
ঈদ—শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে একঝলকে ভেসে ওঠে এক অনাবিল আনন্দের দৃশ্য। নতুন পোশাক, সুগন্ধি, হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রিয়জনদের আলিঙ্গন, সুস্বাদু খাবার, উপহার—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব উৎসবের আবহ। ঈদ মানেই খুশির জোয়ার, যেখানে সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। কিন্তু সত্যিই কি ঈদ সবার জন্য আনন্দের? ঈদের চাঁদের আলো কি সমানভাবে সবার জীবনে আলো ছড়ায়? নাকি এই আলোর নিচে কিছু মানুষ নিঃসঙ্গ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে?আসলে, ঈদ যেমন খুশির প্রতীক, তেমনি কিছু মানুষের জন্য এটি এক বুক হাহাকার, শূন্যতার কষ্ট, আর্তনাদ ও বঞ্চনার এক দীর্ঘশ্বাসও বটে।
সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের ঈদ উদযাপনের ধরন এক নয়। কেউ ঈদের পোশাক কেনার জন্য লাখ টাকা খরচ করে, আবার কেউ সারারাত সেলাই মেশিন চালিয়ে কারও ঈদের পোশাক তৈরি করে দেয়, অথচ নিজের সন্তানের জন্য একটি নতুন পোশাকও কিনতে পারে না।একদিকে বিশাল বিশাল শপিং মলগুলোর ঝলমলে আলোয় মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঈদের কেনাকাটায়, অন্যদিকে ফুটপাতের এক কোণে বসে থাকা এক বিধবা মা তার ছেলের জন্য একটা পুরনো পাঞ্জাবিও জোগাড় করতে পারেন না।এই বৈষম্য কি ঈদের আনন্দকে সবার জন্য সমান রাখে? নিশ্চয়ই না। বরং এই পার্থক্য আরও প্রকট করে তোলে ঈদের আনন্দ-বেদনার ব্যবধান।
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের জন্য ঈদ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন মাত্র। তাদের জীবনে ঈদের কোনো বিশেষত্ব নেই, কারণ তাদের প্রতিটি দিনই সংগ্রামের, প্রতিটি মুহূর্তই বেঁচে থাকার লড়াই।একজন দিনমজুরের গল্প ধরা যাক। রমজানের শেষ দিনেও তিনি ভাবছেন, কালকের দিনটায় যদি কোনো কাজ না পান, তাহলে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করবেন কীভাবে? তার ছেলেমেয়ে হয়তো অপেক্ষায় আছে নতুন জামার, কিন্তু সেই বাবা জানেন, তাদের মুখে দু'মুঠো ভাত তুলে দিতেই তার হিমশিম খেতে হয়।এদিকে রাস্তার শিশুরা, যাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, তারা ঈদের দিনেও হয়তো ফুটপাতে বসে হাত বাড়িয়ে থাকবে। তাদের কাছে ঈদ মানে কি? নতুন জামা? সেমাই? না, ঈদ মানে তাদের জন্য হয়তো একটু বেশি ভিক্ষা পাওয়া, একটু বেশি সহানুভূতি পাওয়া।
ঈদ পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উৎসব। কিন্তু যেসব মা স্বামী হারিয়েছেন, কিংবা যাদের সন্তানরা তাদের ভুলে গেছে, তাদের জন্য ঈদের সকাল মানেই এক বুক দীর্ঘশ্বাস।একজন বিধবা মায়ের কথা ভাবুন। ছোটবেলায় তার সন্তানরা ঈদের দিন সকালে তার হাত ধরে মসজিদে যেত, নতুন জামা পরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠত। কিন্তু আজ সেই মা একাকী একটি ঘরে বসে আছেন। তার সন্তানরা বড় হয়ে গেছে, ব্যস্ত জীবনে তারা মাকে ঈদের দিনে মনে রাখার সময়টুকুও পায় না। হয়তো মা অপেক্ষায় থাকেন, ফোন বাজবে, সন্তানের কণ্ঠ শুনবেন, কিন্তু দিন শেষে সেই ফোন আর বাজে না।
একটি বৃদ্ধাশ্রমের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ঈদ মানে সবার জন্য আনন্দ নয়। সেখানে অনেক বাবা-মা থাকেন, যাদের সন্তানরা হয়তো খুবই সফল, কিন্তু সেই বৃদ্ধ বাবা-মার ঈদ কাটে নিঃসঙ্গতায়।তাদের চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে পুরনো ঈদের স্মৃতি—যখন বাড়ির উঠোনে কোলাহল ছিল, সন্তানরা দৌড়ে এসে সালাম করত, ঈদের সেমাইয়ের গন্ধে ঘর ভরে যেত। কিন্তু আজ? আজ তারা একাকী, কেউ তাদের মনে রাখে না।এ যেন এক করুণ বাস্তবতা, যেখানে ঈদের আনন্দের বদলে শুধুই চোখের জলে ঈদের দিনটা শেষ হয়।
প্রবাসীদের ঈদ অনেকটাই একাকীত্বের নামান্তর। যারা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বিদেশে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন, তারা ঈদের দিনেও অফিসের ডিউটিতে থাকেন।তাদের কাছে ঈদ মানে হয়তো ঘরের কোণে বসে এক প্লেট খাবার খাওয়া, অথবা ভিডিও কলে সন্তানকে নতুন জামা পরে হাসতে দেখা। কিন্তু তারা ছুঁতে পারেন না সেই হাসি, অনুভব করতে পারেন না সেই উষ্ণতাএকজন প্রবাসী বাবা হয়তো দেখেন, তার সন্তান ঈদের দিন নতুন খেলনা নিয়ে খেলছে, কিন্তু সে নিজে সেই খেলনাটা হাতে তুলে দিতে পারছেন না। এই দূরত্বের ব্যথা কি ঈদের খুশির মধ্যে ঢেকে যায়?
এই পৃথিবীতে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে ঈদ মানেই কান্না, ঈদ মানেই হারানোর বেদনা। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেন কিংবা আফগানিস্তানের শিশুদের কাছে ঈদ মানে বোমার শব্দ, ধ্বংসস্তূপের মাঝে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, আর যুদ্ধবিধ্বস্ত ভবনের ছায়ায় কাটানো একেকটি মুহূর্ত।যে শিশুটি ঈদের আগে বাবাকে হারিয়েছে, যে মা তার সন্তানের লাশ কাঁধে তুলেছেন, তাদের কাছে ঈদ শুধুই শূন্যতা। ঈদের নতুন পোশাকের পরিবর্তে তারা হয়তো জড়িয়েছেন রক্তমাখা কাপড়, ঈদের কোলাহলের বদলে শুনেছেন শোকের মাতম।এই যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষগুলোর জন্য ঈদ মানে শুধুই বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ঈদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এটি সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনে। আমাদের দায়িত্ব হলো, যারা বঞ্চিত, যাদের ঈদ নিঃসঙ্গতায় কাটে, তাদের পাশে দাঁড়ানো।আমরা যদি প্রতিজ্ঞা করি—অন্তত একজন দরিদ্র শিশুকে ঈদের নতুন পোশাক দেবো,বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে কিছু সময় কাটাবো,প্রবাসী আত্মীয়দের একটি আন্তরিক ফোন কল করবো,প্রতিবেশী কোনো অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করবো তাহলে ঈদ সত্যিকারের এক আনন্দের উৎসবে পরিণত হবে।
ঈদ কেবল আনন্দ উদযাপনের জন্য নয়, এটি মানবতার এক মহৎ বার্তা। এটি কেবল আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর নাম নয়, বরং এটি এমন এক উপলক্ষ, যেখানে দুঃখী-অসহায় মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোর সুযোগ রয়েছে।আমরা যদি আমাদের আশপাশের মানুষগুলোর কষ্ট ভাগ করে নিতে পারি, তবে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। ঈদ হোক সবার জন্য, ঈদ হোক ভালোবাসার, ঈদ হোক মানবতার জয়গান।