বুধবার ৮ ডিসেম্বর ২০২১ ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

অনিয়ন্ত্রিত মানব পাচার রুখতে আইনের সুষ্ঠ প্রয়োগ হোক
তাইয়্যেবা পুষ্প
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১, ৩:৩৩ পিএম আপডেট: ১৬.১০.২০২১ ৩:৫৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

মানব পাচার একটি আধুনিক বা নব্য দাসত্বের লক্ষণ।বহুজাতিক অপরাধ সংঘটনগুলোর সংঘটিত অপরাধকর্মগুলোর মধ্যে মানবপাচারকে অন্যতম দ্রুত অপরাধকর্ম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাহিরে প্রতারণার মাধ্যমে, অসৎ উদ্দেশ্যে এবং বাধ্যতামূলক শ্রম, শোষণ বা নিপীড়নমূলক পরিস্থিতির শিকার হতে পারে মর্মে জানা থাকা সত্বেও অন্য কোন ব্যক্তিকে কাজ বা চাকুরীর উদ্দেশ্যে গমন, অভিবাসন বা বহির্গমন করতে প্রলুব্ধ বা সহায়তা  করে, তবে উক্ত ব্যক্তির এই কর্ম গুলো মানব পাচার এর অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর ২১কোটি ৫০লক্ষ যুব শ্রমিকদের অর্ধেককে জোরপূর্বক যৌন কর্ম এবং বলপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিসহ ক্ষতিকর ক্ষেত্রগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি বছরই মানব পাচার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশের জনশক্তি রপ্তানি বাজারে প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক কনভেনশনের মতে মানব পাচার মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনের অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক কার্যক্রমের। প্রতিবছর কত মানুষ পাচার হয় তার সঠিক কোনো রেকর্ড নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। জাতিসংঘ মানব পাচারকে তাদের প্রোটোকলে স্বীকৃতি দিয়েছে- একে প্রতিহত, দমন, শাস্তির আওতায় আনার জন্য, বিশেষতঃ নারী ও শিশুদের বিষয়ে, (যা পালেরমো পাচার প্রোটোকল নামে খ্যাত)।উক্ত প্রোটোকলটি হচ্ছে গত অর্ধশত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত আইনগতভাবে বাধ্য এবং একমাত্র সম্মতসিদ্ধ চুক্তি যা মানব পাচারের সংজ্ঞা দেয়। মানব পাচার সম্পর্কিত অপরাধের বিচার এবং অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সহজতর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পাচারের শিকার ব্যক্তিদেরকে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণায় দেয়া অধিকার অনুসারে সুরক্ষা প্রদান ও সহায়তা করাও এর একটি উদ্দেশ্য।


সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে, মানব পাচার নামক আধুনিক দাসত্বের শিকার বিশ্বের আনুমানিক ৪ কোটির বেশি মানুষ। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষ নিজেদের জীবনযাপনকে সচ্ছল করতে পারবে এই বিশ্বাসে ছুটছে উন্নত দেশগুলোতে। স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর সরলতার সুযোগকে কাজে লাগায় পাচারকারীরা। এ মানুষগুলো পাচারের শিকার হওয়ার পাশাপাশি আরো কিছু অপরাধের শিকার হয়। যেমন -প্রতারণা, জোরপূর্বক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য, শ্রমদাস, মুক্তিপণ হিসেবে অর্থ আদায়, মাদক পাচারে ব্যবহার, দেহের অঙ্গ স্থানান্তর করে বিক্রি, বিপদজনক খেলাতে ব্যবহার এমনকি অর্থ না পেলে মেরেও ফেলা হয় অনেককে। অনেকগুলো অপরাধ একসাথে সংগঠিত হওয়ায় মানব পাচারকে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৫ সালে বিশ্ব গণমাধ্যমে বিশেষ শিরোনাম ছিল থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের গণকবর পাওয়ার ঘটনাটি। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গলে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখান থেকে বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের ৮টি কঙ্কালসহ ২ জনকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও আরো শতাধিক কবর পাওয়া যায় যেখানে এক বা একাধিক কঙ্কাল ছিল। মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী শঙ্খলা প্রদেশের সাদাও এলাকার জঙ্গলের গণকবর থেকে মোট ৮ জনের কঙ্কাল ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। একটি সাম্প্রতিক ঘটনা কিশোরগঞ্জের ইছার উদ্দিনকে নিয়ে। ২০২০ এর ১৩ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত, বেঁচে থাকার অনুরোধ করে মোট ১১ টি ভয়েস রেকর্ডিং কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার ইছার উদ্দিনের স্ত্রী সুমিকে পাঠানো হয়েছিল। নিখোঁজ ইছার উদ্দিনের সঙ্গে কী ঘটেছে তা এখনও অজানা। ভয়েস রেকর্ডের ভিত্তিতে সুমির শ্যালক মোহাম্মদ আলী তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনাটি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রচার হওয়ার পর, সরকার স্থির হয়ে বসে। অবিলম্বে আদিবাসীরা পাচারকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দেশজুড়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। সারা দেশে সেই ঘটনার পরে ২৯ টি মামলাও রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ টি মামলা তদন্তাধীন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এসবের দায়িত্ব পায়, সম্প্রতি ২৪ টি মামলায় ২৯৯ জন লোকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, ১৮১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যখন ৬ জনের নামে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়, তখন ২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাকি ১৩৪ জনকে ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।

মানব পাচারের দিক থেকে আন্তজার্তিক সংস্থার তালিকাতে কেন বাংলাদেশ শীর্ষে? আমরা যদি এর কারণ খুঁজি তাহলে সর্বপ্রথম যে কারণটি আসবে তা হলো বেকারত্ব। দেশের বিপুল পরিমাণ বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ধারণা, বিদেশে গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। পারিবারিক সচ্ছলতা আসবে এই বিশ্বাস নিয়ে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় তারা। তাদের এই বিশ্বাসকে পুজি করে স্বার্থ হাসিল করে পাচারকারীরা। নারীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বিভিন্ন এলাকার তালাকপ্রাপ্ত, অল্প বয়স্ক বিধবা, কাজের সন্ধান করছে এমন নারীদের টার্গেট করে। অনেক সময় অপহরণ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে পাচার করে দেশে-বিদেশে। আবার সীমান্তবর্তী এলাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতির জন্যও মানব পাচার হয়। সংবাদ মাধ্যমে মানব পাচার রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলেন, সুমদ্রে টহল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত বোট-ট্রলার নেই। কিছুক্ষেত্রে স্থানীয়দের থেকে ভাড়া করে অভিযান চালানো হয়। ৩৬ জন কোস্ট গার্ড দুইটি বোট দিয়ে টহল দেয়, যা টেকনাফের মতো বিশাল জায়গায় জন্য খুবই নগন্য। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সূত্র মতে কক্সবাজার ও টেকনাফের ৮০টি পয়েন্ট দিয়ে মানব পাচার হয়।  দেশের অভ্যন্তরে মানব পাচারের ১৪ টি চক্র রয়েছে এবং লিবিয়া-ইউরোপে আরও ৪ টি চক্র রয়েছে, মোট ১৮ টি চক্র সক্রিয়। তারা বাংলাদেশীদের পাচার করছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে এই চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত বাংলাদেশিকে সংগ্রহ করে এবং দালালদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে লিবিয়ায় পাচার করছে। সূত্র মতে, মানুষ লিবিয়ায় চোরাচালান রিং চারটি দেশকে পাচারের পথ হিসেবে ব্যবহার করেছে। দেশে ১৪ টি চক্রে ৩০০ টিরও বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। লিবিয়ায় আরও চারটি বাংলাদেশি গ্রুপ সক্রিয় আছে। দালালদের মাধ্যমে লিবিয়ায় যাওয়া এই ভুক্তভোগীদের ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি খরচ করতে হয়েছে, তাদের নির্যাতন করা হয়েছে এবং তাদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। দেশে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা অর্থ সংগ্রহ করে। তারা হন্ডির মাধ্যমে দুবাইয়ে টাকা পাঠায়। সেখান থেকে ধাপে ধাপে টাকা বিতরণ করা হয়। দুবাই, আম্মান এবং লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার জন্য একটি পৃথক চক্র রয়েছে। এই বলয়ের সদস্যরা ইউরোপ কেন্দ্রিক মানব পাচারকারী।

২১ শতক, সভ্য এক ধরণীতে দাস প্রথা বড়ই বেমানান। মানব পাচার জঘন্যতম একটি ব্যবসা। এটি নির্মূলের মাধ্যমে আমরা আধুনিক দাস প্রথা থেকে মুক্তি পেতে পারি। সরকার মানব পাচার রোধে তিনটি নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া, সাতটি বিভাগে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, মানুষের প্রতিরোধ ও দমনের অধীনে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি পাচার আইন গঠন হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই মামলার বিচার মহিলারা করবেন এবং শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালও গঠিত হয়েছে। দ্রুত বিচার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মানব পাচারের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিভাগীয় শহরগুলিতে ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করা হয়েছে। মানব পাচার বন্ধে জাল পাসপোর্ট সংক্রান্ত তদন্তাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। যাচাই ছাড়াই পাসপোর্ট দেওয়া নিরুৎসাহিত করা উচিত যাতে মিয়ানমারের নাগরিক সহ কোন বিদেশী জরুরী ফি দিয়ে যাচাই ছাড়াই পাসপোর্ট পেতে না পারে । আমাদের দেশে মূলত একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলে তারপর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ঐ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলে আলোচনা, সমালোচনা, নীতিনির্ধারকদের টকশো এবং সুশীলদের পরামর্শ। কিন্তু কিছুদিন পরে আরো একটি ঘটনার চাপে ঢাকা পড়ে যায় পূর্ববর্তী ঘটনা। আর এভাবেই অপরাধীরা আইনের থেকে পার পেয়ে যায়। মানব পাচার দমন ও প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারে বিলম্ব না করে দ্রুত শাস্তি দেওয়া উচিত। বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাচারকারীদের আটক করতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করতে হবে। 

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।




ডেল্টা টাইমস্/তাইয়্যেবা পুষ্প/সিআর/আরকে

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।

ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো: আমিনুর রহমান
প্রধান কার্যালয়: মহাখালী ডিওএইচএস, রোড নং-৩১, বাড়ী নং- ৪৫৫, প্রকাশক কর্তৃক বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে মুদ্রিত
২১৯ ফকিরাপুল (১ম লেন নীচ তলা), মতিঝিল থেকে প্রকাশিত।  বাণিজ্যিক কার্যালয়: ৩৭/২ জামান টাওয়ার (১৫ তলা), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০।
ফোন: ০২-৪৭১২০৮৬১, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]