মঙ্গলবার ১৮ মে ২০২১ ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা ও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে
এ্যাড. বাবুল রবিদাস
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১, ৫:০২ পিএম আপডেট: ০৪.০৫.২০২১ ৫:১১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা ও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গে
হিন্দু সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জাতিভেদ প্রথা। হিন্দুরা যেখানেই যায়, সেখানেই তারা জাতিভেদ প্রথাকে বহন করে চলে এবং যে সমস্ত দেশ জাতিভেদ প্রথার প্রচলন নেই। সেই সমস্ত দেশে গিয়েও হিন্দুরা জাতিভেদ প্রথাকে কঠোরভাবে মেনে চলার চেষ্টা করে।
জাতিভেদ প্রথা সমগ্র দেশের বিশেষ করে অনুন্নত সমাজের অসীম ক্ষতিসাধন করেছে। জাতব্যবস্থা সমতা, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের একতা নষ্ট করে দিয়েছে এবং হিন্দুদেরকে হাজার হাজার ছোট ছোট জাতি বা সম্প্রদায়ে ভাগ করেছে। জাতিভেদ প্রথা হিন্দুদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করতে দেয়নি। গণতন্ত্রের ভিত্তি হল সাম্য, মৈত্রী বা ভ্রাতৃত্ববোধ এবং স্বাধীনতা। তাই জাতিভেদ প্রথা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিরোধী। অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক জাতব্যবস্থা সমাজকে দূর্নীতিপরায়ণ করে তোলে এবং সমাজের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের পথে প্রবল বাধা সৃষ্টি করে।

সমাজতত্ত্ববিদরা এ বিষয়ে একমতপোষণ করে বলেন যে, সবর্ণে বিবাহ অর্থাৎ বর ও কনের একই জাতি হওয়া এবং অসবর্ণ বিবাহ নিষিদ্ধ করাই জাতিভেদ প্রথার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বেশীরভাগ লেখক জাতিভেদ প্রথা বলতে কি বোঝায় তাই লিখেছেন। কিন্তু ডঃ আম্বেদকর জাতিভেদ প্রথা হিন্দু সমাজে কেন এলো, এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং জাতিভেদ প্রথা উচ্ছেদের জন্য পথের সন্ধানও দিয়েছেন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এই যে, এশিয়া মহাদেশের কোন পণ্ডিত বা মহাপুরুষ তথা অবতার আজ পর্যন্ত জাতিভেদ প্রথা দূর করা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। জাতিভেদের কারণ কি, কেন জাতিভেদের উৎপত্তি হল? এই সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে ডঃ আম্বেদকর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। তাই ডঃ আম্বেদকরের রচনাবলী ও বক্তৃতার মধ্যে ভারতের সমাজব্যবস্থা তথা জাতিভেদ প্রথা সম্বন্ধে প্রকৃত তত্ত্ব ও তথ্য পাওয়া যায়।

এমনকি স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত জাতিভেদ প্রথার মূল কারণ অনুধাবন করতে পারেন নি। বিবেকানন্দের মতে জাতিভেদ একটি সামাজিক প্রথা। হিন্দু বিশ্বাসের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু ডঃ আম্বেদকর প্রমাণ করেছেন, জাতিভেদ প্রথা হিন্দু বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হিন্দুবিশ্বাসের ভিত্তি হল চতুর্বর্ণ। আবার সেই চতুর্বর্ণ তত্ত্বই হল জাতিভেদ প্রথার উৎপত্তির কারণ। ভেবে অবাক হই যে, স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত এই সহজ সত্যটুকু বুঝতে পারেন নি কেন? ইতিহাসে দেখা যায় যে, ভগবান বুদ্ধের পর আজ পর্যন্ত কোন মহাপুরুষ চতুর্বর্ণের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান নি। একমাত্র ডঃ আম্বেদকরই সেই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বিবেকানন্দের ভক্ত পাঠকরা হয়ত এমন মন্তব্যে অসন্তুষ্টু হতে পারেন। তাই যে কোন বিক্ষুব্ধ পাঠককে আহ্বান জানাচ্ছি যে, তিনি যদি একথা প্রমাণ করতে পারেন যে, স্বামী বিবেকানন্দ তার লেখা ও বক্তৃতার মধ্যে কোথাও বলেছেন যে, হিন্দবিশ্বাসের চতুর্বর্ণ তত্ত্বই জাতিভেদের মূল কারণ। ইতিহাসে বুদ্ধদেবের পর একমাত্র ডঃ আম্বেদকরই জাতিভেদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং বলেছেন যে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি বর্ণ থেকেই জাতিভেদের সৃষ্টি হয়েছে।

সমাজের বর্তমান সমাজব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়তে জাতিভেদের মূলে কুঠারাঘাত হানার জন্য সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা পোষণকারী সকল দেশের সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে ঙৎফরহধহপব জারি করে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি শব্দের প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা। উক্ত ঙৎফরহধহপব-এ এই বিধি থাকা দরকার যে, কেহ পত্র-পত্রিকা বা পুস্তকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি শব্দ এক সঙ্গে বা পৃথকভাবে লিখতে ও প্রকাশ করতে পারবেন না। করলে তাকে এক বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অনেক পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন যে, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র শব্দের পরিবর্তে কি ব্যবহার করা উচিত? এই প্রশ্নের জবাবে বলা যায় যে, সেখানে সকলেই শুধু হিন্দু শব্দ ব্যবহার করবেন। জাতের বা সম্প্রদায়ের কোন উল্লেখ থাকবে না। থাকবে শুধুমাত্র হিন্দুজাতি।

সমাজের চিন্তাশীল নেতারা যতদিন বর্ণাশ্রম বা জাতির স্বীকৃতি মেনে চলবেন ততদিন কার্ল মার্কস নির্দেশিত সাম্যবাদ বা সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে গণতন্ত্র কিছুতেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চতুর্বর্ণ তত্ত্ব সমাজের মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বীজ রোপন করে রেখেছে। স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ মহাপুরুষগণও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চতুর্বর্ণ তত্ত্বের কথা বলতে সাহস পান নি।

ব্রাহ্মণ্যবাদের মূল ভিত্তি হল চতুর্বর্ণ তত্ত্ব। হিন্দুরা যতদিন বর্ণবিশ্বাসের মাহাত্ম্য ভুলতে বা ত্যাগ করতে না পারবে, ততদিন হিন্দু সমাজের প্রকৃত মুক্তি আসতে পারে না। জাতিভেদ প্রথা জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই প্রথা গণতন্ত্র বিজ্ঞান ও দেশের উন্নতির পরিপন্থী। হিন্দুরা যতদিন বর্ণবিশ্বাস বা জাতব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করতে না পারবে, ততদিন হিন্দু সমাজে ঐক্য বা মুক্তি আসবে না।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু:
সংখ্যালঘু বলতে বুঝায় সংখ্যায় কম। এই রকম সব দেশেরই কোন না কোন জাতি সংখ্যায় কম। প্রায় প্রত্যেক দেশেই সংখ্যালঘুদের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে তারা সংখ্যাগুরুদের সাথে সামঞ্জস্যভাবে চলতে পারে। সংখ্যালঘুদের এখানে নিজের যোগ্যতায় টিকে থাকতে হয়। এদেশের সংখ্যাগুরুদের মধ্যে অনেক ভাল মানুষ আছে বলেই এ দেশে সংখ্যালঘুরা এখনো টিকে আছে। তবুও কিছু দুর্বৃত্তের কারণে এখন এতই অতিষ্ট হয়ে গেছে যে পালিয়ে বাঁচি এই রকম মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা হচ্ছে, হিন্দু, বুদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং আদিবাসীরা। তাদের সংখ্যার শতকরা হিসেব নিম্নে দেওয়া হলো ঃ

এই দিনের পত্রিকায় বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে হিন্দু কমেছে ৯ লক্ষ। ২০১৫ ইং সালের হিসাব মোট জনসংখ্যার ১০.৭ শতাংশ হিন্দু। আগের বছর ছিল ৯.৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসস্টিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল‒ ২০১৫ সালের মোট জনসংখ্যার ১৫ কোটি ৮৯ লাখ। সেই হিসাব মতে হিন্দুর সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। ২০১৪ সালের দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৬৮ লাখ। এই হিসাব ধরে তখন হিন্দুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৫ লাখ। এরমানে ০১ বছরের ব্যবধারে হিন্দু জনগোষ্ঠী বেড়েছে ১৫ লাখ [দৈনিক প্রথম আলো: ২৩ জুন, ২০১৬ইং]। উক্তকথাগুলো বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন স্থানে হিন্দু জনসাধারণের ঘর-বাড়ী ভাংচুর, সম্পত্তি দখল, নির্যাতন, হত্যা, প্রতীমা ভাংচুর, আগুন দেওয়ারমত খবর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, যা চিন্তার বিষয়। এখন দেখা উচিত কেন হিন্দুদের এই অবস্থা, কি ছিল, এখন কি এর প্রতিকার?

হিন্দুদের করণীয় ঃ
উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, ধনী-গরীব, দলিত-বঞ্চিত, আদিবাসী তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সকল শ্রেণীর হিন্দু জনগণের মধ্যে আন্তরিক মিলন, ঐক্য, সমতা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব আজ কাম্য। সকল ভেদাভেদ ভুলে হিন্দুদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে নিতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি কখনো অধিকার আদায়ে লড়াই সংগ্রামে সফলতা প্রাপ্ত হয় না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, দলিত, অন্ত্যজ, চণ্ডাল, হরিজন পরিচয় ভুলে এক ছত্রছায়ার নিচে আসার মনোভাব তৈরি করতে হবে। অতীতের সকলের পদবী পরিত্যাগ করতে হবে। কর্মের দ্বারা কাউকে ছোট-বড় বা ঘৃণা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। চতুর্বর্ণ প্রথা ভুলে বা বর্ণ-গোত্র গোড়ামী ত্যাগ করে হিন্দু হলেই ভাই ভাই ভাবতে হবে। সকলের সাথে আত্মীয়তার প্রবণতা সৃষ্টি করতে হবে। একজনের বিপদে আরেকজন ছুটে আসার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। ধনী-গরীব ছেলে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে উপবৃত্তি পদ্ধতি চালু করতে হবে। এই মাতৃভূমিতে জন্ম আমার এ মাতৃভূমিতেই মৃত্যু হবে আমার এমনটাই সবসময় ভাবতে হবে। পিপিলিকার মতো সকল হিন্দু জাতিকে একত্র থাকতে হবে। একতাই বল। ঐক্য থাকলে সকল আপদ-বিপদ পালিয়ে যাবেই। পরিণতিতে হিন্দু জাতি এদেশে সংখ্যায় কম হলেও ভবিষ্যতে তারা টিকে থাকবে।
লেখক:এ্যাডভোকেট
জজ কোর্ট, জয়পুরহাট।





ডেল্টা টাইমস্/বাবুল রবিদাস/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]