সোমবার ১৮ অক্টোবর ২০২১ ২ কার্তিক ১৪২৮

শরৎ এসেছে হৃদয়ে
রহমান মৃধা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৬:৫৪ পিএম আপডেট: ২৮.০৯.২০২১ ৭:০৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

গ্রীষ্মের আমেজ, বসন্তের বাহার মানুষের দেহ মনকে ভরিয়ে রাখে শত রকমের অজানা ফুলের সমারোহে। রমণী যেন রঙিন হয়ে পরিণত হয় একটি ফুটন্ত ফুলে। সূর্যের একটু আলো পেতে এবং শরীরের ফ্যাকাশে সাদা রং বাদামি করতে সব সৈকতে বসে রৌদ্রস্নান করে। লেক থেকে শুরু করে সব সমুদ্রের পাড়ে রমণীদের মেলা বসে। ভালোবাসার ছোঁয়া নিয়ে তারা যেন বসে আছে পথ চেয়ে কারো জন্য। তারপর হঠাৎ করেই যেন প্রকৃতি বদলাতে শুরু করে। গ্রীষ্মের মতো শরতও এক সময় শেষ হয়ে যায়।
বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বছরকে ছয়টি ঋতুতে বিভক্ত করা হয়েছে যথা গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এজন্যই বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বসন্ত, গ্রীষ্ম, হেমন্ত ও শীত---এই চারটি ঋতু রয়েছে। সুইডেন তার মধ্যে একটি। ঋতু হচ্ছে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভূ-পৃষ্ঠের কোনো একটি স্থানের জলবায়ুর ধরন। মহাকাশে সূর্যের অবস্থানের সাপেক্ষে পৃথিবীর অক্ষের অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঋতু পরিবর্তন হয়। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এদেশে ঋতুর আবির্ভাব ঘটে এবং সেগুলি পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এবং নভেম্বর মাস মিলে যে ঋতুটি তাকে সুইডেনে বলা হয় হোস্ত (höst)। বাংলাদেশের শরৎ এবং হেমন্তের সমন্বয়ে সুইডিশ হোস্ত ঋতুটি।

দেখতে দেখতে স্কান্ডিনেভিয়ার সামার শেষ হয়ে গেলো। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন অনুপ্রেরণা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণের সঙ্গে বরণ করছে। কর্মজীবনে কিকঅফের মধ্যদিয়ে ছোটবড় কম্পানিগুলো কর্মচারীদের মোটিভেশন ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরণের অ্যাক্টিভিটিস বা টিম বিল্ডিংয়ের ব্যবস্থা করছে।
আমাদের রাজা মাননীয় স্পিকারের অনুরোধে জাতীয় সংসদ উদ্বোধন করেন প্রতি বছর একই সময় সুইডিশ ট্র্যাডিশন অনুযায়ী। এ বছর ১৪ই সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদের (রিক্সডাগ) নতুন কার্যদিবস শুরু হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের অনেকের জন্য প্রথম স্কুলজীবন শুরু হয়েছে। কেউ নতুন কিছু পেলো কেউ আবার পুরনো কিছু হারালো। চারিদিকে বেশ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ সময়ের সকালটা আর সূর্যের কিরণ দিয়ে শুরু হচ্ছে না। আকাশ মেঘে ঢাকা কিছুটা অন্ধকার এ সময়টিতে। খোলামেলা বা হাল্কা কাপড়ে চলাফেরা করার সময় শেষের পথে। হঠাৎ একঝলক সূর্যের আলো যখন গাছপালার ওপর পলক ফেলছে ঠিক তখন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সবার নজর কেড়ে নিচ্ছে। কারণ শরতের আবির্ভাব একটু একটু দেখা দিতে শুরু করেছে।
কমপক্ষে এক মাসের বেশি সময় নিখিলের এত শোভা এত রূপ এত চমৎকারভাবে ফুটে উঠবে যা শুধু ইউরোপে বিশেষ করে সুইডেনে পরিস্কারভাবে অনুভব করা যাবে। গাছের পাতাগুলো তার রঙ পাল্টিয়ে রংধনুর মতো সাত রঙে রাঙ্গিয়ে তুলতে শুরু করেছে। শিল্পীর তুলিতে আঁকা শরতের এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কেড়েছে অনেক টুরিস্টের মন। সুইডেনের শরৎ সত্যিই এক মন জুড়ানো দৃশ্য যা না দেখলেই নয়। আমি কাছ থেকে দেখছি, আমি দূর হতে দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি প্রতিক্ষণ। শরতে ঘুমের ঘোরে অনেকেই স্বপ্ন দেখবে আবার কেউ জেগে জেগে সোনার বাংলাকে তার মনের মতো করে গড়বে এবং হয়তো সাজাবে সুইডেনের শরতের মতো করে।

বাংলাদেশেও শরৎ ঋতু সুইডেনের মতই সব সৌন্দর্যের চিরন্তন প্রতীক। বলা যেতে পারে শরতে বাংলাদেশ শুধু সুন্দর নয়, অপূর্ব, অতুলনীয় ও অসাধারণ সুন্দর।
কেন যেন মনে হচ্ছে আমার সেই ছোট বেলার দিনগুলোর কথা। সেই শরতের বিকেলে নীল আকাশের নিচে দোল খেতে দেখা শুভ্র কাশফুলকে। প্রকৃতির পালাবদলের খেলা তখন চলতো শরতের মাঝামাঝি সময়।
এখনও কি বাংলাদেশের  প্রকৃতিতে চোখ রাখলে ধরা পড়ে শরৎ; -প্রকৃতির সেই মোহনীয় রূপ, কাচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ সাদা মেঘের ভেলার ছোটাছুটি, নদীর বা বিলের ধারে কিংবা গ্রামের কোনো প্রান্তে মৃদু সমীরণে দোল খাওয়া শুভ্র কাশফুলের স্নিগ্ধতা, আর সেই বিল ও ঝিলের পানিতে শাপলা শালুক ফুলের সুন্দর মায়াবী দৃশ্যের সমারোহ! বাংলাদেশের শরতকে সুইডেনে বসে অনুভব করা সত্যি এক স্বপ্ন যা শুধু জেগে জেগে নয় ঘুমের ঘোরেও দেখি। বিশেষ করে শরৎ সম্পর্কে আমার জ্ঞানের মাত্রা আগে কতটা ছিল তা বলতে পারব না। গল্প-উপন্যাসে কতটা পড়েছি বা বুঝেছি তা আমার ঠিক মনেও নেই। বলা হয় বয়স বাড়লে বা যৌবনের আবির্ভাব হলে মানুষ প্রকৃতির প্রেমে পড়ে। প্রেমে পড়েছি বলব না তবে প্রকৃতির অনেক না দেখা সৌন্দর্য আমি দেখেছি সুইডেনে। এ দৃশ্য যে কত বিশাল, তা এ দেশে না আসলে হয়তো দেখা হতো না। গাছের পাতার রং যে কত বাহারী হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাসই করা কঠিন। প্রকৃতির ছাপ আমি শুধু হাঁটতে পথে নিজের চোখে দেখি না, দেখি এখানের প্রতিটি মানুষের চোখে। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদের মনেও আলোড়ন ঘটে। তবে সুইডেনের প্রকৃতিতে বারো মাসই নতুন কিছু না কিছু ঘটে। চোখের সামনে সুন্দর সাজানো গাছগুলোর পাতা যেন ফলের মতোই পেকে গেল। কখনো লাল, কখনো বেগুনি, কখনো তীব্র হলুদ, তারপর উত্তাল বাতাসে ঝিরঝির করে পাতাগুলো পড়তে শুরু করছে। একটু দাঁড়ালেই দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির মতো ঝরছে। প্রতিটা গাছে পাতাও প্রচুর। সব পাতা যখন ঝরে যাবে তখন দেখবো চারিপাশে শুধু পাতাবিহীন গাছ, নিদারুণভাবে গাছগুলো পাতাশূন্য হয়ে যাবে। মনে হবে প্রেম ছাড়া জীবন আর পাতা ছাড়া গাছ। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে ক্ষণিক বিরহ লেগে থাকে মানুষের চোখে মুখেও। বিবর্ণ প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিবর্ণ হতে থাকে মানুষের মন। চলতে থাকবে প্রস্তুতি। দীর্ঘ বিরহ, দীর্ঘ শীতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। তখন আর হাল্কা কাপড় থাকবে না কারো গায়ে। শরীরে কাপড়ের পরিপূর্ণতায় ভরে যাবে।
জীবন ফুল শয্যা নয়, এখন বুঝি তা হাড়ে হাড়ে। অল্প বয়সী থেকে বয়স্ক কর্মজীবী মানুষের জীবন এমন কাছে থেকে দেখলে বোঝা যায় জীবন কতটা কষ্টের! আবহাওয়া যাই থাক, কাজ করতে হয় সবাইকে। প্রচণ্ড শীত এক সময় সহ্য হয়ে, স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, কিন্তু মৌসুমের এ বদল হতে একটু সময় লাগে। ব্যস্ত নগরীর মানুষ কষ্ট উপেক্ষা করে প্রকৃতির মতোই চলছে নিজের ভাগ্য বদলাতে। সব আছে তবু কী যেন নেই মনে হয়।
যাই হোক না কেন শরতের এই প্রকৃতির বাহারে চিত্রশিল্পীরা আছে মেতে আঁকাঝোকার মাঝে। আমি প্রতিদিন একবার হলেও ঘরের বাইরে যাচ্ছি। হাঁটছি কখনও প্রিয় সঙ্গিনীর সাথে, কখনও বা একা। দেখছি এবং উপভোগ করছি মন-প্রাণ-হৃদয় ভরে শরতের এই বাহার।

আমি সুইডেনের শরৎ এবং হেমন্তের সময়টুকুকেই বাংলাদেশের শীতকাল হিসেবে উপভোগ করে আসছি। কারণ ছোটবেলায় বাংলাদেশে যখন শীতকাল ছিল তখন আমি সকালে ঘাসের ডগায় যেমন শিশির জমে থাকতে দেখেছি তেমনি দেখেছি কুয়াশাও।
কয়েকদিন ধরে সুইডেনের শরতের সময়টুকু আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে ছোটবেলার দিনগুলো।
জানি না এমনটি অনুভূতি কি আজও আছে গ্রাম বাংলায়? এখনও কি সকাল হলে নির্ভেজাল খেজুরের রস, খাঁটি গরুর দুধ এবং আতপচালের ভেজালমুক্ত চালের গুঁড়া পাওয়া যায়? বড় সাধ জাগে একবার ফিরে যাই সেই বাংলার কোলে যেখানে কেটেছে আমার মধুময় শিশুকাল।

শরৎ প্রতিবছরই সুইডেনে ফিরে আসে তবে শীতের সেই দুধচিতই পিঠা ফিরে আসেনি একবারও। ছোটবেলার অনেক স্মৃতিই মাঝে মধ্যে হৃদয়ের মাঝে এসে বেশ জ্বালা দিয়ে যায়।
মাকে পাবো না। খেজুর রস, সেই দুধ চিতই পিঠা তাও হয়তো পাবো না। হে বাংলাদেশ, হয়তো কিছুই নাহি পাবো তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাব।
আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তুমি আমাকে এই সুন্দর ভুবনের সবকিছু উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছো। তুমি শ্রেষ্ঠ, তুমি মহান, তুমি পরম দয়ালু এবং করুণাময় রাব্বুল আলামিন।

লেখক:  সাবেক পরিচালক 
(প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট),
ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]




ডেল্টা টাইমস/রহমান মৃধা/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]