর ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ঠুনকো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য, ঝগড়া, অতঃপর বিবাহ বিচ্ছেদ। এছাড়াও সন্দেহপ্রবণতা, যৌতুক, পরকীয়া, শারীরিক অক্ষমতার দরুণ ক্রমেই ভেঙে পড়ছে সংসার। বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদের হার। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩৯টি তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। অনুপাত করলে প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি করে সংসার ভেঙে যাচ্ছে; যার খেসারত দিতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপথগামী হচ্ছে সম্ভাবনাময়ী মানবসম্পদগুলো।

নারী ক্ষমতায়ন সূচকে দেশের অগ্রগতি হলেও শহর এবং গ্রামের নারীদের অগ্রগতি সমানুপাতিক হারে হয়নি। বাল্যবিবাহের সাথে যৌতুকের বিষবাষ্প ছেয়ে আছে গ্রামীণ সমাজে। তবে বর্তমানে যৌতুকের নাম পরিবর্তন করে উপহার হিসেবে এর প্রচলন শুরু হয়েছে। আইনের প্রয়োগ না থাকা এবং মেয়ের সুখের জন্য কন্যার অভিভাবক বরপক্ষের দাবিকৃত সকল প্রকার অন্যায় আবদার মুখ বুজে মেনে নিচ্ছেন। কোনো কারণে সেসব দিতে অপারগ হলে নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়েছে ১১৭ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৫৯ জন এবং ৫২ জনকে যৌতুকের কারণে জীবন বলি দিতে হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এর পরিমাণ অনেক বেশি। লোকলজ্জা ও বিচ্ছেদের ভয়ে অনেকেই বিষয়টি গোপন বা অস্বীকার করেন।

দুর্নীতির করাল থাবায় দেশ আজ বিপর্যস্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি থাকলেও সুযোগ বুঝে যে যার মতো দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছে। পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, সড়ক পথে নানা নামে চাঁদাবাজি, চাকুরিতে আর্থিক লেনদেন বর্তমানে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালে দেশের বিভিন্ন খাত বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে সীমাহীন দুর্নীতির ভয়াবহ রূপ জাতি অবলোকন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে পৃথিবীর ১৪তম দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ। এখানেই শেষ নয়। দুর্নীতি করে দেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার পাশাপাশি প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবার ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৭৫৩ কোটি ৩৭ ডলার পাচার হয়, যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ৬৪ কোটি টাকা। সম্প্রতি দেশের সম্পদ পাচারকারীদের জাতীয় বেঈমান বলে মন্তব্য করে তাদের তালিকা প্রকাশ পূর্বক ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ প্রদান করেছেন হাইকোর্ট। কোনো এক অজানা কারণে এখনো এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। টিআইবির মতে, বাংলাদেশে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না কারণ যারা দুর্নীতির সাথে জড়িত তারা বেশ প্রভাবশালী এবং রাজনীতির ছত্রছায়ায় আশ্রিত। বিচারহীনতার অভাবেই মূলত দুর্নীতির শিকড় এতো গভীরে পৌঁছেছে বলে মত বিশ্লেষকদের।

বাংলাদেশে জনবান্ধব আইন আছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এসবের প্রয়োগ নেই। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার আইন থাকলেও দেশে প্রকাশ্য ধূমপান চলছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত দেশ ঘোষণা দিলেও তা কার্যকরে সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। খাদ্যে ভেজাল দিন দিন বেড়েই চলেছে। পঁচা, বাসি, মান ও পুষ্টিহীন খাবার খেয়ে জাতি দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী হচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও শিশুরা খাদ্যজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। লিভার, ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে দেশের মানুষ। দেশে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন’ থাকলেও এর সুফল জনগণ ভোগ করতে পারছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন থাকলেও নাগরিকরা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতা বিরোধী আইন থাকলেও সিন্ডিকেটে চাপা পড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সমাজের প্রতিটি পরতে পরতে সমস্যা যেন জড়িয়ে আছে। সমস্যা সমাধান সম্ভব হচ্ছে না দুটি কারণে। প্রথমত বাস্তবায়নে সদিচ্ছা ও লোকবলের অভাব এবং দ্বিতীয়ত এসব আইনের তেমন প্রচারণার না থাকায় জনসচেতনতার অভাব। সরকারি তথ্যমতে, দেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তবে আইএলওর প্রতিবেদনে তা ৩ কোটিরও বেশি। দেশে শিক্ষিত বেকারের হার ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি চাকুরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী করা হলেও পুঁজির অভাবসহ নানাবিধ কারণে যুবকরা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। ফলে কেউ বেছে নিচ্ছে অপরাধের অন্ধকার পথ, কেউবা আবার জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াইতে টিকে থাকতে না পেরে করছে আত্মহত্যা। দেশ শিল্প, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে গেলেও ক্রমেই বাড়ছে সামাজিক সমস্যা। এ যেন সব পেয়েছির দেশে কিছুই যেন পাইনি! মাহফুজুর রহমান প্রিয়তমার বিরহে গাইলেও দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট ভেবে আমি নিঃশব্দে গাইতে থাকি ‘ঘুমাতে পারি না সারারাত ধরে, বুকের ভেতরটা হাহাকার করে’।   (প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, ডেল্টা টাইমস্ কর্তৃপক্ষের নয়।  লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার ডেল্টা টাইমস্ কর্তৃপক্ষ নেবে না। )



মো. আখতার হোসেন আজাদ
শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম।




ডেল্টা টাইমস্/মো. আখতার হোসেন আজাদ/সিআর/জেড এইচ


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]