মঙ্গলবার ১৫ জুন ২০২১ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সরকারি চাকরিতে প্রবেশসীমা বাড়ানো হোক
মো. আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ মে, ২০২১, ১২:৪৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

মহামারী করোনার প্রভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। করোনার ভয়াভহ প্রভাব পড়েছে মানুষের জীবন-জীবিকা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। চাকরিপ্রত্যাশী বেকার তরুণ-তরুণীদের ওপরও করোনার প্রভাব কম নয়। পড়াশোনা শেষ করে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা থাকে ভালো একটি সরকারি চাকরির। অভিভাবকরাও একটি ভালো চাকরির সুখবর শোনার জন্য মুখিয়ে থাকেন। কিন্তু করোনার কারণে অনেকের চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাওয়ায় সোনার হরিণ খ্যাত সেই সরকারি চাকরির স্বপ্ন যেন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে, বাস্তবে ধরা দিচ্ছে না।
 ২০১৫ সালে বেতন কাঠামো পুনর্গঠন করায় সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে কয়েকগুণ। নতুন বেতন কাঠামোতে বেতনভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও যুক্ত হয়। ফলে সরকারি চাকরি শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের কাছে লোভনীয় হয়ে ওঠে। মূলত, চাকরির নিরাপত্তা, অবসরের পর পেনশন, গ্রাচুয়ইটি সুবিধা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য মানুষ সরকারি চাকরির দিকে বেশি  ঝুঁকছে।
মো. আশরাফুল ইসলাম

মো. আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। কিন্তু বর্তমানে তরুণ সমাজের বড় অংশই বেকার ও অনিশ্চিত জীবনের পথে হাঁটছে। করোনার কারণে বন্ধ আছে প্রায় সকল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। ফলে লাখ লাখ সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীর চাকরিতে আবেদনের বয়স প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে।  একজন বেকারের জীবনে চাকরির আবেদনের বয়স পার হওয়ার শেষ দিনগুলো যে কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা শুধুমাত্র সেই ভুক্তভোগীই বুঝতে পারবে।
 বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বর্তমান বয়সসীমা বিশ্বের ১৬২ টি দেশের সর্বনিম্ন বয়সের চেয়েও পাঁচ বছর কম। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো উন্নত দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০ থেকে ৫৯ বছর রাখা হয়েছে। চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ৫৫ রাখা হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে - সৌদি আরব, আরব-আমিরাত, বাহরাইন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, ওমান, কুয়েতসহ বেশ কয়েকটি দেশ। চাকরির বয়স ৪৫ রাখা হয়েছে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায়। এছাড়া চাকরির বয়স ৩৫ রেখেছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। যার মধ্যে- কাতার, তাইওয়ান ও নরওয়ে রয়েছে। এমনকি অনেক দেশে আগ্রহী ব্যক্তিরা অবসর গ্রহণের ঠিক আগের দিনও সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারেন। আবার, অনেক দেশে অবসরের সীমা থাকলেও প্রবেশের কোন নিদিষ্ট সীমা নেই।
পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৫ বছর। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ শুরুর দিকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়িয়ে ২৭ বছর করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩ বছর বাড়িয়ে ৩০-এ উন্নীত করা হয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৫% চাকরিপ্রত্যাশীকে কোটার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়। কোটাধারীরা চাকরিতেও কোটা পায়, আবার বয়সও শিথিলযোগ্য। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি, জুডিশিয়াল ও ডাক্তার ৩২ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারেন। অন্যদিকে নার্স ৩৬ বয়স পযর্ন্ত সরকারি চাকটিতে আবেদন করতে পারেন। অথচ সাধারণ প্রার্থীদের বয়স ৩০ বছর পেরোলে সরকারি চাকরিতে আবেদনের যোগ্যতা হারায় পাশাপাশি কষ্টে অর্জিত সার্টিফিকেটগুলো মূল্যহীন হয়ে পড়ে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
 আমাদের দেশে মানুষের গড় আয়ু যখন ৪৫ বছর ছিল, তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭ বছর। যখন মানুষের গড় আয়ু ৫০ ছাড়ালো, তখন প্রবেশের বয়স হলো ৩০ বছর। বর্তমানে গড় আয়ু বেড়ে ৭২.৬ বছর হলে চাকরিতে প্রবেশের বয়স অবশ্যই বাড়ানো উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে ২৬ লাখ ৩০ হাজার কর্মক্ষম মানুষ বেকার। যা মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৪ শতাংশ। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। অথাৎ প্রতি দুইজনে একজনের নাম বেকারের খাতায় অন্তর্ভুক্ত।
সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সর্বশেষ গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।  বাকিদের মধ্যে সার্বক্ষণিক চাকরিতে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পার্টটাইম বা খন্ডকালীন কাজে নিয়োজিত ১৮ দশমিক  ১ শতাংশ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ মানুষ।
জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০৩০ সালে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে যা হবে জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ। কিন্তু জনমিতির এ সুফল কাজে লাগাতে হলে প্রত্যেক নাগরিককে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
তবে চাকরির বয়স বাড়ানোর অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২.৬ বছর হয়েছে।  মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কিত প্রায় সব কিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এমনকি, দেশে অবসরের বয়সসীমাও বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা। অন্যদিকে, সেশনজটের কালিমা বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে লেগে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬% শিক্ষার্থী সেশনজটে আক্রান্ত এবং বাকি ৪% শিক্ষার্থী সেশনজট মুক্ত। ফলে ৪ বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স শেষ করতে শিক্ষার্থীদের ৬-৭ বছর লেগে যাচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারীর কারণে গত বছরের মার্চ  মাস থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত  বন্ধ রয়েছে প্রায় সব ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। ফলে এ দীর্ঘ সময়ে অনেকের সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হয়ে গেছে।
তাছাড়া, একজন শিক্ষার্থীর এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স, মাস্টার্স ভর্তি ও রেজাল্ট সংক্রান্ত ব্যাপারে অনেক সময় চলে যায়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ১ থেকে ২ বছর সময় চাকরিপ্রত্যাশীরা এমনিতেই পায়। এটা কোন  দান, করুণা বা অনুগ্রহের মধ্যে পড়ে না। এটা  শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার। তাছাড়া পূর্বে অনার্স কোর্স ছিল ৩ বছর এবং ডিগ্রি কোর্স ছিল ২ বছর। ফলে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে বিসিএসসহ পিএসসির অন্যান্য চাকরিতে একজন শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারতেন। বর্তমানে নানা কারণে ২৩ বা ২৪ বছরের পূর্বে কখনো অনার্স শেষ করা যায় না। ফলে সরকারি চাকরিতে  আবেদন করার যোগ্যতা অর্জিত হয় ২৩-২৪ বছর বয়স থেকে।
সম্প্রতি সেশনজট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনার প্রভাব, নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশেরই দাবি, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা যেন ৩২ বছর করা হয়।
সর্বশেষ ২০১৮ সালো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য কয়েক দফা সুপারিশ করা হয়। কিন্তু পরে সেটি আর আগায়নি। তাছাড়া, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বয়স বাড়ানোর বিষয়ে  অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চাকরিতে বয়স বাড়ানোর বিষয়টি যেনো উধাও হয়ে যায়।

কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর একটি দেশের উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মর্মপীড়া কাজ করছে। বর্তমানে লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর চাকরির বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় তাদের প্রাণ গুমরে কাঁদছে। করোনার কারণে সরকার হতিমধ্যে অনেক সেক্টরে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করেছে। আশা করি, সরকার লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে দেখবেন। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর জন্য অতিসত্বর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]