মঙ্গলবার ১৮ মে ২০২১ ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

বর্তমান সভ্যতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবন
অলোক আচার্য
প্রকাশ: বুধবার, ৭ এপ্রিল, ২০২১, ১০:৩৮ এএম আপডেট: ০৭.০৪.২০২১ ১১:০৮ এএম | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের জীবন নানা কারণে আজ অনিরাপদ। সভ্যতার উত্তরণের সাথে সাথে মানব জীবন আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠছে। অথচ মানুষ জীবনকে নিরাপদ করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। একটির সমাধান করতে না করতে নতুন সমস্যা সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এই যেমন কোভিড-১৯ ভাইরাসের কথা বলা যায়। কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডবলীলার সাথে যখন পৃথিবীর মানুষ গত বছর প্রথমবারের মতো পরিচিত হয় সেই তখন থেকেই এই ভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছিল বিভিন্ন সংস্থা,দেশের কতৃপক্ষ। বারবার জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে জনগণকে অনুপ্রাণিত,উৎসাহিত এবং শেষ পর্যন্ত বাধ্য করার চেষ্টাও করা হয়েছে। এই মহামারীতে বিশে^র ২১৯ দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের প্রাণ নিয়েছে এই ভাইরাস। চলতি বছরে এসে আবারো সারা পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরু হয়েছে। প্রতিদিন এই সংখ্যার সাথে নতুন সংখ্যা যোগ হচ্ছে। আমাদের দেশে এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত মানুষ বহু মারণব্যাধী জয় করেছে। হাম,রুবেলা,গুটিবসন্ত,যক্ষা প্রভৃতি রোগ একসময় ছিল আতংকের নাম। এখন তা নেই। এখন আতংক করোনা ভাইরাস। যার সাথে এই সময় মানুষ যুদ্ধ করছে। 

বর্তমান সভ্যতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবন

বর্তমান সভ্যতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবন

করোনা ভাইরাসের উৎপত্তির বহু খোঁজ করা হয়েছে। বেশ কিছু তথ্যও এসেছে। উৎপত্তি যেখানেই হোক এখন তা সারা পৃথিবীর। এভাবেই কোনো ভাইরাসের জন্ম হয় আর তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরে। একজন থেকে অন্যজনে। অথবা কোনো প্রাণী থেকে মানুষে। স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো নিশ্চয়তা আজ অনেক কম। বাড়ির বাইরে পা ফেললেই যেন বিপদের হাতছানি। সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে মারণব্যাধি কোনোকিছু থেকেই যেন রেহাই মেলে না। বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে যেন মৃত্যু ওত পেতে আছে। এসব অনাকাঙ্খিত মৃত্যু মানুষকে কষ্ট দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের কিছুই করার থাকে না। আমরা বহু বছর ধরেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বহু লেখালেখি,ছাত্রআন্দোলন,আইন এবং আরো বহু উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে। বন্ধ হয়নি দুই পরিবহণের ভেতর অশুভ প্রতিযোগীতা। মানুষের জীবনও চলছে আবার সড়ক দুর্ঘটনাও চলছে। এত উদ্যোগের পর দুর্ঘটনার হার হ্রাস পাওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে না। যদি সম্প্রতি করোনার তান্ডবে বাকি সব চোখ না পরার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে করোনা একসময় বিদায় নেবে। মানুষই এটা করবে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার মতো সমস্যা কে বিদায় করবে? চেষ্টা তো কম হয়নি। পত্রিকার পাতা খুললেই বিভিন্ন স্থানের এই সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর দেখি। সাবধান হয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। শেষে একেবারেই ভাগ্য নির্ভর হয়ে গাড়িতে উঠতে হচ্ছে। কারণ তারপর আর যাত্রীর কিছুই করার থাকে না। এসব কারণ ছাড়াও তো মানুষ মরছে। বহু অনাকাঙ্খিত কারণেই সেসব মৃত্যু ঘটছে। বিষাক্ত খাদ্য আমাদের শরীরে প্রতিদিন প্রতিবেলায় ঢুকছে। আমাদের সুস্থ দেহ অসুস্থ হচ্ছে। ডাক্তারের কাছে ছুটছি। তারপর আবার গেন ভেজাল খাদ্যে পেট ভরছে। এভাবেই চলছে। আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। আমরা যেন এটা প্রায় মেনেই নিয়েছি। বাজার থেকে যা কিনছি এবং যা খাচ্ছি তা কতটা স্বাস্থ্য সম্মত তা যাচাই করার উপায় আমাদের নেই। চোখের সামনে যা দেখছি তা খাচ্ছি এবং পরিবারকেও খাওয়াচ্ছি। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। নিরাপদ জীবনের গ্যারান্টি চাওয়া মানুষের জীবন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন করতে হচ্ছে। নগরীর বিষাক্ত বাতাস টেনে ফুসফুসে জড়ো করছি। এভাবে মানুষই যেন এক জড়ো পদার্থে পরিণত হয়েছে। এরকম আরো এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর নাম সিলিন্ডার বিস্ফোরণ।  

বাড়িতে, গাড়িতে সর্বত্রই হঠাৎ মৃত্যুর হাতছানি। এর মধ্যে গত ক্রমেই মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। মাঝে মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটছে। যারা বেঁচে থাকছে তাদেরও কঠিন মৃত্যু যন্ত্রণা নিয়ে সারাজীবন কাটাতে হচ্ছে। পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সারা জীবন বহন করতে হচ্ছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু ঘটছে। বোতলজাত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণ। ফলে বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা গ্যাস সিলিন্ডার যেমন অনিরাপদ হয়ে উঠছে সেই সাথে রাস্তায় গাড়িতে এবং কারখানায়ও ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের জীবনে যোগ হয়েছে নতুন সংশয়। অনিরাপদ হয়ে ওঠা মানুষের জীবনে নতুন নতুন বিপদ আসছে। দেশে বোতলজাত গ্যাসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনযাত্রাকে একটু সহজ করতে সবাই সিলিন্ডার গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে। আর এতেই বিপত্তি ঘটছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্ফোরক অধিদপ্তর,ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রের তথ্যে উল্লেখ করা হয়, গত এক বছরে প্রায় ২০০ সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। এগুলোর বেশিরভাগ বাসাবাড়িতে এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা। ২০১৯ সালে সারাদেশে প্রায় ৮০ টি এলপিজি সিলিন্ডার বিস্ফোরণ দুর্ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এলপি গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর সিলিন্ডার বিষয়ে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ব্যবহৃত সিলিন্ডারটি ব্যবহারের উপযুক্ত কি না সেটা দেখতে হবে। একটি সিলিন্ডারের নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। খুচরা পর্যায়ে যথাতথা ব্যবহারের ফলে সেই সিলিন্ডার ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে সেটি কতদিন ব্যবহার করা যাবে তা যাচাইপূর্বক বাতিল করা প্রয়োজন। এটি কতৃপক্ষের আরও পর্যবেক্ষন করা প্রয়োজন। ক্রটিপূর্ণ,ক্ষতিগ্রস্থ বা মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার যেন কোনোভাবেই বাজারে না থাকে তা দেখভাল করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে সিলিন্ডার বাড়িতে ব্যবহারেও। সামান্য একটু অবহেলা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। 

মানুষের মৃত্যুঝুঁকি আজ নানা কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও মানুষের লক্ষ্য একটি নিশ্চিত জীবন। সেই লক্ষ্যেই সে উপার্জন করছে। সেই লক্ষ্যেই প্রতিদিন কাজ করছে। কিন্তু তা পাচ্ছে না। কারণ সেই মানুষই। দুর্ঘটনা শব্দটির ভেতর আজ বহু মৃত্যু রয়েছে যেখানে একটু সচেতন হলেই রোধ করা যায়। একটু দায়িত্বশীল আচরণ করলেই এ ধরনের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতো। মানুষের লোভের পরিমাণ একটু কমালেই অনেকের জীবন নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখা যেতে পারে। কিন্তু সে পথে আমরা হাঁটছি না। আমরা অন্যকে ঠকাচ্ছি এবং সেই সাথে নিজেরাও প্রতারিত হচ্ছি। অবহেলা শব্দটি আজ আমাদের জীবনের সাথে জুড়ে গেছে। আমরা আমাদের জীবনকে অবহেলা করছি। প্রতিযোগীতার নামে অসুস্থ সমাজের দিকে ঠেলে দিচ্ছি মানব সভ্যতাকে। কে কত দ্রুত ধনী হতে পারে, কার কত টাকা আছে, কার নামে কত সম্পদ হয়েছে, এসব হিসাব নিকাশে ব্যস্ত আছি। কিন্তু কে কতভাবে সমাজকে নোংরা করছি সেই পরিমাপ করছি না। কারণ এই সমাজের মাপকাঠি অর্থ। যেখানে জীবনের মূল্য নেই। মানুষের জীবন নিরাপদ করতে হলে, সুস্থ করতে হলে মানুষের মনের পরিবর্তন করতে হবে। সেই পরিবর্তন হবে মানুষের জন্য মানুষ। আর তা না হলে এভাবে অনিরাপদ জীবনের লক্ষ্যেই প্রতিদিন মানুষ ঘর থেকে বের হবে। যেখানে থাকবে শুধু অনিশ্চয়তা। 


লেখক : শিক্ষক ও কলামিষ্ট পাবনা।






ডেল্টা টাইমস্/অলোক আচার্য/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]