মঙ্গলবার ১৮ মে ২০২১ ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা জরুরি
আনন্যামা নাসুহা নুহিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১, ৯:২০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে মে দিবস এক স্মরণীয় অধ্যায়। মেহনতি শ্রমিকের আত্মদানে প্রতিষ্ঠিত মে দিবস’ পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক দিবসে। মে দিবস আজ হাজার হাজার শ্রমিকের পায়ে চলা মিছিলের কথা, আপসহীন সংগ্রামের কথা বলে।  মে দিবস সকল শ্রমিকদের এক হওয়ার ব্রত। আন্তর্জাতিক সংগ্রাম আর সৌভ্রাতৃত্বের দিন। প্রতি বছর সারা বিশ্বে এই দিনটি পালিত হয় প্রতীকী দিন হিসেবে।

১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগাে নগরীর লক্ষ লক্ষ শ্রমিক দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে সর্বাত্মক ধর্মঘট শুরু করে। তাদের ব্যাপক। আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ৩ ও ৪ মে। কিন্তু আন্দোলনের কণ্ঠরােধ করার জন্য পুলিশ গুলি চালায় এবং ১০ জন শ্রমিক প্রাণ হারায়।  সেই সঙ্গে বহু শ্রমিক আহত হয়। গ্রেফতার হয় অগণিত শ্রমিক। গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে ৬ জনকে পরে ফাসিতে ঝুলানাে হয়। জেলখানায় বন্দি অবস্থায় আত্মহনন করেন এক শ্রমিক নেতা। শ্রমিক আন্দোলনের এই গৌরবময় অধ্যায়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিশ্বের সকল দেশেই মর্যদার সঙ্গে পালিত হয় মহান মে দিবস।

বস্তুত মে দিবসের পথ ধরেই শ্রমিকদের নানা অধিকার অর্জিত হয়েছে।  উন্নত দেশে এখন শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি কাজের পরিবেশও হয়েছে উন্নত। তবে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমিকশ্রেণীর দুর্দশা ঘোচেনি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হলেও তা মানা হচ্ছে না।

অনেক বেসরকারি শিল্পকারখানায় আইএলও নির্ধারিত শ্রমঘণ্টাও মানা হয় না। দেশে শ্রমিকশ্রেণী শুধু ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণও বটে। আগুনে পুড়ে ও ভবন ধসে প্রায়ই মরতে হয় তাদের। এ অবস্থার অবসান ঘটিয়ে তাদের জীবন ও শ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মে দিবসে শ্রমিকশ্রেণীর মানবেতর জীবনের অবসান ঘটানোর অঙ্গীকার করতে হবে আমাদের সবাইকে।

করোনা ভাইরাসের কারনে টানা লকডাউনের কারনে শ্রমজীবী মানুষদের দুর্দশা এখন চরমে।বিশেষ করে রিকশাওয়ালা, হকার কিংবা সরকারের ট্রেড লাইসেন্স ও শ্রম আইনের অধীনে নেই এরকম অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কয়েক কোটি শ্রমজীবীর ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।শ্রমিক সংগঠনগুলো বলেছে, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক শিল্পে এরই মধ্যে ৭০ হাজারের মতো শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা জরুরি

দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য প্রণোদনা জরুরি


এক্ষেত্রে মহামারির মধ্যে কোন শ্রমিককে ছাঁটাই করা যাবেনা এবং কোন কারখানা লে-অফ করা হবে না-শ্রমিকের বেতন-মজুরি বা খাবার, মালিকরা তাদের সাধ্যমতো দেবেন। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যে থমকে গেছে, তার চাপে গার্মন্টস সহ বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকদের সংকট বাড়ছে, সেটা সামাল দেয়ার জন্য কার্যকর  পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সারাদেশে অসহায় এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে যে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যান ফাউন্ডেশন আইন ২০০৬ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত যে কোন শ্রমিক যিনি কোন প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরি বা কোন ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরী বা অর্থের বিনিময়ে কোন দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক বা কারিগরী, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানীগিরি কাজ করিবার জন্য নিযুক্ত হন তাকেই শ্রমিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের জন্যও আমরা শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে প্রমাণিত খাতগুলো হচ্ছে—উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণ। যার পুরোটাই শ্রমিক নির্ভর। অথচ আমরা কখনই তাদের কাজ, একাগ্রতার মূল্যায়ন করছিনা।

সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে শিশু শ্রমিক নিয়োগ এখনও অব্যাহত আছে। নারী শ্রমিকরা শিকার হচ্ছেন মজুরি বৈষম্যের। বিশ্বায়নের যুগে উদারীকরণ নীতিও শ্রমিক স্বার্থে আঘাত হানছে বলে বিভিন্ন মহলের জোরালো মত রয়েছে।

বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি কোম্পানিগুলোর ওপর এক জরিপের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে জেট্রো। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে উৎপাদনশীল খাতে একজন শ্রমিকের ভিত্তি মজুরি (বেজ স্যালারি) গড়ে মাসে ১১১ ডলার, যা এশিয়ার ১৫টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে এ মজুরি ১২৪ ডলার। লাওসে ১৪১ ডলার ও শ্রীলঙ্কায় ১৬৫ ডলার। আর ভারতে এ মজুরি ২২৪ ডলার ও পাকিস্তানে ২০৮ ডলার।

নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টার সঙ্গে বেতনবৈষম্য দূর করা, ন্যূনতম মজুরি, নিয়োগপত্র প্রদান এর মত বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বব্যাপী ট্রেড ইউনিয়নগুলো শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই  কাজ হারিয়ে দলে দলে ফিরে এসেছে বহু মানুষ। তাদের সেই অসহায় ছবি প্রতিনিয়ত ভেসে উঠেছে করোনার প্রথম ধাপে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের পর্দায়। অনেকে আবার ফিরতে না পেরে আটকে রয়েছে বিভিন্ন দেশে। কোনওরকমে সামান্য সাহায্যে তাদের মুখে জুটছে আহার, সেটাও অনিশ্চিত, কারোর কারোর হয়তো সেটাও জুটছে না নিয়মিত।

ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎ আজ সম্পূর্ণই অনিশ্চিত।  এলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করছেন। তবে বর্তমান অবস্থায় আরো বাড়াতে হবে প্রণোদনার পরিমান। এক্ষেত্রে যেসব নিম্নআয়ের মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে সমাজের বিত্তবানদের। করোনাকালীন সময়ে ঋণ ফেরত না দিলেও কাউকে ঋণখেলাপী ঘোষণা না করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দিতে হবে সরকারের। শ্রমজীবীদের বিনামূল্যে করোনা ভ্যাক্সিন নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে যারা রপ্তানি খাতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সরাসরি যুক্ত।
 
এবারের শ্রমিক দিবসে শ্রমিকদের কাজ অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হোক এবং করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের অবস্থা বিশেষ ভাবে বিবেচনা করে সরকার যেন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এমনটাই প্রত্যাশা।


আনন্যামা নাসুহা নুহিন
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


ডেল্টা টাইমস্/আনন্যামা নাসুহা নুহিন/সিআর/জেড এইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]