মঙ্গলবার ১৫ জুন ২০২১ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

শরীয়াহ আইনে বহুবিবাহ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
মোহাম্মাদ বুস্তানী
প্রকাশ: বুধবার, ৫ মে, ২০২১, ২:৪০ পিএম আপডেট: ০৫.০৫.২০২১ ২:৪৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

শরীয়াহ আইনে বহুবিবাহ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

শরীয়াহ আইনে বহুবিবাহ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিবাহ হল সবচেয়ে পুরাতন প্রতিষ্ঠান এবং সকল সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। ইসলামী আইনবিজ্ঞানে এটি আক্দ বা বন্ধন বলে পরিচিত। বিপরীত লিঙ্গের দুটি আত্মার মিলন, সন্তানের বৈধতা পাওয়া ও প্রজননের জন্য সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এটিকে। দুজন নারী-পুরুষের একসাথে বসবাসের জন্য পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে এই সুখযাত্রাটি শুরু হয়। বিয়ে শুধুমাত্র কোন নাম-সর্বস্ব একটি অনুষ্ঠানই নয়। এটি যেমন পারিবারিক জীবনের সূচনা তেমনি মানব জীবনের পবিত্র কাজ, উন্নত পদক্ষেপ এবং সুখী জীবনের নিয়ামক। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক কিছু অধিকার ও কর্তব্যের জন্ম হয়ে থাকে। পার্থিব জীবনের পথ চলায় নারী-পুরুষের মধ্যে এই আইনসিদ্ধ ও সামাজিকভাবে মঞ্জুরকৃত বন্ধনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ।

ইসলামী শরীয়া আইনে, একজন নারীকে একসাথে একজন পুরুষ স্বামী হিসেবে  গ্রহণ করার অনুমতি দিলেও পুরুষের ক্ষেত্রে শর্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ চারজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব আরবে একজন পুরুষ বিনাবাধায় অসংখ্য স্ত্রী গ্রহণ করতে পারতো এবং তাদের দেখভাল করার জন্য তারা বাধ্য থাকত না। ইসলাম অতিপ্রয়োজনীয় বিশেষ বিষয়সমূহকে সমুন্নত রেখে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এসকল প্রাচীন প্রচলিত বিবাহ প্রথাগুলোকে পরিশুদ্ধ করেছে। ইসলামী শরীয়া আইনের প্রধান উৎস পবিত্র আল-কুরআনে সূরা নিসার ৩ নং আয়াতে  একজন পুরুষের জন্য সর্বোচ্চ চারটি ব্যাপারে বিধান দেওয়া হলেও সেখানে  আর্থিক এবং শারীরিক সক্ষমতা সহ স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার ও সমতা রক্ষার মত কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শর্তপূরনে অক্ষম হলে শুধুমাত্র একজন স্ত্রী রাখার ব্যাপারেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সুরার ১২৯ নং আয়াতে  সুবিচার ও সমতা রক্ষা করার শর্তটি যে পুরুষরা কখনোই পালন করতে পারবে না সেটিই তাকিদ দিয়ে বলা হয়েছে এবং তা না পারলে সাবধান করে দিয়ে একটি বিয়ের ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।। সুতরাং শরিয়া আইনের বহুবিবাহের বিধান রাখার বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গেলে এটি পরিষ্কার হয় যে, ইসলামে বহু-বিবাহ প্রথার ব্যাপারে যে বৈধতার বিধান রাখা হয়েছে তা মূলত শর্তসাপেক্ষ,সংরক্ষিত ও  বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োগের জন্য।

এটি মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি শাশ্বত ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামী শরিয়া আইনে উদ্ভূত নতুন নতুন সমস্যা ইজমা কিয়াসের মাধ্যমে সমাধান করারা সুযোগ থাকলেও নতুনভাবে কোন বিধান প্রণয়নের অবকাশ নেই । যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ কিংবা জীবন সংগ্রামের সম্মুখ সমরের দায়িত্বে  থাকার জন্য পুরুষদের প্রাণহানি বা সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নারীদের আনুপাতিক হার বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে বা অন্যকোন কারনে   নারীদের সংখ্যাধিক্যে দেখা দিলে সেক্ষেত্রে বহুবিবাহের মাধ্যমে উদ্ভূত  সমস্যা সমাধানের পথ খোলা রেখেছে বৈকি। অর্থাৎ, পরিস্থিতি বিবেচনায়  বিয়ের নিয়ম নীতির ব্যাপারে স্থিতিস্থাপক অবস্থানকে গতিশীল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর তাই শরিয়া আইনে বহু বহুবিবাহ প্রয়োজন বিবেচনায় বিশেষ শর্তে পালনযোগ্য একটি বিধান হলেও কখনো ব্যাপকভাবে অনুসরণযোগ্য নয়।


কোন সমাজে একটি আইন প্রয়োগের ফলে যথাযথ সুফল নির্ভর করে ওই সমাজের সমাজ বাস্তবতা, প্রেক্ষাপট, আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐ অঞ্চলের মানুষের জীবনাচরণের ওপর। বহুবিবাহের মত সংরক্ষিত ও শর্তাধীন বিধানটির অপব্যবহার রক্ষায় স্বাধীনতা-পূর্ব পাকিস্তান আমলে প্রণীত " মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ-১৯৬১" এর  ৬ ধারায় বহু বিবাহের ক্ষেত্রে কিছু পদ্ধতিগত শর্তারোপের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে। যেখানে একজন পুরুষের বহুবিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া সাপেক্ষে সালিশি পরিষদের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর সালিশী পরিষদকে বিয়ের অনুমোদন প্রদানের  ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে সেগুলো হলো- বর্তমান স্ত্রীর চিন্তাশক্তিহীনতা, দৈহিক অক্ষমতা, দাম্পত্য সম্পর্ক পালনে অক্ষমতা, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পালনে ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া এবং মস্তিষ্ক বিকৃত হওয়ার মতো কারণগুলোকে। উল্লেখিত ক্ষেত্রসমূহ বিবেচনায় সালিশি পরিষদ একজন পুরুষকে অনুমতি দিলে তিনি ২য় বা পরবর্তী  স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবেন অন্যথায় এই আইনের বিধান লংঘন করলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দন্ড দেওয়ার  বিধান রাখা হয়েছে।

যেহেতু শরিয়া আইনে বিবাহ একটি চুক্তি।  বর এবং কনে এখানে দুটি পক্ষ এবং চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে যে কোনো পক্ষের বৈধ তথা আইনসম্মত শর্ত অন্যপক্ষ মেনে নিলে তা চুক্তিতে কোনরুপ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না তাই আইনের এই নীতিকে মাথায় রেখে নিকাহনামায় স্বামী কর্তৃক প্রথম স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ না করার মর্মে একটি শর্ত সংযুক্ত রাখা হয় যেটি পূরণপূর্বক বর নিকাহনামায় স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তি সম্পাদন সম্পন্ন করছেন বলে ধরে নেওয়া হয়।  এর মাধ্যমে শরিয়া আইনে উল্লিখিত শর্তাবলীকে পাশ কাটিয়ে অবাধ বহুবিবাহের পথকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন বিবাহিত নারীর পক্ষে সবথেকে আপন মানুষটিকে অন্য নারীর সাথে ভাগ করে নেওয়ার কষ্টটা পুরুষের অবস্থান থেকে  দুর্বোধ্য বটে। আর তাই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে, পারস্পরিক সমঝোতার পথ প্রশস্ত রাখতে ও মানসিক শান্তি লাভের মাধ্যমে সুশৃংখল পরিবার গঠনে এককবিবাহ  একজন দূরদর্শী ও ব্যক্তিত্ববান পুরুষ কে আরো বেশি 'পুরুষ' করে তুলবে বলে বিশ্বাস করি।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।





ডেল্টা টাইমস্/মোহাম্মাদ বুস্তানী/সিআর/আরকে


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]