রোববার ১১ এপ্রিল ২০২১ ২৭ চৈত্র ১৪২৭

দেশে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি
ডক্টর এনায়েত করিম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১, ১১:২০ এএম আপডেট: ০৬.০৪.২০২১ ১১:৫৫ এএম | অনলাইন সংস্করণ

উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করাসহ পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর জন্য আলাদা একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে।

দেশে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি

দেশে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি


প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চীনে একাধিক পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বাংলাদেশে এ ধরনের স্বতন্ত্র  কোন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি এখন পর্যন্ত। ফলে এ দেশের পুলিশ সদস্যরা বঞ্জিত হচ্ছে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগসহ তাদের পেশাগত দক্ষতা অর্জন থেকে।

এ নিয়ে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। কিন্তু, সার্ভিস রুলের কারণে তারা মুখ খুলতে পারছেন না এ বিষয়ে।

সেনাবাহিনীর ন্যায় পুলিশ বাহিনীতে চাকরি পেতে বা পেশা হিসেবে পুলিশ বাহিনীকে বেছে নিতে কোন প্রাক-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনও চালু হয়নি। যারা পুলিশের চাকরিতে একবার ঢুকেছেন, তাদের জন্য নিজ বাহিনীর মধ্যে তেমন কোন উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায়, একদিকে যেমন তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না, তেমনি তারা নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারছেন না স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করে। যদিও বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় সোয়া দুই লাখ অতিক্রম করেছে।

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি যেমন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে, তা শনাক্ত করতে প্রয়োজন পড়ছে তেমনই নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি। কিন্তু পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ বা জ্ঞানার্জনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ না থাকায় তারা হাতে কলমে নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারছে না। যদিও কোন প্রশিক্ষণ নিতে হয়, তাহলে যেতে হয় দেশের বাইরে। ফলে বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে পিছিয়ে পড়ে রয়েছে ব্যাপকভাবে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়  প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ (এমপি) এর সাথে। আলাপকালে তিনি বলেন, যারা পেশা হিসেবে পুলিশকে বিছে নিতে চান, তাদের জন্য ক্রিমিনোলজি, সাইবার ক্রাইম ও আইন বিষয়ে বিশেষায়িত পড়ালেখার জন্য পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ভীষণ জরুরি। আমি সরকারকে বর্তমান পুলিশ প্রশাসনের তত্বাবধায়নে অবিলম্বে একটি পুলিশ বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুরোধ জানাই।

তিনি আরো বলেন, সাইবার ও তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে নতুন আইন প্রনয়ণ করা হলেও বাংলাদেশ পুলিশ এসব আইনের প্রয়োগ ও ব্যবহার সম্পর্কে খুবই সামান্য ধারনা রাখে, যে কারণে অনেক মামলার প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হয় বা ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল করার কারণে মামলার বিচার কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। অপরাধ তত্ত্ব ও ক্রিমিনাল আইনে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থাকলে পুলিশকে এ ধরনের মামলা পরিচালনায় কোন ধরনের বিপত্তিতে পড়তে হত না।

কথা হয়েছিল সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক-এর সাথে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর জন্য একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু পুলিশের জন্য কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আমি পুলিশ প্রধান থাকার সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজারবাগ পুলিশ হোডকোয়াটারে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের মৌখিক অনুমতি দিয়েছিলেন, কিন্তু জায়গা সংকুলান না হবার কারণে তা সম্ভব হয়নি। 

শহিদুল হক আরো বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তার আওতায় মেডিকেল কলেজ, কারিগরি ও আইন অনুষদ প্রবর্তণ করা হলে বাংলাদেশ পুলিশকে একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, যা প্রতিযোগীতামুলক বিশ্বের দরবারে সহজেই প্রসংশনীয় হবে।

আধুনিক অর্থনীতি বিনির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় পুলিশকে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হয়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংকট মোকাবেলায় পুলিশকে সমস্যায় পরতে হয়। এসব নতুন নতুন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকলে পুলিশ আরও আধুনিক সেবা নিয়ে জনগনের দোরগোড়ায় হাজির হতে পারতো বলে মনে করেন শহিদুল হক।
আমার মতে, দেশের অর্থনীতি রক্ষা ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যহত রাখতে পুলিশকে অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ জানে না অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে তাদের করনীয় কি? অপরাধ দমনের বাইরে জনগন ও দেশের অগ্রগতিতে ভূমিকা পালন করতে কি করা উচিত, পুলিশ সেসব বিষয়েও অনভিজ্ঞ। সেজন্য দরকার উচ্চ শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার উৎকর্ষ। আর এই উৎকর্ষ সাধন সম্ভব, একমাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে। 

আমি ভারতের সরদার ভল্লবভাই প্যাটেল পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে নিয়মিত পাঠদান করে থাকি। তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে যে ভাবে উচ্চশিক্ষা প্রদান করে থাকেন, তা আমাদেরও অনুসরন করা উচিত। তা না হলে আমাদের পুলিশ বাহিনী যোগ্যতার মানদন্ডে পিছিয়ে পড়বে। 

ভারতে আরও একটি পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রী ছাড়া কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে এসপির উপরে পদোন্নতি দেয়া হয় না। তাই বাংলাদেশ এমন নীতি প্রবর্তন করতে পারে বলে আমি মনে করি।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বঙ্গবন্ধু গবেষণা একাডেমির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর আনোয়ারুল করিম সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকলে বিভিন্ন পেশার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি জনবহুল দেশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠির নিত্যনৈমিত্তিক নতুন নতুন সংগঠিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা এবং পুলিশকে সত্যিকার সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে একটি পুলিশ বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনের কোন বিকল্প নেই। 

তিনি বলেন, বর্তমানে সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের জন্য বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ ও ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য পুলিশ ষ্টাফ কলেজ ছাড়া বাংলাদেশে উচ্চতর পুলিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। সাম্প্রতিক কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে পড়ানো হলেও এ বিষয়ে ব্যাপক উচ্চশিক্ষা লাভের কোন সুযোগ বাংলাদেশে নেই। তাই অবিলম্বে বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরী বলে মনে করি। 

আনোয়ারুল করিম পুলিশের একটি শক্তিশালী গবেষনা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উপরও গুরুত্ব দেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সহজতর হবে বলে তিনি ধারণ পোষণ করেন।

দেশে ১৮ কোটি জনগনের নিরাপত্তা প্রদানের বাইরেও পুলিশকে বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, কিন্তু উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও আধুনিক জ্ঞান না থাকার করণে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ আশানুরুপ সাফল্য প্রদর্শণ করতে সক্ষম হয় না। সে ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করণে পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কোন বিকল্প নেই। 

পেশাগত উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ডক্টর মোঃ নাজিবুর রহমান অতিসম্প্রতি বলেন, পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বর্তমানে সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের প্রাণের দাবি। উচ্চ শিক্ষার স্বদিচ্ছা থাকা সত্বেও অনেক পুলিশ সদস্য সুযোগের অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে বঙ্গবন্ধু পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়  স্থাপনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি কামনা করছি। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে শুধু বাংলাদেশ পুশিল সদস্যরাই পড়ালেখার সুযোগ পাবেনা, বরং দেশি-বিদেশী সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ এবং ছাত্র-ছাত্রীরাও উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। এতে ভবিষ্যতে পুলিশে দক্ষ জনবল তৈরি নিশ্চিত হবে। পেশাগত উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ডক্টর মোঃ নাজিবুর রহমান অতিসম্প্রতি বলেন, পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বর্তমানে সর্বস্তরের পুলিশ সদস্যদের প্রাণের দাবি। উচ্চ শিক্ষার স্বদিচ্ছা থাকা সত্বেও অনেক পুলিশ সদস্য সুযোগের অভাবে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে বঙ্গবন্ধু পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়  স্থাপনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি কামনা করছি। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে শুধু বাংলাদেশ পুশিল সদস্যরাই পড়ালেখার সুযোগ পাবেনা, বরং দেশি-বিদেশী সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ এবং ছাত্র-ছাত্রীরাও উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। এতে ভবিষ্যতে পুলিশে দক্ষ জনবল তৈরি নিশ্চিত হবে। 

লেখক: ডক্টর এনায়েত করিম, প্রেসিডেন্ট, গ্লোবাল ইকোনমিস্ট ফোরাম 





ডেল্টা টাইমস্/ডক্টর এনায়েত করিম/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]