|
জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেগম জিয়া
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বেগম জিয়া কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়া মাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতিক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু ভালোবাসার ইতিহাস বাংলাদেশের মানুষ তাদের নেতাদের প্রতি কতটা অনুরাগ, কতটা মমতা ধারণ করতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যু পরবর্তী দৃশ্য। তাকে হারিয়ে জাতি যে শোকে নিমজ্জিত হয়েছিল, রাস্তাঘাট, জনসমুদ্রে যে হাহাকার বইয়ে গিয়েছিল, তা ছিল রাষ্ট্রীয় নয়, ছিল ব্যক্তিগত শোকের এক প্রবল বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা চলে যায়, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস চলে যায় না; রাজনীতি বদলায়, কিন্তু ভালোবাসা বদলায় না। আজ সেই ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে, আরও মহিমান্বিত রূপে, আরও গভীর আবেগে, আরও বেদনার্ত মমতায় বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের ভালোবাসার মাধ্যমে। এক নেত্রীর প্রতি জাতির অভাবনীয় আবেগ রাজনীতিতে বিরোধ থাকে, আলোচনা থাকে, মতভেদ থাকে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে যে সম্মিলিত আবেগ দেখা যাচ্ছে, তা রাজনীতির প্রথাগত পরিসরকে ছাপিয়ে গেছে অনেক দূর। হাসপাতালের সামনে মানুষের নীরব ভিড়, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি মানুষের প্রার্থনা, গ্রামগঞ্জে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ, সবকিছু যেন একটাই কথা বলছে-তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি আমাদের জীবনের অংশ, আমাদের ইতিহাসের এক আলোকবর্তিকা। তার প্রতি মানুষের এই ভালোবাসার মূলে আছে তার দেশপ্রেম, বিনয়, সততা ও মাতৃসুলভ নিবেদন। তিনি কখনও রাজনীতিকে ব্যক্তির ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে। যে মানুষটি ক্ষমতায় থেকেও অহংকারে ভাসেন না, যে নেতা ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও বিনয়ের মাটিতে পা রাখেন, জনগণ সেই নেতাকে কখনও ভুলে যায় না। বেগম খালেদা জিয়া তেমনি একজন নেতা। দুইবার তীব্র রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, একাধারে কারাবরণ, একটি সময় গৃহবন্দিত্ব সবকিছু সয়েছেন অসাধারণ ধৈর্য ও মর্যাদায়। তার কথা, তার ভঙ্গিমা, তার সিদ্ধান্ত, সবকিছুতে ছিল দেশের প্রতি তার নিখাদ দায়িত্ববোধ। তিনি কখনও দেশের ক্ষতি করে ব্যক্তিগত লাভ নেননি; কখনও ক্ষমতার মরীচিকায় মোহাচ্ছন্ন হননি। এই বিনয়, এই সততা মানুষকেই আবার তার দিকে ফিরিয়ে এনেছে। দেশপ্রেম ছিল তার শক্তির কেন্দ্র। সময়ের অনেক বিশ্লেষক বলেন, যে দেশে রাজনীতি অনেক সময় পারিবারিক, স্বার্থভিত্তিক অথবা ক্ল্যান-নির্ভর হয়ে পড়ে, সেখানে খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম ছিল এক দুর্লভ উদাহরণ। তিনি যে দেশকে ভালোবেসেছিলেন, তা ক্ষমতার চেয়ারে নয়, তার পরিমাপ ছিল তার সিদ্ধান্তে, তার আপসহীন অবস্থানে, তার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ়তায়। মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী ফেসবুকে লিখেন, সেরে উঠুন বাংলাদেশ। একজন অভিভাবক হিসেবে, যার সুস্থতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগামীর বাংলাদেশ গড়ার দীপ্ত শক্তি, ভাগ্যাহত মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের মসৃণ যাত্রা। বেগম জিয়া সুস্থ হোন-হৃদস্পন্দনে ফিরুক বাংলাদেশ। বেগম জিয়াকে নিয়ে একটি দীর্ঘ মন্তব্য ফেসবুকে শেয়ার করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, মামলার রায় হওয়ার আগে খালেদা জিয়া একবার বিদেশ সফরে গেলেন। হাসিনা আর ওবায়দুল কাদের বলে বেড়াতে লাগলেন, খালেদা জিয়া আর আসবেন না। এতিমের টাকা মেরে খেয়ে পালিয়েছে। খালেদা জিয়া চিকিৎসা করে ফিরে আসলেন। কোর্টে বললেন, আমি এতিমের টাকা চুরি করব? আমি? কোর্ট জেল দিয়ে দিল। সারা দুনিয়ার মানুষ জানত, কেসটা ভুয়া। খালেদা যদি বিদেশ থেকে না আসতেন হাসিনার অন্যায় বিচার এড়ানোর জন্য, আমরা উনাকে দোষ দিতাম না। কেউই দিত না। কিন্তু খালেদা এসেছিলেন। জেলেও ঢুকেছিলেন। দেশের মানুষকে হাসিনার জেলে রেখে নিজে বিদেশ ট্যুরে রাজি হননি। খালেদা জানতেন, এটা জেল না। এটা কবর। এখানে ঢুকলে আর বের হতে না পারার সম্ভাবনাই বেশি। জেনেও কবরে ঢুকেছিলেন। যেখানে তাকে ভালো খেতে দেওয়া হয়নি, চিকিৎসার সুযোগ চাইলে হাসিনা বলেছিলেন, অনেক বছর ই তো বাঁচল, আর কত? খালেদা জিয়া হাসিনার জেলে ছিলেন। বেগম খালেদার আর পাওয়ার কী ই বা বাকি ছিল? তবুও জেলে গিয়েছিলেন, জানতেন, হাসিনার সাথে পারবেন না। তবুও তিনি বিদেশ না গিয়ে দেশের মানুষের সাথে কষ্ট ভাগ করে নিয়েছিলেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনীম জারা নিজের ফেসবুক পেজে লিখেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। রাজনীতি, দল-মত, মতাদর্শ, সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর জন্য সবার দোয়া কামনা করি। এক সপ্তাহ আগে এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে খুব অল্প সময়ের দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, 'দেশে থাকো, দেশের জন্য কাজ করো।' অসংখ্য মানুষ একই উপদেশ দেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া যখন এই কথা বলেন তার গভীরতা, ইতিহাস, আর সত্যতা অন্যরকম। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও তিনি দেশ ও দেশের মানুষের পাশ থেকে সরে দাঁড়াননি। বেদনা, অপমান ও সীমাহীন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান এবং বিশ্বাস থেকে আপস করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য অনুকরণীয়। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে রহমত, আরোগ্য ও শান্তি দান করেন। উল্লেখ্য, গত ২৩শে নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। সর্বশেষ গত ১৫ই অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসিনার আমলে ২০১৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি থেকে টানা দুই বছর কারাগারে থাকাকালে নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। এরপর মুক্তি দিলেও তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দেয়া হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর গত ৮ই জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান খালেদা জিয়া। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫শে জানুয়ারি খালেদা জিয়া তার ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডনের ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ই মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ মানুষ তার প্রতি যেভাবে ভালোবাসা দেখাচ্ছে, তা অনেকের মনে অস্বস্তি তৈরি করা অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ক্ষমতার আসনে বসা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে বসা যায় না। রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু মানুষের শ্রদ্ধা জোর করে আদায় করা যায় না। ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে চুপ করানো যায়, কিন্তু মানুষের প্রার্থনা থামানো যায় না। আজ লক্ষ মানুষের চোখে যে অশ্রু, মুখে যে দোয়া, হৃদয়ে যে উদ্বেগ, তা প্রমাণ করে বেগম খালেদা জিয়ার প্রকৃত শক্তি তার পদ নয়, তার জনপ্রিয়তা নয়, বরং মানুষের অটুট বিশ্বাস। এটাই তার সবচেয়ে বড় বিজয়। এই ভালোবাসা কোনও প্রচারণা নয়, কোনও দলের আয়োজন নয়, কোনও হিসাবি সমাবেশ নয়, এটি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা। এটাই তার সবচেয়ে বড় অর্জন, এটাই তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্মানচিহ্ন। আর এটাই প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় ব্যথা। কারণ তারা জানে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অনন্ত। ইতিহাস আমাদের বারবার বলে, ক্ষমতা টেকে না, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা টেকে না, দমন-নিপীড়ন টেকে না। কিন্তু ভালোবাসা টিকে থাকে। বিশ্বাস টিকে থাকে। জনগণের শ্রদ্ধা টিকে থাকে। আজ বেগম খালেদা জিয়া সেই স্থায়ী শ্রদ্ধার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ। দেশের মানুষ আজ দল ভুলে গেছে, মত ভুলে গেছে, বিরোধ ভুলে গেছে। শুধু একটি প্রার্থনা উচ্চারিত হচ্ছে, সকাল-বিকাল-রাত- দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ হোন। তিনি ফিরে আসুন আমাদের মাঝে। তিনি বেঁচে থাকুন বাংলাদেশের ইতিহাসের অমর অধ্যায় হিসেবে। এই প্রার্থনা রাজনীতি নয়, এটি একটি জাতির হৃদয় থেকে জন্ম নেয়া সম্মান, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার নির্মল আকুতি। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |