বজ্রপাতে মৃত্যু: প্রকৃতির তাণ্ডব না মানবিক অবহেলার ফল

প্রজ্ঞা দাস

মতামত

বজ্রপাত প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু বর্তমানে এটি প্রাণঘাতী বিপদে পরিণত হয়েছে।** বজ্রপাত হলো মেঘ থেকে ভূমিতে বিদ্যুতের

2025-04-18T15:12:54+06:00
2025-04-18T15:12:54+06:00
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩

বজ্রপাতে মৃত্যু: প্রকৃতির তাণ্ডব না মানবিক অবহেলার ফল
প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৫, ৩:১২ পিএম   (ভিজিট : ২৭২)
বজ্রপাত প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু বর্তমানে এটি প্রাণঘাতী বিপদে পরিণত হয়েছে।** বজ্রপাত হলো মেঘ থেকে ভূমিতে বিদ্যুতের তীব্র নিঃসরণ, যা সাধারণত কালবৈশাখী ঝড়ের সময় ঘটে। উষ্ণ ও আর্দ্র বাষ্প দ্রুত উপরে উঠে ঠাণ্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে মেঘের মধ্যে ইলেকট্রিক চার্জ তৈরি হয়। অতিরিক্ত শক্তি জমে গেলে সেই চার্জ মাটিতে নেমে আসে—এটিই বজ্রপাত। এই সময় তাপমাত্রা ৩০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, যা মুহূর্তে প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। ২০২৪ সালে সরকারি হিসেবে প্রায় ৪০০ ও বেসরকারি হিসেবে ৬৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। গড়ে প্রতিদিন দুইজনের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য, হঠাৎ এবং যন্ত্রণাহীন হলেও ভয়াবহ।

বাংলাদেশ এখন বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।** এটা গর্ব নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক নির্মম চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। NASA-এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি ১° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১২% বাড়ে। বাংলাদেশে গত ৩০ বছরে গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৫° বেড়েছে। তার ওপর নির্বিচারে গাছ কাটা ও বনভূমি হ্রাস এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ২৫% বনভূমি হারিয়ে গেছে। ফলে বজ্রপাত সরাসরি মাটিতে আঘাত করছে, প্রাণ নিচ্ছে সাধারণ মানুষের।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কৃষক, দিনমজুর ও শিশুরা বেশি ঝুঁকির মুখে। কারণ মাঠে কাজ করার সময় তাদের আশ্রয়ের কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ ভবনগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা যেমন লাইটনিং অ্যারেস্টর নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মাত্র ৮% গ্রামীণ ভবনে লাইটনিং অ্যারেস্টর রয়েছে।

জনসচেতনতার অভাব এখানেও মারাত্মক রূপে বিদ্যমান।** দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের জরিপে জানা গেছে, মাত্র ১৮% গ্রামীণ মানুষ জানেন যে বজ্রপাতের সময় গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে দাঁড়ানো বিপজ্জনক। অধিকাংশই জানেন না বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ধাতব গহনা পরিধান বা পানিতে থাকা কতটা বিপদজনক হতে পারে।

অন্য বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলো স্কুলভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ অ্যাপ, মোবাইল টেক্সট অ্যালার্ট, গ্রামীণ বজ্রনিরোধক টাওয়ার বসানোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সচেতনতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। সরকার প্রকল্প নিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন একেবারেই দুর্বল। সামাজিক কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে অনেকে বজ্রপাতকে আজো "অদৃশ্য শক্তির শাস্তি" মনে করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কতা অনেকের কাছে হাস্যকর বলে বিবেচিত হয়।

তবে এই বিপদ মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজন সম্মিলিত পদক্ষেপ।** জাতীয় বজ্রপাত ঝুঁকি হ্রাস নীতিমালা তৈরি এবং তা কার্যকর করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে বজ্রনিরোধক অবকাঠামো নির্মাণ, বিনামূল্যে মোবাইল সতর্কবার্তা চালু, এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতি ৫০০ মিটার অন্তর উচ্চ কংক্রিটের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। এসব বাস্তবায়ন হলে মাঠে কাজ করা কৃষকদের প্রাণরক্ষা সম্ভব।

বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এর ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণে মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র।গাছ লাগানো, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। বাংলাদেশ যেভাবে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়েছে, সেভাবেই বজ্রপাত প্রতিরোধেও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। নইলে প্রতিবছর আমাদের হারাতে হবে আরও অনেক অমূল্য প্রাণ।


✍️ শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর









  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ