কর্মসংস্থান অধিদপ্তর কেন প্রয়োজন?
মোহাম্মদ কুদ্দুছ আলী সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৫, ৪:০৬ পিএম

.

.

কোরিয়া এমপ্লয়মেন্ট ইনফরমেশন সার্ভিস (কেইআই্এস) হলো একটি সরকারি সংস্থা যা দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বেকারত্ব কমানোর কৌশল প্রণয়ন এবং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করে। কেইআই্এস একটি ইন্টেলিজেন্ট ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস যা ‘জবকেয়ার’ নামেও পরিচিত। এই সেবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডেটাভিত্তিক, যা সেবাপ্রার্থীদের পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে সহায়তা প্রদান করে। এই সংস্থার মূল কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ, চাকরির তথ্য সংগ্রহ ও প্রদান, ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও পরামর্শ প্রদান, কর্মসংস্থান সম্পর্কিত সরকারি নীতির বাস্তবায়ন এবং চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন। কেইআই্এস মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত পরিষেবাগুলো সহজলভ্য করে তুলতে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে কাজ করে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করে থাকে। সরকার কোরিয়া এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি ফর পারসন্স উইথ ডিসএবিলিটিজ (কেইএডি)-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করে, যাতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ স্বনির্ভর হয়ে জীবন যাপন করতে পারেন।

জাপানে হ্যালো ওয়ার্ক নামীয় কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র (এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস সেন্টার) রয়েছে যা জাপান সরকারের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। জাপানের প্রায় সব শহরে হ্যালো ওয়ার্ক অফিস রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো বেকার ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করে থাকে। হ্যালো ওয়ার্ক দপ্তর সে দেশের সাম্প্রতিক চাকরির প্রস্তাবগুলোর একটি বিস্তৃত ডাটাবেজ বজায় রাখে, যা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি সহজলভ্য তথ্যভাণ্ডার হিসেবে গড়ে উঠেছে। এ দপ্তর চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জোরদার সহায়তা, নিয়োগ সাক্ষাৎকার প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার সাথে সংযোগ, মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ (কনসালটেন্সি), প্রশিক্ষণ প্রদান, বেকারত্ব ভাতা (ইউনেমপ্লয়মেন্ট ইনস্যুরেন্স) প্রদান এবং যোগ্যতা পরীক্ষা (অ্যাপটিটিউড টেস্ট) নিয়ে থাকে। হ্যালো ওয়ার্ক জাপানে বসবাসকারী বিদেশি বাসিন্দাদের জাপানি ভাষায় দক্ষতা উন্নয়নেরও পরামর্শ দেয়। এছাড়াও জাপানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হয়। হ্যালো ওয়ার্ক, ভোকেশনাল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, এবং অন্যান্য বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের চাকরির সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা হয়।

আমেরিকান জব সেন্টারস (এজেসি) হলো যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র, যা চাকরিপ্রার্থীদের কর্ম অনুসন্ধানে সহায়তা করে এবং চাকরিদাতাদের জন্য উপযুক্ত কর্মী খুঁজতে সহায়তা করে। এই কেন্দ্রগুলো ইউ.এস. ডিপার্টমেন্ট অব লেবারের অধীনে পরিচালিত হয়। আমেরিকান জব সেন্টারস চাকরিপ্রার্থীদের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় চাকরির তালিকা প্রণয়ন, কর্মজীবন সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান ও পরিকল্পনা গ্রহণ, বেকারত্ব ভাতা (ইউনেমপ্লয়মেন্ট ইনস্যুরেন্স) প্রদান সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ ও সহায়তা প্রদান, চাকরি প্রাপ্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন ফ্রি ও স্বল্পমূল্যের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করা, চাকরিদাতাদের সহায়তা প্রদান, চাকরিপ্রার্থীদের বিনামূল্যে রিজ্যুমে তৈরি, এবং চাকরির ইন্টারভিউ-তে ভালো করার প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সহায়তা দেয়া হয়। আমেরিকান জব সেন্টারস (এজেসি)-এর পাশাপাশি কিছু বিশেষ সংস্থা ও প্রোগ্রাম রয়েছে, যা প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরি পেতে এবং কর্মজীবনে সফল হতে সহায়তা করে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র (এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস সেন্টার) রয়েছে। এই সেবা কেন্দ্রগুলো চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের সহায়তা প্রদান করাসহ এ সংক্রান্ত নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। এ সকল দেশের কর্মসংস্থান সেবা সম্পর্কিত উত্তম-চর্চা (বেস্ট প্র্যাকটিস) অনুসরণ করে বাংলাদেশেও একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র সৃজন করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৬৫ বা তদূর্ধ্ব কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১৫ লক্ষ; এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লক্ষ। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৫৮ লক্ষ এবং মহিলা ২ কোটি ১৭ লক্ষ। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮.৪ লক্ষ এবং বৈদেশিক কর্মে ৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষের শিক্ষা, পেশাগত মান ও সামাজিক অবস্থানের বৈচিত্র্য এবং পক্ষান্তরে কর্মের চাহিদা ও সুযোগের বৈচিত্র্য এত বেশি যে, কর্মক্ষম ব্যক্তিদের পক্ষে উপযুক্ত কর্ম অনুসন্ধান ও সেই কর্মের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দেশে সরকারি-বেসরকারি ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন; তাদের চাকরিযোগ্য করে তোলা বা চাকরি পাওয়ার পথ দেখিয়ে দেওয়া বা কাউন্সেলিং করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা দেশে নেই বললেই চলে। বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার এসব কার্যক্রম সমন্বয় সাধনের জন্য নিবেদিত ও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাছাড়া প্রতিবছর শ্রমবাজারে ট্রেডভিত্তিক শ্রমিকের চাহিদা এবং সরবরাহের বিষয়ে কোনো সুসংগঠিত তথ্যভাণ্ডার ও গবেষণা নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক/শ্রমিকদের কত সংখ্যক নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তৈরি এবং তা মনিটরিংয়ের জন্য কোনো দপ্তর/সংস্থা নেই। ফলশ্রুতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ কর্মের বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রশিক্ষণ বাবদ সরকারি অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সম্পর্কিত একটি দপ্তর গঠন করা হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল যোগে কর্মসংস্থান পুল গঠন করে শ্রমবাজারে নিয়োগ পাওয়ার তথ্যটি নিশ্চিত করা বা মনিটরিং করা সম্ভব হবে। এতে কর্মক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা সহজতর হবে। কর্মসংস্থান বিষয়ে নীতি নির্ধারণ, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মে নিয়োগের উপায় নির্ধারণের উদ্দেশ্যে একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।


লেখক: যুগ্মসচিব (কর্মসংস্থান), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

ডেল্টা টাইমস/মোহাম্মদ কুদদুস আলী সরকার/সিআর

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : deltatimes24@gmail.com, deltatimes24@yahoo.com