মঙ্গলবার ১৫ জুন ২০২১ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার এবং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ
মোঃ লিখন হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ মে, ২০২১, ১১:০৩ এএম | অনলাইন সংস্করণ

২০০১ সালের ১১ ই সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের টুইনটাওয়ারে ভয়াবহ সন্ত্রাসী তালেবান হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের নেতৃত্বে ন্যাটোজোট আফগানিস্তানের জনগণের  কথিত মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেনা মোতায়েন করে। পরবর্তীতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  টনি ব্লেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেয়া এক ভাষণে ঘোষণা দেন "আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ই যাবে না।  পৃথিবী থেকে  জঙ্গিবাদ দূর করতে  যুক্তরাজ্যের সেনারাও একযোগে কাজ করবে তাদের সাথে।" ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার এবং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার এবং আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ


এরপর কেটে যায় অনেক সময়। বহুবছর পর ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প  তার নির্বাচনী প্রচারণায় ঘোষণা দেন তিনি আফগানিস্তান থেকে  সেনা প্রত্যাহার করতে চান। তবে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিষয়ে কোন কথা বলেননি। ট্রাম্পের  ক্ষমতার একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ২০২০ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে ন্যাটোর মিলিটারি এ্যালাইন্সের সেক্রেটারি জেনারেল জেন্স স্টোলেন বার্গ বলেন, " তালেবানরা আমাদের সকল দাবি মেনে নিতে অস্বীকার করেছে। তাই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সময় এখনো আসেননি।"
বহুল প্রতীক্ষিার পরে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যেই ঘোষণা দেন "তার সরকার এবছরের ১১ ই সেপ্টেম্বরের মধ্যেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করতে চায় এবং তিনি আরো বলেন বুশ,বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের পর আমি চতুর্থ প্রেসিডেন্ট যে কি-না আফগানিস্তানে সেনা মোতায়ন নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমি চাই না আমার পরে  এ সমস্যা নিয়ে কথা বলুক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের কবাবে জো-বাইডেন  উল্লেখ করেন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর হয়তো জঙ্গি কার্যক্রম আবারও পুনরায় শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কিন্তু শুধুমাত্র আফগানিস্তান নিয়ে বসে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের চলবে না। তাই সেনা প্রত্যাহারের এখনই উপর্যুক্ত সময়।"

দ্বিতীয়তো, আফগানিস্তানের সেনা মোতায়েন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন,   এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান ছাড়াও আরও  অনেক নিষয় নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আমরা চায় চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করতে, তাছাড়াও এই কোরোনা মহামারীর কারনে পুরো দেশের অর্থনীতি এমনিতেই ভেঙে পড়েছে আর এমন মুহূর্তে তার সরকার চায় না আফগানিস্তানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করতে ।  ইতিমধ্যে আফগানিস্তানে আমাদের ২৩০০ এর অধিক সেনা নিহত হয়েছে,  জো বায়ডেন চায় না আফগানিস্তানে আর একটাও মার্কিন সৈন্য জীবন দিক।

তৃতীয়তো, ফক্স নিউজের এক সাংবাদিক, আফগানিস্তান থেকে সেনাপ্রত্যাহারে ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,
এর আগে বারাক ওবামার প্রশাসন যখন ইরান থেকে সৈন্য প্রত্যহার করে ঠিক তখন জঙ্গিবাদের পূণরায় উত্থান ঘটে ফলে বারাক ওবামা পূণরায় সৈন্য পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাইডেন সরকার চায়, সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানে যদি আবার অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে ড্রোন ব্যবহার করে তা প্রতিহত করা হবে। বিষয়টা এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি নজরদারি ছেড়ে দেবে। এবং যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তার জন্য সবসময়ই সতর্ক থাকবে।

চতুর্থ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কাছে আফগানিস্তানের বিষয়টা ছেড়ে দিতে চায়। আর তারা মনে করেন আফগানিস্তানের পরিস্থিতি জাতিসংঘ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। এবং আফগানিস্তানের যেকোন সমস্যা জাতিসংঘ  নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

পঞ্চম বিষয় যেটা সেটা হচ্ছে,  কমলা হ্যারিস তার নির্বাচনী প্রচারণায় আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। তাই এই সৈন্যপ্রত্যাহার সেই ঘোষণা দ্বারাও পরোক্ষভাবে বাস্তবায়নের কৌশল হতে পারে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এখন চায়, আফগানিস্তানের ভার আশরাফ ঘানীর কাছে ফিরিয়ে দিতে। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় তারা নিজেরাই সমাধান করুক। অথচ এতদিন যুক্তরাষ্ট্র আশরাফ ঘানীকে ব্যবহার করে আসছিলো। আসলে এইটাই যুক্তরাষ্ট্রে চিরায়ত রূপ যখন দরকার হবে তখন ব্যবহার করবে। স্বার্থ উদ্ধার হলে তারা সেদিকে আর ফিরেও তাকাবে না। প্রয়োজনে শত্রুকে বন্ধু বানায়,প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বন্ধুকেও শত্রুতে পরিণীত করতে কুন্ঠিত বোধ করে না।

সর্বশেষ বিষয় যেটা সেটা হলো, তালেবানদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা,
গত দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে মার্কিন সেনার কারনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। অনেক তালেবান সেনা নিহত হয়েছে। সাথে লক্ষ লক্ষ আফগান জনগণ মারা গিয়েছে। তাই বাইডেন যদি সেনা প্রত্যাহার করে নেন তাহলে তালেবানদের বরং লাভই হবে। এই অঞ্চলে তালেবানরা নিজেদের মতো করে চলতে পারবে।
এবং তারা এটাও জানে নতুন করে যদি তারা নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের মূল-ভূখন্ডে কিংবা কোন ঘাঁটিতে তারা হামলা চালায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রও ছেড়ে কথা বলবে না। এই কারনেই তালেবানরা আমেরিকার উপরে হামলা পাল্টা হামলার দিকে মন না দিয়ে নিজ দেশের দিকেই মনোযোগ দিতে পারে।

এতদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট আশরাফ ঘানীকে সহায়তা করে আসছিলো। যে কারণে আশরাফ ঘানী কিছুটা সাহস পাচ্ছিলেন তালেবানদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। এখন বাইডেন যেহেতু তাকে সমর্থন দিচ্ছে না। তাই বলতে গেলে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। এবং এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। তাহলে আফগানিস্তানে আবার তালেবানরা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। আর তালেবানদের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের  অনেকটাই ভালো যে কারণে হয়তো পাকিস্তান তালেবানদের সাহায্য করতে চাইবে। আর যেহেতু পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো নয় সেহেতু যদি ভারত আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠায়। তাহলে পরিস্থিতি আরও  খারাপ হতেই পারে।
তাই আশরাফ ঘানীর যদি পুরো আফগানিস্তানের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করার মেন্টালিটি থেকে বেরিয়ে এসে তালেবানদের সাথে সমঝোতা করে দেশ পরিচালনায় মন দেয়। তাহলে সেটাই হবে আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণের জন্য মঙ্গলজনক ।

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]