|
সম্মানিত হজযাত্রীদের জন্য পরামর্শ
এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ:
|
![]() সম্মানিত হজযাত্রীদের জন্য পরামর্শ মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা স্বয়ং হজের পরিকল্পক ও নকশাকার আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজের সফল বাস্তবায়নকারী। হজের সময় আমরা পৃথিবীর প্রথম মানব ও নবী তথা মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.), মুসলিম জাতির পিতা নবী হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও নবী হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে জীবনের জন্য অতিশয় মূল্যবান কিছু শিক্ষালাভ করি। এর পাশাপাশি যে শারীরিক ও মানসিক উপলব্ধি হয়, বাকি জীবনে সেগুলোই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। পবিত্র হজপালনের উদ্দেশ্যে এবার যারা সৌদি আরব যাচ্ছেন, এই লেখাটা তাদের জন্য। হজ হচ্ছে ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রতি পদক্ষেপে আপনাকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। যত প্রস্তুতিই নেন আর যত ভালো সঙ্গই বাছাই করেন না কেন, সৌদি আরবে যাওয়ার পর অনেক কিছুই আশানুরূপ হবে না বা মনের মতো করে পাবেন না। তবু আপনাকে হাসিমুখে সব পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কারো সমালোচনা করবেন না কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য করে অহেতুক গুনাহের ভাগীদার হবেন না। যেহেতু ইবাদতের উদ্দেশ্যেই যাচ্ছেন, পাঁচওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও তাহাজ্জুদের নামাজ, এশরাকের নামাজ ও চাশতের নামাজ যথাসময়ে আদায় করবেন। মক্কায় বেশি করে তাওয়াফ করার চেষ্টা করবেন। কোরআন তিলাওয়াত করবেন। হজের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসবে, তত বেশি হাজিদের ভিড় বাড়তে থাকবে। সুতরাং হজ শেষ করার অপেক্ষায় না থেকে যত পারেন নফল তাওয়াফ করতে থাকুন। তবে শারীরিক সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত চাপ নেবেন না। হজ সম্পন্ন করে দেশে ফেরা পর্যন্ত নিজেকে সুস্থ, কর্মক্ষম ও সক্রিয় রাখতে হবে। হারাম শরিফে এত হাজির গণজমায়েত হয় যে, একবার বের হয়ে এলে আবার ঢোকা মুশকিল। সে কারণে নামাজের উদ্দেশ্যে ঢোকার আগে পানি কম পান করবেন। কাবাঘর প্রথম দর্শনের সময় যা কিছু দোয়া করবেন, সব কবুল হবে ইনশাল্লাহ। সুতরাং কী দোয়া করবেন- সেটা কাবা শরিফ দৃষ্টিসীমার ভেতরে আসার আগেই মনে মনে সাজিয়ে নিন। হজযাত্রীরা তাদের স্মার্টফোনে nusuk অ্যাপটি ডাউনলোড করে নেবেন। সেখানে আপনার নাম, মুঠোফোন নম্বর, ভিসা নম্বর ইত্যাদি নিবন্ধন করে রাখতে হবে। তারপর মদিনা শরিফে অবস্থানের সময়সূচি মিলিয়ে রিয়াজুল জান্নাতে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের জন্য অনলাইনে অগ্রিম বুকিং দিতে হবে। আপনি যে হোটেলে থাকবেন, নামাজের সময় তার সামনে অবধি কাতার দাঁড়িয়ে যাবে। তাই বলে অলসতা করবেন না। চেষ্টা করবেন প্রত্যেক ওয়াক্তে হারাম শরিফের সীমানার ভেতরে গিয়ে নামাজ আদায় করতে। এজন্য ওয়াক্ত শুরু হওয়ার অনেক আগে রওনা হতে হবে, নইলে মুসল্লিদের ভিড়ে ভেতরে ঢোকার সুযোগই পারবেন না। মসজিদুল হারামে নামাজ পড়তে যেতে সব ওয়াক্তের নামাজে অবশ্যই জায়নামাজ সাথে নেবেন। কারন আপনি মসজিদের ভেতরে ঢুকতে পারবেন কিনা নিশ্চিত বলা যাবেনা। অনেক সময় বাইরে মাঠে, রাস্তায়, কবুতর চত্বর এসব জায়গায় নামাজ পড়তে হতে পারে। তাই জায়নামাজ সাথে থাকলে তা বিছিয়ে নামাজ আদায় করতে সুবিধা হবে। তাছাড়া জোহর ও আসরের ওয়াক্তে প্রচন্ড রোদ পড়ে। সেসময় মসজিদে আসা যাওয়ার সময় ফোল্ডিং ছাতা ব্যবহার করা উত্তম। দীর্ঘক্ষণ মসজিদুল হারামে অবস্থানকালে অনেক সময় অজু করতে সমস্যা হতে পারে। আবার সব জায়গায় অজুর ব্যবস্থা থাকে না। বারবার বাইরে এসে অজুখানায় যাওয়া কষ্ট ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, আবার কোন কোন সময় অজু করতে বের হলে আবার ভিতরে প্রবেশের সুযোগ নাও মিলতে পারে। এরকম পরিস্থিতি হলে সহজে অজু করার জন্য আপনি ছোট এক বোতল পানি রাখবেন, অজু ছুটে গেলে বোতল থেকে অল্প অল্প পানি দিয়ে সহজে অল্প পানি দিয়ে অজু করে নিতে পারেন। তবে বের হবেন জমজমের পানি পান করে। হারাম শরিফ থেকে বের হওয়ার সময় জমজমের পানি ভরে এনে হোটেল কক্ষে পান করার জন্য একটি বোতল সঙ্গে রাখতে পারেন। হজের সফরকালে খাদ্য নির্বাচনে যথাসম্ভব সতর্ক থাকবেন। যত পারেন জমজমের পানি পান করবেন। তবে ঠান্ডা পানি পান করা থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকবেন। ফার্স্টফুড কম খাওয়ার চেষ্টা করবেন, পারলে এড়িয়ে চলবেন। ভাজা-পোড়া পুরোপুরি বর্জন করবেন। তার বদলে নানা ধরনের খেজুরের স্বাদ নিন। আরব দেশের বৈচিত্র্যপূর্ণ ফল ও ফলের রস খেতে পারেন। প্রতিদিন টকদই, লাচ্ছা, মাঠা কিনে খাবেন। অনেকেই হাজিদের মধ্যে খাবার বিতরণ করেন। আপনার চারপাশে খাবারের ছড়াছড়ি দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আপনি প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবার সংগ্রহ করতেই পারেন। কিন্তু পরে খাব এই আশায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে অন্যের হক নষ্ট করবেন না। অতিরিক্ত খাবারের বোঝা বইতে আপনারই বরং কষ্ট হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সাথে রাখার জন্য কাপড়ের তৈরী ছোট একটি কাঁধের ব্যাগই যথেষ্ট। এই ব্যাগে পলিথিন মোড়ানো জুতা, ছাতা, জায়নামাজ, এক বোতল পানি, কিছু শুকনো খাবার, মোবাইল ইত্যাদি রাখা যায়। সেই ব্যাগটিই সবসময় সাথে রাখা যাবে। আপনার ব্যবহৃত জুতা/ সেন্ডেল নিরাপদ রাখার জন্য পলিব্যাগ রাখা উচিত। জুতা রাখার জন্য আলাদা ব্যাগ না নিয়ে পলিব্যাগ রাখবেন। মসজিদে ঢোকার আগে পলিব্যাগে জুতা ঢুকিয়ে সেই জুতা আপনার কাঁধের ব্যাগে রাখবেন। এতে মসজিদও পবিত্র থাকলো, আপনার জুতাও নিরাপদ থাকলো। প্রথম দিন হোটেলে উঠেই অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে হোটেলের ঠিকানা লেখা কার্ড চেয়ে নেবেন এবং সেটা পাসপোর্টের মতোই সব সময় সঙ্গে রাখবেন (বহন করবেন)। পাসপোর্ট যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া আইডি কার্ড ও সৌদি মোয়াল্লেমের কার্ড সব সময় গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে। কোনো কারণে দিকভ্রান্ত হয়ে গেলে সুউচ্চ মক্কা টাওয়ারকে লক্ষ করে যথাস্থানে ফিরে আসবেন। কখনো যদি হারিয়েও যান, টেনশন করবেন না। সবার আগে ধীরে-সুস্থে ইবাদত শেষ করুন, তারপর জমজমের পানি পান করে ঠিকানা খুঁজে বের করুন। মিনা ও আরাফাহ ময়দানের তাবুতে বিছানা, বালিশ, চাদর ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। তাই অপ্রয়োজনীয় কিছু নেয়া লাগে না। কেবল সুগন্ধহীন সাবান, মেসওয়াক বা ব্রাশ এই জাতীয় জিনিস নিলেই চলবে। আপনার প্রয়োজনীয় ওষুধ সাথে বা হ্যান্ড ব্যাগে নেবেন অর্থাৎ যে ব্যাগ বিমানে/ গাড়িতে হাতে থাকবে, সেখানে নেবেন। যাতে প্রয়োজনের সাথে সাথে পেতে পারেন। হজের সময় যতদিন মক্কা-মদিনায় অবস্থান করবেন, দিন হিসেব করে প্রয়োজনীয় ঔষধ সাথে নিয়ে নিবেন। মক্কা-মদিনায় বাংলাদেশ হজ মিশনের অফিস রয়েছে ও সেখানে অস্থায়ী মেডিকেল সেন্টারে ডাক্তার দ্বারা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এহরাম বাঁধা এবং ওমরাহ ও হজপালনের ওপর ইউটিউবে অনেক প্রশিক্ষণমূলক বা গাইড ভিডিও ছড়িয়ে আছে। অবসর সময়ে সেগুলো দেখে নিয়মকানুন জেনে নিতে পারেন। এগুলো আপনার সর্বিক প্রস্তুতির জন্য অনেক সহায়ক হবে। সৌদি আরবে তুলনামুলক গরম আবহাওয়া হওয়ায়। অনেকে পা ফাটা জনিত সমস্যা থাকে, এই সময় দিনে দুই-তিন বার পায়ে ভেসলিন ব্যবহার আপনাকে আরাম দেবে। হজের দিনগুলোতে প্রচুর হাঁটতে হয়। বিশেষ করে হারাম শরীফে আসা-যাওয়া, কাবাঘর তাওয়াফ করার সময় পাঁচ দিন প্রচুর হাটতে হয়। এতে অনেকের পায়ে ব্যথা হয়। তাই ব্যথানাশক ওষুধ অবশ্যই সাথে নিয়ে যাবেন। হাঁটার সময় পায়ের তালুতে গরম অনুভূত হলে মাঝে মাঝে পায়ে পানি দিতে পারেন। যা আপনার চলার পথে পায়ের জন্য আরমদায়ক হবে। হজযাত্রীরা হজ গাইডবিষয়ক বিভিন্ন বই পাওয়া যায়, অন্তত একটা বই অবশ্যই সঙ্গে করে সৌদি আরব নিয়ে যাবেন। এ বইগুলোতে বিভিন্ন দোয়া, ওমরাহ ও হজবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া থাকে। সেগুলো অনুসরণ করতে পারেন। আল্লাহপাক রাব্বুলআলামিন সকল হাজীদের হজ তথা ইবাদত কবুল করুন। লেখক : মহাব্যবস্থাপক, মানব সম্পদ ও প্রশাসন বিভাগ ইস্টার্ন সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ডেল্টা টাইমস/এ টি এম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ/সিআর/এমই
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |