ট্রলিংয়ে নিঃশেষের পথে বঙ্গোপসাগর
নাদিম মোর্শেদ:
প্রকাশ: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১২:১৫ পিএম আপডেট: ০৬.১২.২০২৫ ১২:১৭ পিএম

ট্রলিংয়ে নিঃশেষের পথে বঙ্গোপসাগর

ট্রলিংয়ে নিঃশেষের পথে বঙ্গোপসাগর

বাংলাদেশের অর্থনীতির নীল প্রাণশক্তি—বঙ্গোপসাগর—আজ নীরব মৃত্যুর মুখে। দেশীয় ও বৈশ্বিকভাবে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি হিসেবে খ্যাত এই সমুদ্র আমাদের প্রজন্মের সম্পদ এবং আগামী প্রজন্মের নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা দেখাচ্ছে, আমরা যদি সময় মতো পদক্ষেপ না নিই, আগামী দুই দশকের মধ্যে বঙ্গোপসাগর হতে পারে কেবল লোনা পানির মৃত আধার।

গত ৫ নভেম্বর থেকে বাগেরহাটের কেবি ঘাট, পিরোজপুরের পাড়ের হাট এবং পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর—দেশের প্রধান চারটি মৎস্য ল্যান্ডিং সাইট—সরেজমিন পরিদর্শন এবং স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। উপকূলীয় এই জনমানুষের মধ্যে ৯১ শতাংশ জেলে, ৮৯ শতাংশ মাঝি, ৮৭ শতাংশ ট্রলার মালিক এবং ৬৫ শতাংশ আড়তদার স্বীকার করেছেন যে, ২০০০ সালের তুলনায় বর্তমানে মাছের প্রাচুর্য মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। একসময় সাগরের বুকে ডলফিনের খেলা, কুয়াকাটা বা কচ্ছপের ডিম পাড়ার দৃশ্য ছিল নিত্যনৈমিত্তিক; আজ তা শুধুই অতীতের স্মৃতি। হাঙর, করাত মাছ, শাপলাপাতা, হাতুড়ি মাছের মতো প্রজাতিগুলো প্রায় বিলুপ্ত, সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান বিপর্যস্ত।

মুখ্য কারণ: বটম ট্রলিং। এটি এমন একটি মাছ আহরণের পদ্ধতি, যেখানে ট্রলার বা বোটের তলায় ভারী রোলার যুক্ত জাল চষে তলদেশের সবকিছু ধ্বংস করে। আধুনিক স্টিল বডি ট্রলার এবং স্থানীয় কাঠের ট্রলার—দুই প্রকারই বিপুল ক্ষতি করছে। স্টিল বডি ট্রলারগুলো মূলত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক, প্রভাবশালী বিত্তবানদের মালিকানাধীন। এদের জাল অত্যন্ত ছোট ফাঁসের এবং তলায় প্রায় ৭০-৮০ মণ ওজনের লোহা লাগানো থাকে। জাহাজ যখন চলে, তখন এই ভারী লোহা সাগরের তলদেশ চষে মাছের আবাসস্থল, প্রবাল এবং জলজ উদ্ভিদসহ সবকিছু ধ্বংস করে।

জেলেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ট্রলিংয়ের ফলে বিক্রয় অযোগ্য ছোট মাছ এবং মৃত জলজ প্রাণী সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সাগরে মৃত ছোট মাছের স্তূপ ২ থেকে ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ভেসে থাকে, যার দুর্গন্ধে অন্য জেলেদের মাছ ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। শামুক, ঝিনুক, শঙ্খ, কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক সাপসহ হাজারো প্রাণী নির্বিচারে হত্যা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় যে লক্ষ লক্ষ পোনা মাছ নষ্ট হচ্ছে, তা জীবিত থাকলে সামুদ্রিক মৎস্য ভাণ্ডার কত সমৃদ্ধ হতে পারত, তা সহজেই অনুমেয়।

অবস্থা আরও জটিল কারণ সরকার স্টিল বডি ট্রলিংকে বৈধতা দিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তর ও কোস্ট গার্ড স্বীকার করেছেন, বৈধ রেজিস্ট্রেশন থাকার কারণে এই ট্রলারগুলোকে আটকানো কঠিন। অন্যদিকে, প্রান্তিক জেলেদের তৈরি কাঠের ট্রলারও ক্ষুদ্র পরিসরে সাগরের ক্ষতি করছে। কিন্তু প্রশাসন এই বোটগুলো ভেঙে দেয়, জেলেদের গ্রেপ্তার করে। একই অপরাধে দুই বিচার, রাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতি প্রকাশ করছে।

জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিকভাবেও ক্ষতি হচ্ছে। ২০০০ সালে যেখানে সামুদ্রিক জেলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬.৫ লক্ষ, সেখানে জনসংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু ‘ক্যাচ পার ইউনিট ইফোর্ট’ (CPUE) বা মাছ আহরণের দক্ষতা ক্রমহ্রাস পাচ্ছে। অর্থাৎ অধিক সংখ্যক জেলে কম মাছ ধরছে। স্থানীয় জেলেদের মতে, মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় পরিবার, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকার ওপর প্রভাব পড়েছে। ছোট জেলেদের আয় সংকুচিত, ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সামাজিক ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

ট্রলিংয়ের ফলে পরিবেশগত ক্ষতিও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রবাল, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, কচ্ছপের ডিম ও ছোট মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের এই অপূরণীয় ক্ষতি সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলকে বিপর্যস্ত করছে। একসময় যেখানে বিভিন্ন মাছের প্রজাতি সমন্বিত একটি স্বাস্থ্যকর বাস্তুসংস্থান ছিল, আজ তা ধ্বংস হয়ে একধরনের মরুভূমিতে রূপ নিচ্ছে।

সারাদেশের উপকূলীয় এলাকায় নীতিমালার অসারতা এবং প্রশাসনিক ত্রুটি মিলিত হয়ে সামুদ্রিক ধ্বংসযজ্ঞকে আরও প্রকট করছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, স্থায়ীভাবে মাছ আহরণের জন্য সরকারি নীতি, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগত তদারকি অপরিহার্য। আমাদের দেশে এই সমন্বয় নেই। স্টিল বডি ট্রলার বৈধ, কিন্তু প্রান্তিক জেলেরা দমন-নিপীড়নের শিকার। এই দ্বিমুখী নীতি যদি চলতে থাকে, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিঃশেষ হয়ে যাবে।

এই সংকট মোকাবেলায় কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ অপরিহার্য:

স্টিল ও কাঠ—উভয় প্রকার ট্রলিং নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ। কোনো প্রভাবশালী বা বিত্তবানকে ছাড় দেওয়া চলবে না।

উপকূলীয় জেলেদের জন্য স্থায়ী ও নিরাপদ মাছ আহরণের সুযোগ নিশ্চিত করা। ট্রলার রেজিস্ট্রেশন ও আইন প্রয়োগ সমন্বিত করতে হবে।

জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—প্রবাল, কচ্ছপের ডিম পাড়ার এলাকা, ছোট মাছের আবাসস্থল—সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করা।

সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে স্থানীয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। জেলেদের সংগঠন, সমন্বয় ও শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই মৎস্য আহরণ নিশ্চিত করা।

বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন। CPUE, প্রজাতি সমীক্ষা, ট্রলিং প্রভাব—all-inclusive নীতি তৈরি করা।

সাগরকে বাঁচানো মানে শুধু মাছ সংরক্ষণ নয়, এটি সামুদ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা, স্থানীয় অর্থনীতি ও প্রজন্মগত অধিকার রক্ষা। রাষ্ট্রকে অবশ্যই প্রভাবশালীদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আগামী ২০ বছর পর যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, বঙ্গোপসাগর কেবল লোনা পানির মৃত আধার হয়ে থাকবে।

সাগরের অধিকার কেবল লুটেরাদের নয়; এটি আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণীয় সম্পদ। বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে, মৎস্য আহরণে বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক নীতি প্রবর্তন করতে আজই সময়।

লেখক: সহকারী গবেষক (জিএসপি) ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

ডেল্টা টাইমস/নাদিম মোর্শেদ/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]