|
প্রাণীদের প্রতি নির্মমতা : আইন কি বলে?
রেহানা ফেরদৌসী:
|
![]() প্রাণীদের প্রতি নির্মমতা : আইন কি বলে? এর আগে, গত বছরের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে আবাসিক এলাকা জাপান গার্ডেন সিটিতে পথকুকুর বা বিড়ালকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। ওই সময় অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ১০টি কুকুর ও বিড়ালের মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাঠে নামে প্রাণী অধিকার কর্মীরা। এরও আগে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে চট্টগ্রামে বিষ প্রয়োগ করে শত শত কুকুরকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল। ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—মালিকবিহীন এসব পথকুকুর বা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা আঘাত করলে আদৌ শাস্তির বিধান আছে কি না? পথকুকুরের নিরাপত্তা বা আইনি প্রতিকার সাধারণ ব্যক্তি নিজে চাইতে পারবে কি না? নাকি পুলিশই নিজে থেকে ব্যবস্থা নিতে পারবে? কে নেবে আইনি পদক্ষেপ? গত ৪ নভেম্বর বগুড়ার দত্তবাড়িয়ার গুচ্ছ গ্রামে একটি বিড়ালকে জবাই করে হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন আদমদীঘি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে। জিডিতে ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি একটি সাদা-কালো রঙের পুরুষ বিড়ালকে তার নিজ বাড়িতে বটি দিয়ে গলা সম্পূর্ণ কেটে এবং বুক চিরে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে হত্যা করে পাশের ধানক্ষেতে ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনা স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে সংগঠনটি জেনেছে বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, পথবিড়াল বা কুকুর হত্যার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি সরাসরি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন কি না। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রাণী আইন খুবই দুর্বল এবং পথপ্রাণী হত্যা কার্যত ধর্তব্যের বাইরে অপরাধ হিসেবে থেকে যাচ্ছে। এই ঘটনায় দ্রুত কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে—এমন সুস্পষ্ট বিধানও নেই। আইন কী বলছে? বাংলাদেশে প্রাণী নির্যাতন সম্পর্কিত প্রায় একশ বছরের পুরোনো ১৯২০ সালের ‘দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট’ বাতিল করে ২০১৯ সালে প্রাণী কল্যাণ আইন প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ প্রাণী কল্যাণ আইন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত মামলা গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ চাইলেই যে কোনো ব্যক্তি এই ধরনের অপরাধের জন্য আইনি প্রতিকার বা মামলা করতে পারবেন না। কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ব্যতীত কোনো আদালত এই আইনের অধীনকৃত কোনো অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবে না। পাশাপাশি অধিদপ্তরের লোক ছাড়া কেউ মামলা করতে পারবেন না। মূলত প্রাণী কল্যাণ আইনের বাধা এখানেই। এ কারণেই গত বছরের মোহাম্মদপুরে জাপান গার্ডেন সিটির ঘটনায় এই আইনানুযায়ী মামলা করা যায়নি। তখন ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের আওতায় মামলা করা হয়েছিল। এই আইনের ৪২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি প্রাণী হত্যা করে বা ক্ষতি করে এবং যে কোনো প্রাণীর মূল্য যদি ৫০ টাকা বা তার বেশি হয়, তাহলে ওই ব্যক্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। আবার প্রশ্ন হলো—একটি রাস্তার কুকুর বা বিড়ালের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ হবে? সেটি তো কারো মালিকানাধীন গবাদিপশু নয়। সেক্ষেত্রে এই ধারাও প্রমাণ করা কষ্টকর। ফলে এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের প্রাণী কল্যাণ আইন থাকলেও তা প্রয়োগে জটিলতা রয়েছে। কেননা সেখানে বলা হয়েছে, মালিকবিহীন প্রাণী হত্যা করা যাবে না—কিন্তু এর প্রয়োগ অধিদপ্তরের হাতে, সাধারণ নাগরিকের হাতে নয়। ২০১৪ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে কুকুর নিধন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। ঢাকার সিটি কর্পোরেশন ২০১৪ সালেই কুকুর নিধন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। পরে ২০১৯ সালের নতুন প্রাণী কল্যাণ আইনে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না বলে বিধান রাখা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা, মারধর করা বা আঘাত করা একটি অপরাধ, যার জন্য প্রথমবার অপরাধ করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দণ্ডবিধির ৪২৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রাণীর মূল্য ৫০ টাকা বা তার বেশি হলে এবং তাকে হত্যা বা ক্ষতি করা হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া কেউ কোনো প্রাণীকে এমনভাবে আটকে রাখা বা তা থেকে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। অন্যান্য বিধান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্যপ্রাণী হত্যার জন্য এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে। পোষা পাখি লালন-পালন, কেনা-বেচা, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে লাইসেন্স না নিলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। প্রাণী হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি কী? প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করা ও সদয় আচরণ প্রদর্শনের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের প্রাণী কল্যাণ আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ অ-আমলযোগ্য এবং জামিনযোগ্য। পোষ্য এবং মালিকবিহীন—এই দুই ক্যাটাগরিতে প্রাণীকে ভাগ করা হয়েছে। এই আইনে উল্লেখিত কোনো কারণ ব্যতীত মালিকবিহীন কোনো প্রাণীকে নিধন বা অপসারণ করা যাবে না। মালিকবিহীন কোনো প্রাণী, অর্থাৎ যেসব কুকুর বা বিড়াল পোষা নয়—এমন পথকুকুর বা বিড়ালকে কেউ যদি হত্যা করে, তবে সেটি অপরাধ এবং এর শাস্তির বিধানও রয়েছে। প্রাণীর প্রতি যেসব আচরণ নিষ্ঠুর হিসেবে বিবেচিত হবে, তা হলো অঙ্গহানি করা এবং বিষ প্রয়োগে প্রাণী হত্যা। তবে যদি কোনো প্রাণী সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকে বা অনিরাময়যোগ্য অসুস্থ হলে তাকে বাঁচিয়ে রাখা নিষ্ঠুরতা বলে মনে হলে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতিক্রমে ব্যথাহীন মৃত্যু ঘটানো যাবে। এ ছাড়া পোষ্য বা পথকুকুর কিংবা বিড়ালকে হত্যা, নির্যাতন বা তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করার সুযোগ আইনে নেই। এই আইনের অধীনে প্রাণীর প্রতি যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বিচার করতে পারবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্টও। অর্থাৎ, বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রাণী কল্যাণ আইন অনুযায়ী প্রাণী হত্যার সর্বোচ্চ সাজা দুই বছর। ছোট ছোট সহিংসতাই সমাজের বড় বড় সহিংসতার জন্ম দেয়। আমাদের সমাজে সহিংসতা আজ একটি নিত্যঘটনা। কিছু ক্ষেত্রে এ সহিংসতা হত্যা পর্যন্ত গড়ায়। দুর্বলের ওপর দিয়েই সহিংসতা শুরু হয়। আর এ পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বল হলো প্রকৃতি, পশু, মানবশিশু, বৃদ্ধ, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ, প্রতিবন্ধী এবং পশু-পাখি। এদেরকেই সবচেয়ে বেশি সহিংসতা সহ্য করতে হয়। এদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং মানবিক আচরণ দেখানো আমাদের সবার দায়িত্ব। লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)। ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |