সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১ ২ কার্তিক ১৪২৮

বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২১: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
মো: আরাফাত রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৮:১৪ পিএম আপডেট: ২৭.০৯.২০২১ ৮:২৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

জলাতঙ্ক একটি ভাইরাল রোগ যা মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মস্তিষ্কের প্রদাহ সৃষ্টি করে। বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস বিশ্বব্যাপী জলাতঙ্ক নির্মূলের জন্য সচেতনতা তৈরির জন্য প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় তৈরি এবং এটি জলাতঙ্ক রোগের বিরুদ্ধে সমস্ত মানুষ, সংস্থা এবং স্টেকহোল্ডারদের একত্রিত করার জন্য করা হয়েছে। এই তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছিল কারণ এটি লুই পাস্তুরের মৃত্যুবার্ষিকী – প্রথম ব্যক্তি যিনি সফলভাবে জলাতঙ্ক রোগের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন। জলাতঙ্ক রোগের অবসান ঘটানোর একমাত্র উপায় হল একসাথে কাজ করা এবং একটি অভিন্ন লক্ষ্যের দিকে একত্রিত হওয়া। 


"রেবিজ" বা "জলাতঙ্ক" হচ্ছে ভাইরাস গঠিত একটি রোগ যা সাধারণত কুকুর, শেয়াল, বাদুর প্রভৃতি উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায়। এটি এক প্রাণী থেকে আরেক প্রাণীতে পরিবাহিত হতে পারে তার লালা বা রক্তের দ্বারা। বিশ্বের প্রায় সকল দেশের প্রাণীর মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। প্রতি বছর বিশ্বে যত মানুষ কুকুরের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার ৯৯ শতাংশই এই রোগের কারণে হয়। বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী জলাতঙ্ক রোগের বর্তমান অবস্থা বিষয়ে পর্যালোচনা, এর প্রেক্ষিতে করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি ও বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাধারণ জনগণ, চিকিৎসক এবং সরকারী-বেসরকারী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এছাড়াও এই রোগ সম্পর্কে সাধারণ জনগণকে সচেতন করার জন্য এই দিনে বিনামূল্যে টীকা প্রদান কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়।

জলাতঙ্ক হল ভাইরাস জনিত এক ধরনের জুনোটিক রোগ অর্থাৎ রোগটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। রেবিজ ভাইরাস নামক এক ধরনের নিউরোট্রপিক ভাইরাস দিয়ে এই রোগ হয়। এই রোগ সাধারণত গৃহপালিত প্রাণী ও বন্য প্রাণীদের প্রথমে সংক্রমিত করে। মানুষ এই সংক্রমিত প্রাণীগুলির বা এদের লালার সংস্পর্শে আসলে বা এই প্রাণীগুলি যদি মানুষকে কামড়ায় অথবা আচড় দেয় তাহলে এই রোগ মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। জলাতঙ্ক রোগ এন্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই দেখা গেছে, বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে। জলাতঙ্ক রোগের কারণে প্রতি বছর বিশ্বে চব্বিশ থেকে ষাট হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে।
রেবিজ ভাইরাসের সুপ্তাবস্থা কামড় স্থানের উপর ভিত্তি করে দুই থেকে ষোল সপ্তাহ বা আরো বেশি হতে পারে। পায়ের তুলনায় মাথার দিকে কামড়ালে সুপ্তিকাল আরো কমে যায় কারণ ভাইরাসের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌছাতে সময় কম লাগে। প্রথমদিকে অনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ যেমন জ্বর, ক্ষুধামন্দা, কামড় স্থানের অনুভূতিতে পরিবর্তন যেমন চিনচিন, ঝিনঝিন ইত্যাদি পরিলক্ষিত হয়। কয়েকদিন পর থেকে তন্দ্রা, কনফিউশন, অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা, লালারসের ক্ষরণ বৃদ্ধি প্রভৃতি লক্ষণ দেখা দেয়। সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে ঢোক গিলার সময় ডায়াফ্রাম, রেসপিরেটোরি মাসল ও কণ্ঠনালির তীব্র ব্যথাযুক্ত সংকোচন হয় বিশেষ করে পানি পান করার চেষ্টা করলে ডায়াফ্রাম ও অন্যান্য ইন্সপিরেটোরি মাসলের তীব্র সংকোচন ও ব্যথা হয় ফলে রোগীর মধ্য হাইড্রোফোবিয়া বা পানভীতি তৈরি হয়। এই অবস্থার জন্য বাংলায় এই রোগকে জলাতঙ্ক নামে অভিহিত করা হয়। এছাড়া রোগীর ডিলিউসন, হ্যালুসিনেশন ও পাগলামি, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়ানোর অক্ষমতা, চেতনাশূন্যতা দেখা দেয়।

এই ভাইরাস সাধারণত রেবিজ দ্বারা আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড় ও লালার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। রেবিজ ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত প্রাণীর ভাইরাল এনসেফালাইটিস হয় ফলে প্রাণীটি আক্রমণাত্মক হয়ে যায় এবং অল্পতেই কামড়িয়ে দেয়। এই ধরনের প্রাণীকে রেবিড প্রাণী বলে। এই ভাইরাস প্রায় সকল স্তন্যপায়ী প্রাণীকেই আক্রান্ত করতে পারে তবে খুব অল্পসংখ্যক স্তন্যপায়ী মানুষের সংক্রমণের উৎস হিসেবে গুরুত্ব বহন করে। মানুষ সাধারণত কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে বেশি আক্রান্ত হয়। অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বিড়াল, বাদুড়, ভোঁদড়, শেয়াল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাধারণত খরগোশ ও তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী যেমন, ইঁদুর, মূষিক, কাঠবিড়াল প্রভৃতির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় না। সাধারণত মানুষ থেকে মানুষে অঙ্গ ট্রান্সপ্লান্টেশনের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। যেহেতু বীর্য বা স্ত্রীযোনির তরলে ভাইরাস থাকতে পারে তাই তত্ত্বীয়ভাবে যৌনমিলনের মাধ্যমে ছড়ানোর সম্ভাবনা আছে।
রেবিজ ভাইরাস কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি প্রাণীর কামড়ের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। কামড় স্থানেই এরা বংশবৃদ্ধি আরম্ভ করে দেয়। এরা সংবেদী স্নায়ুকে আক্রান্ত করে এবং অ্যাক্সন বেয়ে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের দিকে এগোতে থাকে। স্নায়ুর মধ্য দিয়ে পরিবহনের সময় সাধারণত কোনো ইমিউন রিয়্যাকশন হয় না, যদিওবা হয় তাহলে তা খুবই সামান্য। ভাইরাস কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌছানোর পর সেখানে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে এবং পুনরায় প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে লালাগ্রন্থিসহ অন্যান্য অঙ্গে এসে জমা হয়। লালাগ্রন্থি থেকে লালারসে ভাইরাস প্রবেশ করে ফলে জলাতঙ্ক রোগীর কামড়ের মাধ্যমে এটা অন্যের দেহে পরিবাহিত হতে পারে। স্নায়ুতন্ত্রে এটি নিউরনকে ধ্বংস করে এবং এনসেফালাইটিস করতে পারে।

সাধারণত রোগের ইতিহাস ও উপসর্গের উপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয় করা হয় তবে কর্নিয়াল ই¤েপ্রশন স্মিয়ার ও স্কিন বায়োপসি থেকে র্যাপিড ইমিউনোফ্লুরেসেন্ট টেকনিকের মাধ্যমে অ্যান্টিজেন শনাক্ত করা সম্ভব। এই রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। রেবিড প্রাণী কামড় দেওয়ার সাথে সাথে দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই ভাইরাসের অনেকরকম টিকা আবিষ্কার হয়েছে তবে সবচেয়ে নিরাপদ টিকা হলো হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিন। অন্যান্য টিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পিউরিফাইড চিক ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন, ডাক ইমব্রিও সেল ভ্যাকসিন, নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন ইত্যাদি। ডাক সেল ভ্যাকসিনের ইমিউনোজেনেসিটি বা কার্যকারিতা কম এবং নার্ভ টিস্যু ভ্যাকসিন অ্যালার্জিক এনসেফালোমায়েলাইটিস করতে পারে। ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে টিকা নেওয়াকে প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস ও আক্রান্ত হওয়ার পরে টিকা নেওয়া কে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বলে।

পশুচিকিৎসক, চিড়িয়াখানার প্রাণীদের দেখাশোনাকারী, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী লোকজন বা উক্ত এলাকায় ভ্রমণকারী ব্যক্তি ও যারা বাড়িতে কুকর পোষে তাদেরকে প্রতিরোধমূলক টিকা দেওয়া হয়। সাধারণত তিনটি ডোজ ০,৭ ও ২১ বা ২৮ তম দিনে ও প্রতিবছর বুস্টার ডোজ দেয়া হয়। রেবিজ ভাইরাসের সুপ্তাবস্থা অনেক বেশি হওয়ায় টিকা দেওয়ার পরে প্রতিরোধক ইমিউনিটি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে তাই এই ভ্যাকসিন পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস হিসেবে নিয়মিত রূটিনমাফিক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার দশ দিনের মধ্যে দিলেও কাজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্ষতস্থানটি সাবান ও পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধৌত করতে হবে। অতঃপর আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে পুনরায় পরিষ্কার করতে হবে। টিটেনাস টিকাও দেবার কথা বিবেচনা করতে হবে। পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিসের মধ্যে টিকা ও হিউম্যান রেবিজ ইমিউনোগ্লোবিউলিন উভয়ই অন্তর্ভূক্ত।
হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিনের পাঁচটি ডোজ ০,৩,৭,১৪ ও ২৮ তম দিনে দেওয়া হয়। তবে ৯০তম দিনে আরেকটি বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে। রেবিজ ইমিউনোগ্লোবিউলিন শুধু একবার প্রথমদিনে দেওয়া হয়। এটি মূলত ক্ষতস্থানে বেশি দিতে হয়, বাকি অংশটুকু মাংসপেশিতে দিতে হয়। টিকার মধ্যে নিষ্ক্রিয় রেবিজ ভাইরাস থাকে পক্ষান্তরে ইমিউনোগ্লোবিউলিন হলো অ্যান্টিবডি তাই এই দুটি ইনজেকশন শরীরের দুটি ভিন্ন জায়গায় পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রেখে দিতে হয় নতুবা রেবিজ ইমিউনোগ্লোবিউলিন মধ্যস্থিত অ্যান্টিবডি ভাইরাসটিকে অকেজো করে দিবে এবং টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। যদি কামড় প্রদানকারী প্রাণীকে ধরে ফেলা যায় তাহলে ১০ দিন তাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যদি প্রাণীটির মধ্যে রেবিজ আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় তাহলে তাকে মেরে ফেলা উচিত। যদি লক্ষণ না পাওয়া যায় তাহলে প্রাণীটি রেবিজ প্রাণী নয়। সেক্ষেত্রে রেবিজ ভ্যাকসিন এর প্রয়োজন নেই।

লেখক: সহকারি কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার এন্ড প্রফেশনাল 
ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়।




ডেল্টা টাইমস/মো: আরাফাত রহমান/সিআর/আরকে
 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]