বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

গয়না শিল্পের অপার সম্ভাবনা
আনন্যামা নাসুহা
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১, ১০:২২ এএম | অনলাইন সংস্করণ

সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য যুগে যুগে নারীরা ব্যবহার করে আসছেন নানা রকম গয়না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে গয়নার উপকরনে  এসেছে পরিবর্তন সেই সাথে নকশা ও আকারেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বর্তমানে এন্টিক বা সিলভার গয়না অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নান্দনিক নকশা এবং রঙ এইসব গয়নাকে ফ্যাশন সচেতন তরুণীদের নিকটও জনপ্রিয় করে তুলেছে। উজ্জ্বল আলোর ফুল্কি ছড়িয়ে কারিগররা সকাল সন্ধ্যা গলার হার, হাতের চুড়ি, কানের দুল, ঝুমকা, চেন, পায়েল ও নূপুর তৈরিতে কাজ করে যায়। এই গয়না তৈরি করে যেমন অন্যকে সাজতে সহায়তা করছেন, তেমনি একে অবলম্বন করে নিজেদের জীবনকেও সাজাচ্ছেন গয়না কারিগররা।


জানা যায় আশির দশকে বাংলাদেশে স্বর্ণ ও রূপার গয়না তৈরি হতো। কিন্তু ধিরে ধিরে দাম বাড়তে থাকায় কারিগরেরা তামা ও পিতলের গহনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ৯০ এর দশকে এসে এখানে ইমিটেশন গহনাই মূলত তৈরি হতে থাকে। এবং বাজারেও তামা ও পিতলের গয়নার চাহিদাও বেড়ে যায় ক্রমান্বয়ে। আর তাঁর ফলাফলে বগুড়া ঝিনাইদহ ও ঢাকার কিছু গ্রামে বাড়তে থাকে গয়না তৈরির  তোড়জোড়।

ইমিটেশন গয়না শিল্পে বাংলাদেশের অনেক পরিবার নতুন করে বাঁচার প্রেরণা খুঁজছে।  বগুড়ার এ্যানটিক পল্লী গড়ে ওঠে প্রায় ৫০ বছর আগে জেলা শহরের উপকন্ঠে ধরমপুর ও বারপুরে। ২০ সহস্রাধিক নারী পুরষ নিখুঁত ভাবে তৈরী করেন গহনা। এ পল্লী করোনার শুরুতে মুথ থুবড়ে পড়লেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ্যানটিকে কাজ করে তাদের জীবন মান পাল্টে গেছে। সকালের নাস্তা সেরে নারী পুরুষ লেগে যান এ্যান্টেকের গহনার তৈরীর কাজে। সকালে সোনার গহনার বানানোর ছোট ছোট হাতুড়ি খুট খাট  শব্দ ও  গ্যাস পটের সড় সড় শব্দে গ্রামর মানুষের ঘুম ভেঙ্গে যায়।  আগে সোনার গহনা তৈরীর জন্য কয়লার আগুনে পিতলের নল দিয়ে গহনার জোড়া লাগানো হতো। এখন প্রযুক্তি পাল্টে গেছে তারা গ্যাসের পটে চাপ দিয়ে এ্যানটিকের গহনাকে জোড়া লাগায়। তারা একটি মোমের ছাঁচে এ্যানটিকের গহনা জোড়া দিয়ে তৈরী করেন নানা ডিজাইনের গহনা। এসব এ্যানটিক তৈরী হয় তামা , পিতল ও দস্তার সংমিশ্রনে। এর প্রায়ই আমদানী হয়ে থাকে ভারত থেকে। ইমিটেশন গয়না শিল্পের অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত কিউবিক জারকনিয়া বা নকল হীরের মূল জোগানদার ছিল চীন। অপূর্ব কারুকাজে তৈরী হচ্ছে চোখ ধাঁধানো গহনা। এগুলো সোনা নাকি অন্য কোন মূল্যবান পদার্থের তা ধরবার কোন উপায় নেই। অনেকে যারা রিক্সা চালাতো, দিন মজুর ছিল, বা অন্যান্য পেশা নিয়োজিত ছিল। তাদের অধিকাংশই প্রথমে এ্যানটিক কারখানার শ্রমিক ছিল। এর পর তারা নিজেরাই এখন এ্যানটিক শিল্পের মালিক। এর কাঁচা মাল আসে ভারত থেকে। কারন সেখানে তামা, ব্রোঞ্জ, দস্তা পিতলের খনি আছে। করোনার  প্রথম দিকে  লকডাউন দেয়ায় তাদের লোকসান গুনতে হয়েছে। মহামারির মধ্যে কাঁচামালের ব্যয় বাড়ার কারণে মুনাফা কম ছিল।  তবে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে দেশে মহামারি  শুরুর আগ পর্যন্ত এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা ছিল। কিন্তু, পরে ভারত ও চীন থেকে আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়। ফলে মহামারি পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ব্যবসা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়।কোন সরকারি প্রনোদনা ছাড়াই একটি সম্ভাবনাময় শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে নিজস্ব অর্থায়নে।  

রাজধানী শহর ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা তীরের গ্রামীণ এবং শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা এক জনপদ ভাকুর্তা। সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। গয়না তৈরিই যাদের প্রধান পেশা। গয়না শিল্প এসে একদম আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে এই জনপদের।ভাকুর্তায় তৈরি গয়নার কাঁচামাল আনা হয় পুরাণ ঢাকার তাঁতিবাজার এবং বগুড়া থেকে। তাঁতিবাজারের ব্যবসায়ীরা এইসব কাঁচামাল আবার আমদানি করেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে। প্রাথমিকভাবে তৈরি গয়না গুলো অপরিশোধিত অবস্থায় থাকে। এখান থেকে পাইকাররা কিনে নিয়ে পরিশোধন ও রঙ করে বাজারে বিক্রি করে থাকেন।ঝিনাইদহের  মহেশপুর উপজেলার প্রায় ১০ হাজার পরিবার সুদিনের দেখা পাচ্ছে এই শিল্পের কারণে।

এসব এলাকায় নারী-পুরুষ কারিগরদের কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি হয়েছে। অ্যান্টিকের গহনা তৈরির আয় থেকে এ এলাকার নারীরা নিজেদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছে। প্রায় ১৫০ বছর আগে থেকে এখানে গহনার কাজ শুরু হয়। সে সময় পিতলের গহনা তৈরি হতো। পরে এক পর্যায়ে সোনার গহনার চাহিদা বাড়তে থাকে। কিন্তু ৮০ দশকের শেষে আবার সোনার গহনার চাহিদা পড়তে থাকে। তখন থেকে একটু একটু করে অ্যান্টিক শিল্পের দিকে ঝুঁকতে থাকে কারিগররা। এরপর ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালের দিকে পুরোদমে শুরু হয় অ্যান্টিকের গহনা তৈরি। বাজারে  প্রতিদিন অন্তত ৫০ লাখ টাকার গয়না পাইকারি বিক্রি হয়। সে হিসেবে মাসে সাড়ে ১৫ কোটি টাকার লেনদেন হয় গয়নাকে কেন্দ্র করে; বছর শেষে যার পরিমাণ হয় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা।

এ কাজে এত মানুষ যুক্ত হওয়ার কারণ রোদ-বৃষ্টি-বাদলের মধ্যেও কাজ চলে সমানতালে। বাড়ির বউ-ঝিয়েরাও গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে করতে পারেন এ কাজ। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে যুক্ত হয় শিক্ষার্থীরা। গয়নাশিল্পের কারণে এ এলাকার কেউ আর বেকার বসে নেই। প্রায় প্রতি ঘরেই আছে গয়না তৈরির সরঞ্জাম। রাস্তার পাশে, বাজারে বাজারে গড়ে উঠেছে গয়নার কারখানা, দোকান। গয়নার ধরনে এটি  কুটিরশিল্প হিসেবে বিবেচিত। উদ্যোক্তারা চাইলে বিসিক শিল্পনগরীতে কারখানা তৈরির জায়গা এবং সরকারিভাবে ব্যাংকঋণের সহায়তা পেতে পারেন। কিন্তু সরকার বা শিল্পনগরী সংশ্লিষ্ট কেও ই এই কাজে তেমন দৃষ্টিপাত করেন না। যার ফলশ্রুতিতে নিজেদের অর্থায়নেই পৈত্রিক ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছেন কারখানা মালিকেরা। গহনা গ্রামের শ্রমিকদের উৎসাহিত ও দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান বাড়াতে সরকারিভাবে ঋণের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। দেশের এ রকম ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সাধারণ ক্রেতার পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে তাদের পুঁজি বৃদ্ধি ও ব্যবসায় প্রসারে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করতে হবে। এ ছাড়াও এ শিল্পের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাজারজাতকরণে সঠিক প্রচারণায় সরকারি সহযোগিতার বিকল্প  নেই।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।





ডেল্টা টাইমস্/আনন্যামা নাসুহা/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]