|
মাটির ঘ্রাণে গ্লোবাল বাজার: বাংলাদেশের মসলা শিল্পের অগ্রযাত্রা
প্রজ্ঞা দাস:
|
![]() মাটির ঘ্রাণে গ্লোবাল বাজার: বাংলাদেশের মসলা শিল্পের অগ্রযাত্রা মশলার প্রমাণ প্রায় সাত হাজার বছর আগে আরব, গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এটি ভারত উপমহাদেশে এসে ব্যবসার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মশলা বিভিন্ন সভ্যতা ও অঞ্চলের রান্নাবান্না, খাদ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় আচার, মৃতদেহ সৎকার, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও রূপচর্চায় ব্যবহৃত হতে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে মসলা শিল্পকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কঠোরতা, প্রতিযোগিতার তীব্রতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও আজ বাংলাদেশের মসলা শিল্প বিশ্ববাজারে তার স্থান ধরে রেখেছে। হলুদ, মরিচ, আদা, দারচিনি, এলাচ, জিরা—এসব মশলা শুধু স্থানীয় রান্নায় অপরিহার্য নয়, বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশকে একটি স্বীকৃত নাম এবং গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি আয়ের উৎস প্রদান করছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল মসলার জন্য বিখ্যাত হলেও স্বাধীনতার পর শিল্পটি কিছু ক্রান্তিলগ্ন পার করতে হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে মসলা উৎপাদন ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে কৃষি বিপ্লবের সঙ্গে মসলা উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, কিন্তু গ্লোবালাইজেশনের যুগে এটি বারবার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আজ বাংলাদেশে ৩০টিরও বেশি মসলা জাত উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে হলুদ, মরিচ, আদা ও দারচিনি প্রধান। দেশের মোট মসলা বাজারের মূল্য অতিক্রম করেছে ৫,০০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্যাকেজড মসলার অংশ ১,৫০০ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩ সালে দেশ থেকে মশলার রপ্তানি হয়েছে ৩৫.১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের, যা বিশ্বের ১৯৮টি দেশের মধ্যে ২৫তম স্থান দখল করেছে। যদিও ২০২৪ সালে রপ্তানি কিছুটা কমেছে, ২০২৫-এর শেষের দিকে আয় আগের তুলনায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে হলুদ ও লাল শুকনো মরিচের ক্ষেত্রে। প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য। তবে শিল্পটির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ এখনো বহাল—বহিঃরাজনৈতিক অস্থিরতা, যাতায়াতের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের ওঠানামা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারা। সবচেয়ে বড় শত্রু অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তন। অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ফসল নষ্ট হয় বা কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এছাড়া এখনও অনেক কৃষক প্রাচীন প্রথা অনুসারে মশলা উৎপাদন করেন এবং জ্ঞানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মসলার গুণমান অক্ষুণ্ণ রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মশলার আন্তর্জাতিক বাজার কোটি কোটি ডলারের, যেখানে ক্রেতারা অরিজিনালিটি, অঠেনটিক ফ্লেভার এবং পিওরিটি প্রত্যাশা করে। লাল মরিচের রঙ, আদার ঝাঁঝ, হলুদের সুবাস—এগুলোতে মিশে রয়েছে দেশি মাটির শক্তি। তবে এসব স্বাদ বিদেশে পাঠাতে হলে প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি বাজারে কাঁচা আদা বা মরিচের চাহিদা নেই। তারা চায় শুকানো, গ্রেডিং করা, প্যাকেটবন্দি এবং সার্টিফাইড পণ্য। কিন্তু দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখনও খুবই সীমিত। আধুনিক ড্রাইং ইয়ার্ড, হাইটেক গ্রেডিং ল্যাব, প্যাকেজিং ইউনিট এবং সঠিক রপ্তানি সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অর্জন কঠিন। যদি বাংলাদেশ মসলা শিল্পকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিত, দেশের অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লব ঘটত। রপ্তানি বৃদ্ধি পেত, বৈদেশিক মুদ্রা আসত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। এছাড়াও গ্রামবাংলায় নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা, হাজারো ছোট কারখানা, শহরের ওপর নির্ভরতা কমানো, কৃষি ও কৃষকের টেকসই ভবিষ্যত—এসব সম্ভব হতো। প্রয়োজন শুধু সাহসী সিদ্ধান্ত, ধৈর্যশীল পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল উদ্যোগ। তবেই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ প্রশস্ত হবে, অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হবে, বেকারত্ব কমবে এবং মসলার সুগন্ধে সারা বিশ্ব চিনবে বাংলাদেশকে। লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ। ডেল্টা টাইমস/প্রজ্ঞা দাস/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |