মঙ্গলবার ১৫ জুন ২০২১ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সমাজ শুদ্ধতায় নৈতিকতার প্রসার জরুরি
আবু মো. ফজলে রোহান
প্রকাশ: বুধবার, ৫ মে, ২০২১, ১:৫৬ পিএম আপডেট: ০৫.০৫.২০২১ ২:০৪ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

সমাজ শুদ্ধতায় নৈতিকতার প্রসার জরুরি

সমাজ শুদ্ধতায় নৈতিকতার প্রসার জরুরি

মানবজীবনকে সুশৃঙ্খল, সুন্দর, সৌন্দর্যমন্ডিত করে গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম হলো মোরালিটি তথা নৈতিকতা। নৈতিকতা হলো মানবমনের উচ্চ গুণাবলি। জীবনকে কল্যাণকর করে গড়ে তোলার জন্য সব মানুষকে নৈতিক গুণে গুণান্বিত হওয়া প্রয়োজন। একটি দেশকে উন্নত এবং সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য নৈতিকতা আবশ্যক। বিশ্বের মানচিত্রে যত উন্নত রাষ্ট্র দৃশ্যমান, সবার উন্নতির পেছনে রয়েছে নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার ইতিহাস। যে রাষ্ট্রে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে, সেখানে জটিল আইন প্রয়োগের মাধ্যমেও অন্যায়, অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি সহ বহুবিধ অন্যায় কার্যকলাপ বন্ধ করা সম্ভবপর নয়। আইন কেবল মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। মানুষের মন বা মানসিক অনুভূতির সাথে আইনের প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু নৈতিকতা মানসিক আচরণসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি বাহ্যিক আচরণকেও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নৈতিকতার পরিধি আইনের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। অধ্যাপক ম্যাকাইভার এজন্যই বলেছেন,  Law doesn't and can't cover all grounds of morality.। শুধুমাত্র আইন-ই নাগরিক জীবন নিয়ন্ত্রনের জন্য যথেষ্ট নয়। 

বর্তমান সমাজে নানারকম দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটায় নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে দুর্নীতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। কোনো রকম অন্যায়ই যেন আজ অপরাধ বলে বিবেচিত হয় না। নীতিভ্রষ্ট মানুষ নিজেকে অপরাধী বলে গণ্য করে না। দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তশালী হয়েও সংকোচবোধ করে না, বরং অর্থের অহংকারে গৌরবান্বিত হয়। 

ধর্ষক গ্রেফতার হয়েও মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে কোর্টে হাজিরা দিতে যায়। জঘন্য অপরাধ করেও লজ্জাবোধ করেনা, রাজনৈতিক আশ্রয়ে লালিত-পালিত হয়। নিশ্চিত প্রমাণ থাকার পরেও প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে হত্যাকারী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরে।
এভাবে দেশে একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকান্ডের পেছনে নৈতিক মূল্যবোধের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অনেকে হয়তো বলবে এসবের কারণ বিচার বিভাগের পরাধীনতা অথবা সুশাসন না থাকা। অথচ আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সুশাসন নিশ্চিতকরণের জন্য নৈতিক মূল্যবোধের প্রয়োজন আছে। কেননা নৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া কেউ আপনা-আপনি ক্ষমতা বিসর্জন দিয়ে বিচার বিভাগকে স্বাধীনতা দিয়ে দিবেনা, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হবেনা।

সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের প্রচার প্রসার ও উন্নতি সাধন না হলে সারাজীবন আন্দোলন করেও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা যাবে না, ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। নৈতিকতা কোনো কাজকে উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদির মানদন্ডে বিচার করে। আইন সেভাবে বা সে মানদন্ডে বিচার করেনা। যেমন, সিট বেইল বাঁধা ছাড়া গাড়ি চালানো অথবা আলো ছাড়া গাড়ি চালানো, রাস্তার বাম পাশের  পরিবর্তে ডান পাশে গাড়ি চালানো নৈতিকতা বিরোধী নয়, কিন্তু বেআইনি। অন্যদিকে কারো মনে কষ্ট দেয়া, গালমন্দ করা, মিথ্যা কথা বলা আইনবিরোধী নয়, কিন্তু নৈতিকতা বিরোধী। সুতরাং আইনবোধ সব ক্ষেত্রে এবং সব সময় এক হতে পারে না। সমাজের বিশৃঙ্খলা, কুপ্রথা অন্যায়-অবিচার দুরীকরণের ক্ষেত্রে নৈতিকতা প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। অতীতের ইতিহাস থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। এক সময়ে ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথা, সহমরণ প্রথা স্বীকৃত ছিল। ব্রিটিশ সরকার আইন করে তা নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশ সরকারের এরূপ আইন করার পেছনে কাজ করেছে নৈতিকতা। নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ না ঘটলে হয়তো এখনো সমাজে সহমরণ প্রথা থেকে যেতো। অর্থাৎ মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের ফলেই আইন বাস্তবায়ন হয়। যখন কোনো আইন নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে তখনই তা জনগণ কর্তৃক সমাদৃত হয়। নৈতিকতা বিরোধী আইন কোনো দিনই জনসমর্থন লাভ করেনি এবং টিকেও থাকেনি। যে দেশের নৈতিক মূল্যবোধের মান খুব নিচু, সে দেশের আইন কখনো উচ্চমান সম্পন্ন হতে পারেনা। কারণ মানুষের নৈতিকতাবোধ রাষ্ট্রীয় আইনকে প্রভাবিত ও সাহায্য করে। তাই কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে হুট করে রাস্তা অবরোধ করে 'ফাঁসি চাই' 'ফাঁসি চাই' স্লোগান দেয়ার পূর্বে নৈতিক মূল্যবোধের প্রসারতা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। কারণ আমাদের আন্দোলনের মুখে পড়ে সরকার যদিও 'ধর্ষণের শাস্তি ফাঁসি' আইন করে দেয় ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবেনা কিংবা আইন করার পরে সুষ্ঠু বিচার পাওয়া যাবে কিনা -তাও সন্দিহান। অন্যান্য অনেক অন্যায় অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর আইন থাকার পরেও সেগুলো কতটুকু কমেছে, কতজন বিচার পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে? ভেবেছেন কি? 

"আইন সবার জন্য সমান" - এ স্লোগান কাগজে কলমে লিখা থাকলেও বাস্তবে কতখানি রয়েছে তা বলা অনর্থক। যে যত প্রভাবশালী, তার অপরাধ ততো বেশি। আইনের কোনো তোয়াক্কা নেই। এসব প্রভাবশালী অপরাধীদের শাস্তিদান এবং ধর্ম, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে অপরাধীর শাস্তি বিধানের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রয়োজন। আর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রদানের ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধ বিস্তারের বিকল্প নেই। 

নৈতিকতার বিস্তারে ধর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা আমাদের প্রিয় নবী (স.) স্বয়ং নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসে নববীতে এমন অনেক বাণী রয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য প্রায় সকল ধর্মেও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। অতএব কেউ যদি সত্যিকারার্থে ধার্মিক হয় তার পক্ষে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটা কষ্মিনকালেও সম্ভব নয়।

দেশ ও জাতির সার্বিক অবনতি ঠেকানোর স্বার্থে জীবন থেকে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সমাজের সর্বস্তরের অপরাধের অবসান ঘটাতে নৈতিকতার প্রসার প্রয়োজন।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, দারুন্নাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসা, ঢাকা








ডেল্টা টাইমস্/সিআর/আরকে


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]