নেট দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা: সংকটের গল্প

জয়া রানী পাল:

মতামত

ইন্টারনেট—আধুনিক যুগের এক মহাশক্তি, যা বিপ্লব এনে দিয়েছে যোগাযোগব্যবস্থায়, প্রসার ঘটিয়েছে শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদনসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।

2025-04-05T11:33:24+06:00
2025-04-05T11:45:36+06:00
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

নেট দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা: সংকটের গল্প
জয়া রানী পাল:
প্রকাশ: শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৫, ১১:৩৩ এএম  আপডেট: ০৫.০৪.২০২৫ ১১:৪৫ এএম  (ভিজিট : ৬৭৬)
ইন্টারনেট—আধুনিক যুগের এক মহাশক্তি, যা বিপ্লব এনে দিয়েছে যোগাযোগব্যবস্থায়, প্রসার ঘটিয়েছে শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদনসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন এখন এতটাই প্রযুক্তিনির্ভর যে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা মুঠোফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখি—খবর পড়া, ক্লাসে যোগ দেওয়া, অফিসের কাজ, এমনকি বাজার করা পর্যন্ত—সবকিছুতেই ইন্টারনেট এখন একটি অনিবার্য সঙ্গী।

তবে প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তির জগৎ কি সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ? বিশেষ করে নারীদের জন্য?

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব বা মেসেঞ্জার—এসব প্ল্যাটফর্মে নারীর সক্রিয়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের প্রতি সহিংসতা ও হয়রানির মাত্রাও। দিনে দিনে সাইবার অপরাধের ভয়াবহতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যা আর অবহেলা করার মতো নয়।

সাইবার হয়রানির ধরনগুলো প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ কটুক্তি, অবাঞ্ছিত বার্তা বা বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানো থেকে শুরু করে নারীর ব্যক্তিগত ছবি এডিট করে ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া আইডি তৈরি করে চরিত্র হনন করা, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল—এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক সময় প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে পরে তা ভাইরাল করার হুমকিও দেওয়া হয়।

তরুণী বা কিশোরীদের অনলাইনে টিউশন খোঁজার ক্ষেত্রেও জালিয়াতির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মেয়েদের নাম বা ছবি ব্যবহার করে ফেক আইডি তৈরি করে প্রতারণামূলকভাবে টিউশনি আদান-প্রদান, এমনকি অশালীন প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা হয়তো একবার চুপ করে যান, লজ্জায় মুখ বন্ধ রাখেন—কিন্তু দুঃসহ অভিজ্ঞতার দাগ তারা বয়ে বেড়ান দীর্ঘদিন।

এই সব ঘটনা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আত্মবিশ্বাসে ভাঙন, সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। অথচ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ঘটে যাওয়া এই অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো বা বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়াও অনেক সময় জটিল ও হতাশাজনক হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাস্তবতার গভীরে রয়েছে আমাদের সামাজিক কাঠামোর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখনো সমাজে এমন মানসিকতা প্রবল যে, মেয়েরা অনলাইনে 'খোলামেলা' থাকলে হয়রানির শিকার হওয়াটা যেন খুব স্বাভাবিক! আর পুরুষদের একটি অংশ এই অনলাইন হয়রানিকে নিছক ‘মজা’ বা ‘উপহাস’ হিসেবে দেখে, যার পেছনে রয়েছে নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব।

তবে সমস্যার সমাধান যে অসম্ভব নয়, তা প্রমাণ করতে হলে আমাদের নিতে হবে বহুমাত্রিক উদ্যোগ।

প্রথমত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা ও দায়িত্ব শেখাতে হবে। শিশু ও কিশোরদের জন্য ডিজিটাল লিটারেসি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ অন্যান্য সাইবার আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও জনবান্ধব ও ভুক্তভোগী-বান্ধব হতে হবে।

তৃতীয়ত, মেয়েদের সাইবার সচেতনতা বাড়ানোর জন্য জাতীয় পর্যায়ে প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি, বেসরকারি সংগঠন ও উদ্যোগগুলোকেও নারীকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসতে হবে।

এছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে নারী-বান্ধব পলিসি বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। দ্রুত রিপোর্টিং ব্যবস্থা, সন্দেহজনক কনটেন্টের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাব এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তে প্রযুক্তিগত উন্নয়নও জরুরি।

সাইবার দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে প্রযুক্তির সব সুবিধা একশ্রেণির জন্য একতরফা থেকে যাবে, আর নারীরা থেকে যাবেন নির্যাতনের শিকার হয়ে।

তাই এখন সময় নারীর কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো করার, সোচ্চার হওয়ার। প্রযুক্তির আলো যেন সবার জন্য হয় সমান উজ্জ্বল, নেট দুনিয়া হোক নিরাপদ, সম্মানজনক ও মানবিক—এটাই হোক আমাদের সামষ্টিক অঙ্গীকার।

লেখক : শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ডেল্টা টাইমস/জয়া রানী পাল/সিআর/এমই









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ