|
রাজনীতির একাল-সেকাল: শাহবাগ, ‘লাকি’ ও আদর্শের দ্বন্দ্ব
মোহাম্মদ আবদুল মুবিন
|
![]() রাজনীতির একাল-সেকাল: শাহবাগ, ‘লাকি’ ও আদর্শের দ্বন্দ্ব একইভাবে, শাহবাগ আন্দোলন থেকে উদ্ভূত ‘লাকি’ শব্দটির উত্থান ও ব্যবহারও রাজনৈতিক প্রতীকী শব্দচর্চার আরেক দৃষ্টান্ত। স্বাধীনচেতা, নারীবাদী ও আধুনিক জীবনযাপনকারী নারীদের হেয় করতে শব্দটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্যণীয়ভাবে এই ধরনের নারীদের টার্গেট করেই এ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দচর্চা শুধু রাজনৈতিক বিদ্রূপেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে সমাজের রাজনৈতিক বোধ ও মতপ্রকাশের ভাষাকে প্রভাবিত করে। একটি শব্দ যখন বারবার বিদ্রূপের মোড়কে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ধীরে ধীরে নিজস্ব অর্থ হারিয়ে এক ধরনের অপসাংস্কৃতির রূপ নেয়। বিস্ময়ের বিষয় হলো, যাঁরা এই শব্দচর্চার সূচনা করেছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন রাজনৈতিক সুবিধার জন্য সেই নারীদের তোলা স্লোগানে কণ্ঠ মেলাতে দেখা যায়। এটি কৌশলগত দ্বিচারিতা, না কি আদর্শিক বিচ্যুতি—তা ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হবে। শাহবাগ একসময় পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ছায়ায় দাবি আদায়ের প্রতীকী স্থানে। সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট পাল্টেছে, কিন্তু স্থানটির ব্যবহার পাল্টায়নি। একসময় জামায়াতে ইসলামি নিষিদ্ধের দাবিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আলোচনায় আসা শাহবাগ আজও আলোচনায়—এইবার ভিন্ন স্লোগানে: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে। স্থানটি যেন একই নাটকের পুনঃমঞ্চায়ন—শুধু চরিত্র ও সংলাপ বদলে গেছে। পরবর্তীতে দেখা গেছে, সেই সময়ের শাহবাগ আন্দোলনের অনেক নেতা সরকারের লক্ষ্য পূরণের পর রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য হারিয়েছেন—কেউ পলাতক হয়েছেন, কেউ নিঃশব্দে রাজনীতি থেকে সরে গেছেন। এমন চরিত্র ও ভাষার রূপান্তর শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও দেখা যায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আন্দোলন এক সময় নিজস্ব ছায়ায় গ্রাসিত হয়। যেমনটি দেখা গেছে আরব বসন্তের পরবর্তী পর্যায়ে—যেখানে দোলনকারীদের নয়, বরং নেতৃত্ব ও লক্ষ্য ক্ষমতালোভী শ্রেণির হাতে স্থানান্তরিত হয়েছে। দার্শনিকদের মতে, ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে—কিন্তু কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে। তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ আমরা আজ দেখছি। অদূর ভবিষ্যতে ইতিহাস আজকের যাপিত ঘটনাগুলোকে কীভাবে পুনরাবৃত্তি করবে, তা এখনই বলা কঠিন। একাল ও সেকালের আন্দোলনের মধ্যে উদ্দেশ্য, স্থান বা পন্থায় মৌলিক পার্থক্য খুব একটা চোখে পড়ে না। উভয় ক্ষেত্রেই গণআন্দোলন সরকার বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য পূরণের বাহ্যিক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যে জনসম্পৃক্ততা গত সরকার জামায়াতের নেতাদের ফাঁসির রায়কে যৌক্তিক ও নৈতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবহার করেছিল, বর্তমান সরকার একই ধরনের জনসম্পৃক্ততা দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চাইছে। পার্থক্য কেবল স্লোগান, মুখ ও পৃষ্ঠপোষকে—যা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই রূপান্তরের অভিঘাতে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয়, তা হলো কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক নেতৃত্বের অবস্থান। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কওমি আলেম সমাজ আদর্শে অবিচল—তাঁরা উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য নীতি ও আদর্শে আপস করেন না। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে অতীতে এই প্রশ্নে বিভাজন ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির মতো দল মনে করত প্রয়োজন হলে অ-ইসলামি পন্থাও গ্রহণযোগ্য। কওমি নেতৃত্ব সবসময় নিজেদের এই অবস্থানের বাইরে দাবি করত। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আমরা দেখেছি, ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অবস্থান নেওয়া এই গোষ্ঠী একসময় এক সনদের বিনিময়ে ঠিক সেই শক্তির উৎসকেই ‘কওমি জননী’র মর্যাদা দেয়। এর চেয়েও বিস্ময়কর, যাঁদের মুখে পহেলা বৈশাখ বরাবরই ‘হারাম’, এবারের পহেলা বৈশাখের দিন সেই ‘কওমি জননী’র বিকৃত প্রতিকৃতি সম্বলিত শোভাযাত্রায় তাঁদের উৎসবমুখর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই বৈপরীত্য তাঁদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান, আস্থা ও ধর্মীয় আদর্শকে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটুভাবে তা ধরা পড়ে তখন, যখন ধর্মীয় দলগুলোর নেতারাই শাহবাগে জড়ো হন, সেই ‘লাকি’ বলে অবজ্ঞা করা নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে স্লোগানে কণ্ঠ মেলান এবং ফ্লোর ভাগাভাগি করেন। এই পরস্পরবিরোধী আচরণ প্রমাণ করে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে ধর্মীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও আদর্শের জায়গা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। এই দৃশ্য শুধু রাজনৈতিক বৈপরীত্য নয়, এক ধরনের নৈতিক পরাভবেরও প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস বলে, আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে যাওয়া প্রতিটি আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত জনসমর্থন হারায়। রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে আদর্শ বিসর্জনের এই প্রবণতা ভবিষ্যতের নেতৃত্বেও প্রভাব ফেলে—বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থার অভাবে গড়ে ওঠে একটি অস্থায়ী, ভঙ্গুর সমর্থক গোষ্ঠী। আর যখন আদর্শ ও কৌশল পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য কী? তাৎক্ষণিক ক্ষমতা অর্জন, নাকি আদর্শিক ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিবর্তন? নৈতিকতা ও কৌশলের এই টানাপড়েন সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতিবিদের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার সংকট তৈরি করে এবং দেশের মৌল ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে। এই প্রবণতা কেবল একটি গোষ্ঠীর নয়, বরং পুরো রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের জন্যই নতুন করে ভাবনার বিষয়। আদর্শের এই অবক্ষয় কি শুধুই কৌশলের অংশ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি আত্মপরিচয়ের সংকট? লেখক : ব্যাংকার ডেল্টা টাইমস/সিআর
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |