মঙ্গলবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩ আশ্বিন ১৪২৮

সিআরবিকে সুরক্ষা করা একান্ত জরুরি
আসাদুজ্জামান চৌধুরী সম্রাট
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১, ৩:৩২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

চট্টগ্রাম নগরীর  'ফুসফুস'  খ্যাত একটি ঐতিহাসিক  স্থান হল সিআরবি ( Central Railway Building )  । তাছাড়া  এটি  দৃষ্টিনন্দন উঁচুনিচু পাহাড়  ও শতবর্ষী বৃক্ষসারি বেষ্টিত  সবুজ-শ্যামল এবং বৈচিত্র্যময় পাখির কোলাহলে  পরিপূর্ণ একটি বিশাল নৈসর্গিক  এলাকা । শুধু তাই নয়, এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের  ঐতিহ্যবাহী ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ  স্থান, অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গন হিসেবেও সুপরিচিত । প্রকৃতি তার উদার অকৃপন  হাতে  অপরূপ সৌন্দর্যের মাধুর্য ছড়িয়ে সমৃদ্ধ করেছে নগরীর  সিআরবিকে । বিশাল আকৃতির শতবর্ষী ছায়াবৃক্ষ এই  এলাকাকে গড়ে তুলছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাস্বর । তাছাড়া  এই এলাকাকে করে তুলেছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ-শ্যামল এবং সুনির্মল ও সতেজ বাতাসে পরিপূর্ণ এক নন্দিত স্থান  ।

 যুগ  যুগ ধরে অসংখ্য নবীন, প্রবীণসহ বিদেশি পর্যটকরা প্রকৃতির শোভা পেতে দর্শন করতে আসছে এই স্থানটিতে ।  সর্বপুরি নগরীর 'ফুসফুস' খ্যাত এই স্থানটির অসংখ্য শতবর্ষী গাছগুলো   প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে । ১৮৭২ সালে দেশের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বিলীয়মান নির্দশনের মধ্যে একটি অন্যতম নিদর্শন হল এই সেন্টাল রেলওয়ে বিল্ডিং ।  ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের   যুব বিদ্রোহীরা বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিল এই সিআরবিতে ।  তাছাড়া আমাদের  দেশের  স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে এই স্থানটি অনেক স্মৃতি বিজড়িত । স্থাপত্যকলা ও  ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই স্থানটি এক গবেষণা ক্ষেত্র । প্রায় ১৪৯ বছর পুরানো নান্দনিক স্তাপত্যশৈলীর  এই ভবন এবং এলাকাটি চট্টগ্রাম শহরের   ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে আজও সুপরিচিত ।  তাই এসব বিবেচনা করে,  বাংলাদেশ সরকার সংবিধানের ২য় ভাগের ২৪ ধারা অনুযায়ী চটগ্রামের সিআরবিকে ঐতিহ্য ভবন ও সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে । চট্টগ্রামের  বাঙালিদের সংস্কৃতি চর্চার এক প্রাণকেন্দ্র হল সিআরবি । 

সিআরবিকে সুরক্ষা করা একান্ত জরুরি

সিআরবিকে সুরক্ষা করা একান্ত জরুরি

বাঙালি সংস্কৃতির ধারা সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং হাজার -হাজার বছর ধরে বহমান ।  চটগ্রামের সাংস্কৃতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এই সিআরবি প্রাঙ্গনে।  বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ উৎসব, নবান্ন উৎসব, পিঠা এবং খাদ্য উৎসব  এবং  বসন্ত বরণসহ উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুলো জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে এইখানে উদযাপিত হয়ে আসছে প্রায় দেড় যুগ ধরে ।উল্লেখ্য এটি চট্টগ্রামের একট অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র । এই বিনোদন কেন্দ্রে নবীন থেকে প্রবীণরা নিয়মিত চিত্ত বিনোদন করার উদ্দেশ্য বিচরণ  করে  ।  তাছাড়া প্রতিদিন এই স্থানে বিশিষ্ট  কবি, সাংবাদিক, প্রকৃতি প্রেমিক, শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক  সহ অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিস্তৃীর্ণ বিষয় সম্পর্কে  আলাপ আলোচনার আসর বসে ।  এক কথায় সিআরবি চট্টগ্রামের একটি জনগুরুত্বপূর্ণ  স্থান । 


কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই জন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি বেসরকারি সংস্থা পাঁচশ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল এবং একশ আসন বিশিষ্ট একটি মেডিকেল কলেজ  নির্মাণ করার জন্য গত ৪ জুলাই ২০১৯ সালে  সিদ্ধান্ত নেয় । এই সম্পর্কে অবগতির পর চট্টগ্রামবাসীরা খুবই ব্যাথিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল । তখন  অনতিবিলম্বে এই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজন এবং অসংখ্য সামাজিক সংগঠনসহ  সাধারণ জনগণ এই স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ না করার জন্য প্রতিবাদ করেছিল । ফলশ্রুতিতে বেসরকারি সংস্থাটির হাসপাতাল নিমার্ণ  প্রকল্পটা সেই সময় অনেকটা স্থবির হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু এই প্রকল্পের কাজ শীঘ্রই শুরু করার জন্য আবারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি সংস্থাটি। এই তথ্য জানতে পেরে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আবারো ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে চট্টগ্রামবাসী  ।  

ইতিমধ্যে   চট্টগ্রামের অসংখ্য  অর্থনীতিবিদ,  কবি, আইনবিদ  সাংবাদিক, মনোবিজ্ঞানী,  স্থপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, আবৃত্তিশিল্পী এবং বিশিষ্ট  কথাসাহিত্যিকরা এইখানে  হাসপাতাল নিমার্ণ না করার  জন্য আবারও তীব্র  বিরোধিতা করতেছে । এমনকি স্বাস্থ্যখাতের সাথে সম্পৃক্ত অসংখ্য  কর্মকর্তাও পর্যন্ত এই জায়গায়  হাসপাতাল নির্মাণের  প্রতি তীব্র  বিরোধিতা করেছেন  । লক্ষ্যণীয়, চট্টগ্রাম বিভাগের অসংখ্য সামাজিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সচেতন নাগরিকগণ হাসপাতাল নিমার্ণ প্রকল্পটি অনতিবিলম্বে নাকচ করার জন্য বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতেছে ।  বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য  করেছেন,- নগরীর প্রাণকেন্দ্র সিআরবিতে শতবর্ষী বটবৃক্ষ গুলো কেটেঁ হাসপাতাল বা কোন স্থাপনা তৈরি করা  হলে চট্টগ্রাম শহরের পরিবেশের বির্পযয়  ঘটার সম্ভাবনা শতগুণ বৃদ্ধি পাবে । উল্লেখ্য,  এই এলাকায়  হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে, প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য বিনষ্ট হবে , শতবর্ষী বৃক্ষনিধন হবে এবং সংস্কৃতিচর্চা, বিনোদন,  সাহিত্যচর্চা, প্রান্ত ও বৈকালিক ভ্রমন এবং ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন ঐতিহ্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং  চিরতরে  বিলীন হয়ে যাবে । একইসাথে মহানগরী মানুষের চিত্ত বিনোদন করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি হবে । যা সাধারণ জনগণের  মৌলিক চাহিদা  বিনোদনটি ক্ষুণ্ণ হওয়ার সমতুল্য ।   কেননা  চট্টগ্রাম নগরে  শুধুমাত্র সিআরবি ছাড়া,  ঢাকা শহরের  মত  রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং চন্দ্রিমা উদ্যানসহ  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত আর কোন স্থান নেই বললেই চলে  ।

সাধারণত সিআরবি(সেন্টারাল রেলওয়ে বিল্ডিং)  একটি সরকারি জায়গা।  কিন্তু সরকারি জায়গা নির্মিত হতে যাচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ।  এই হাসপাতাল     স্বাস্থ্যসেবা  ভোগ করতে গেলে জনগণকে ভবিষ্যতে  নির্ঘাত আর্থিক    বিড়ম্বনার শিকার হতে হবে ।  তাই  আমি মনেকরি এই সরকারি জায়গায় জনস্বার্থের  জন্যে কোন প্রকার স্থাপনা নির্মাণ না করা উচিত ।  উল্লেখ্য আমি হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিরুদ্ধে নয় ।  বরং বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রামে আধুনিক হাসপাতাল এবং মানসম্মত মেডিকেল কলেজ  নির্মাণ করা উচিত  । কেননা বন্দর নগরী চট্টগ্রামে জনসংখ্যার তুলনায়  বিদ্যমান হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলো খুবই নগণ্য। তবে হাসপাতালসহ যেকোন প্রকার স্থাপনা  সিআরবি  মতো  প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ এবং  ঐতিহ্যবাহী স্থানে নয়, অন্যত্রে নিমার্ণ করা হোক। 

তাই আমি মনেকরি চট্টগ্রামের বিশিষ্টজন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ সর্বসাধারণরা সিআরবিতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ  স্থাপন সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য যে  তীব্র প্রতিবাদ করতেছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে  গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা  করা উচিত । একইসাথে সিডিএ চেয়ারম্যানকে  এই বিষয়ে  দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত ।  কেননা শতবর্ষী গাছ কেটেঁ সিআরবিতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ করলে পরিবেশ সংকট বৃদ্ধি পাবে ।  তাই চট্টগ্রাম রেলওয়ে এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামের   নগরীর 'ফুসফুস' খ্যাত সিআরবিতে হাসপাতাল বা ভবন   নির্মাণের অনুমতি প্রদানের পরির্বতে, এই স্থানটিকে জনস্বার্থের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আরো সৌন্দর্য বর্ধন ও সংস্কার করা উচিত ।  একইসাথে বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকতাদেরকে  চট্টগ্রামবাসীর বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ,নগরীর ফুসফুস খ্যাত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং   ঐতিহাসিক স্থান  চট্টগ্রামের সিআরবিকে  সুরক্ষা করার জন্য  কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ।

লেখক,  
আসাদুজ্জামান চৌধুরী সম্রাট   
শিক্ষার্থী,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 
ক্যাডেট,বিএনসিসি।






ডেল্টা টাইমস্/আসাদুজ্জামান চৌধুরী সম্রাট/সিআর/জেড এইচ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]