নগর ভবনে তালা, আদালতের রায় ও প্রশাসনিক দ্বিচারিতা
মো. শফিকুল ইসলাম:
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ মে, ২০২৫, ১১:০৯ এএম

নগর ভবনে তালা, আদালতের রায় ও প্রশাসনিক দ্বিচারিতা

নগর ভবনে তালা, আদালতের রায় ও প্রশাসনিক দ্বিচারিতা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)-এর মূল কার্যালয় নগর ভবন গত চার দিন যাবৎ কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে। ‘বিচারিক রায়ে নির্বাচিত’ মেয়র ইশরাক হোসেনকে দায়িত্বে বসানোর দাবিতে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা চলমান অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে নগর ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে নাগরিক সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, পাশাপাশি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও করপোরেশনের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমও স্থবির হয়েছে। এই অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে বিচারিক রায়ের বাস্তবায়নে গড়িমসি এবং প্রশাসনিক দ্বিচারিতার বিরূপ চিত্র।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার ভোটে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে পরাজিত করেছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে ওই নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে বিতর্ক চলছিল। অবশেষে গত ২৭ মার্চ ২০২৫ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল নির্বাচনে অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে ফলাফল বাতিল করে ইশরাক হোসেনকে বৈধ মেয়র ঘোষণা করে। নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের পর নির্বাচন কমিশন ২৭ এপ্রিল সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। এই ধারাবাহিকতায় ৪ মে ইশরাক হোসেন শপথ গ্রহণের জন্য আবেদন জানান। কিন্তু সেই আবেদন এখনও কার্যকর হয়নি।

বিষয়টি আরও জটিল হয়, যখন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মামুনুর রশিদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে লিগ্যাল নোটিশ দিয়ে রিট পিটিশন (নং ৮১৩৭/২০২৫) দায়ের করেন। এই রিট পিটিশনে সংশ্লিষ্ট রায় ও গেজেটের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। মামলাটি এখনও বিচারাধীন, এবং হাইকোর্ট থেকে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করার কোনো আদেশ আসেনি। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় “আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত প্রাপ্তির অপেক্ষা” এবং “মামলা বিচারাধীন” এই দুই কারণে কার্যত ইশরাকের শপথ গ্রহণ ঠেকিয়ে রেখেছে।

এ কারণে নগর ভবনের তালা ঝুলিয়ে দেওয়া আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ চলছে, যার মধ্যে একটি দাবি হলো—‘দফা এক দাবি এক, আসিফের পদত্যাগ’। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে এই আন্দোলনকারীরা পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, যতদিন ইশরাককে মেয়র পদে বসানো হবে না, ততদিন নগর ভবনের তালা খুলবে না।

এই পরিস্থিতিতে একটি বিরাট অসঙ্গতির দিক স্পষ্ট হয়—বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ নিজেই গত বছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছিলেন। সেই সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা চলাকালীন অবস্থায় তিনি জনমত গড়ে আন্দোলন করতেন এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেন। সে সময় আদালতের চলমান বিচার কার্যক্রমের মাঝেও জনমত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের জন্য আন্দোলনকে গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে প্রাধান্য দিয়ে ছিলেন। অথচ আজ সেই প্রশাসনই বিচারিক রায়ের বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং রাজনৈতিক অজুহাত দেখিয়ে নির্ধারিত রায় কার্যকর করছে না। এই দ্বৈত মানদণ্ড বা দ্বিচারিতা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? কীভাবে এমন আচরণ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায়?

আইন ও সংবিধানের আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে এবং যেখানে আইনের শাসন ও জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটাইবে।” বিচারিক রায় কার্যকর করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। প্রশাসনিক গড়িমসি সংবিধানের এই মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

বিচারিক রায়ের ওপর প্রশাসনের এই দেরি ও গড়িমসির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের গাইবান্ধা-১ সংসদীয় আসনের ঘটনা একটি নজরকাড়া উদাহরণ। ওই বছর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল পরাজিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল। যদিও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চলছিল, তবুও ওই প্রার্থী এক মাসের মধ্যে শপথ গ্রহণ করেন। আপিল চলাকালীন শপথ গ্রহণ স্থগিত করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—কেন ইশরাক হোসেনের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে?

এমন অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কিছুটা হলেও বোধগম্য। কারণ তারা দেখছেন, আদালতের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হচ্ছে, অথচ সেই দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও নগর ভবনের তালা ঝুলিয়ে রাখা জনদুর্ভোগের কারণ, তবে মূল সমস্যাটি প্রশাসনিক গড়িমসি এবং বিচারিক রায়ের বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও আইনি দ্বন্দ্ব।

বিচার ও প্রশাসন সম্পর্কিত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে নির্বাচনী ফলাফল বাতিলের পর নির্বাচিত প্রার্থীকে শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে হাইকোর্ট রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেনি, সেখানে প্রশাসন কর্তৃক রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি ‘কনটেম্পট অব কোর্ট’ বা আদালত অবমাননার পর্যায়ে যেতে পারে। এই আইনি নীতি নিশ্চিত করে যে, আদালতের রায় সর্বোচ্চ এবং তা বাধ্যতামূলক।

তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, বিচারিক রায় বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা ও প্রশাসনিক অনীহার কারণে গড়িমসি হচ্ছে, যা দেশের শাসন ব্যবস্থায় গভীর ক্ষতি সাধন করছে। এর ফলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হচ্ছে, আদালতের মর্যাদা ও জনগণের বিশ্বাস ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। নাগরিক সেবা বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিচারিক রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও যথাযথ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে যেকোনো রায় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বা সুবিধাভোগী পক্ষের সুবিধার্থেই ব্যাখ্যা করা হতে পারে। এটা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি।

অতএব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে এখনই সতর্ক ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিতে হবে। তারা যেন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আইন, শৃঙ্খলা এবং বিচারিক আদেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে দ্রুততম সময়ে ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদে অধিষ্ঠিত করেন। এতে করপোরেশন কর্তৃক নাগরিক সেবা বন্ধের মতো সমস্যা সমাধান হবে, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব কাটিয়ে জনগণের জন্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

সাম্প্রতিক এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের শাসনব্যবস্থায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে বিচারিক রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় থাকে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয় এবং রাজনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটে। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নিশ্চিত ব্যবস্থা, যা না থাকলে রাষ্ট্রব্যবস্থা শঙ্কিত হয়।

এখানে বিচার ও প্রশাসনের মধ্যে সঠিক সমন্বয় না থাকলে জনসাধারণের মাঝে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। সরকার ও প্রশাসন যদি বিচারিক আদেশ বাস্তবায়নে গড়িমসি করে, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হবে। দেশের শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার জন্য এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট বার্তা নিয়ে এসেছে—বিচারিক রায়ের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। বিচারিক রায়ের প্রতি সম্মান ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণের স্বার্থ রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। না হলে দেশের শাসনব্যবস্থা ও গণতন্ত্র বিপন্ন হবে।

লেখক : প্রধান প্রতিবেদক, ডেল্টা টাইমস।
                                                                                                      
ডেল্টা টাইমস/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]