বেগম জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমান
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:০০ এএম

বেগম জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমান

বেগম জিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারেক রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি নক্ষত্রসম অধ্যায়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশপন্থী অনুপম রাজনৈতিক দর্শনের আদর্শ প্রণেতা। প্রাসঙ্গিক কারণেই সেই দর্শনের নাম: বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে মূলত বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি বললেও অত্যুক্তি হয় না। এই আদর্শকে ভিত্তি করেই জন্ম নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ ও সবশেষে দেশের জন্য প্রাণোৎসর্গের মধ্যেই তার বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির উজ্জ্বল উপমা খুঁজে পাওয়া যায়। জিয়াউর রহমানের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্র তথা দেশ। ব্যক্তি, দল কিংবা ক্ষমতা, কোনোটাই তার কাছে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে ছিল না। স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক একদলীয়তার বিপরীতে তিনি যে দর্শন হাজির করেন, তা ছিল বাস্তববাদী ও কার্যকর। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ধারণার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশের মানুষ কেবল ভাষাগত পরিচয়ে আবদ্ধ নয়; তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভৌগোলিক বাস্তবতা মিলিয়েই জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে। এই ধারণা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক একচোখা জাতীয়তাবাদের বিপরীতে দুর্দমনীয় সাহসী অবস্থান। একই সঙ্গে জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন, ব্যক্তি খাত ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে উৎসাহ দেন এবং পররাষ্ট্রনীতিতে আত্মমর্যাদাশীল ভারসাম্য বজায় রাখেন। আধিপত্যবাদী কোনো দেশকে তিনি তোয়াক্কা করতেন না। দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি ছিলেন অপসহীন। তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য স্ত্রী খালেদা জিয়াও একই আদর্শ লালন করেছেন।জান দেবেন কিন্তু দেশের মান দেবেন না।আধিপত্যবাদীদের চোখে চোখ রেখে পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা করে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে প্রদক্ষ রাজনীতি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার।

একজন নন্দিত অভিসংবাদিত ও কিংবদন্তি বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মুহূর্তেই আমরা পা রাখছি নতুন বছরে। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে বেগম জিয়ার আপসহীনতার যে সমুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি সেই আলোয় আলোকিত হব নাকি অন্ধকারেই থেকে যাব? এমন প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব-জাতি হিসেবে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে যে আমরা কোথা থেকে এলাম, কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আর কোথায় যেতে চাই। বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন বছরের সূচনালগ্নে এই আত্মসমীক্ষা তাই কেবল শোকের নয় বরঞ্চ খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঐক্য। প্রতিশোধ নয়-ভালোবাসা; বিভেদ নয়-সহাবস্থান; সহিংসতা নয়-শান্তিপূর্ণ রাজনীতির আহ্বান। তার কণ্ঠে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র কোনো স্লোগান ছিল না। ছিল লড়াইয়ের সুদৃঢ় নৈতিক ভিত্তি।এই আপসহীনতার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন,আবার সেই আপসহীনতার জন্যই তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন। রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও, বিরোধী রাজনীতির কঠিন দিনগুলোতে তিনি যে অকুতোভয় সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার তুলনা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। একজন নেত্রীর ত্যাগের পরিমাপ কেবল সাফল্যে নয় বরং তার রেখে যাওয়া মূল্যবোধে ফুটে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়া বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে রাষ্ট্র টিকে থাকে নাগরিকের সম্মতিতে, আর গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় সহিষ্ণুতায়। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ-তার এই বিশ্বাস রাজনীতিকে আলাদা করেছে। মৃত্যুর পরও প্রতীকী অর্থে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নেতৃত্ব মানে কেবল পদ নয়; নেতৃত্ব মানে মানুষের আস্থা।এই প্রেক্ষাপটে নতুন বছরের সূচনায় আরেকটি অধ্যায় আমাদের সামনে এসেছে। 

প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান যে ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন, তা নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য নয়-এটি একটি ধারাবাহিকতার ঘোষণা। পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মাতা বেগম খালেদা জিয়ার শান্তি, সৌহার্দ্য ও অন্তর্ভুক্তির রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করার অঙ্গীকার এতে স্পষ্ট। তার বক্তব্যে বিভাজনের ভাষা নয়; ছিল সমাধানের ইঙ্গিত।তারেক রহমানের প্রণীত ৩১ দফা কর্মসূচির ধারণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।জাতি,ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের এই ভাবনা কেবল নৈতিক উচ্চারণ নয়; এটি রাষ্ট্রগঠনের একটি বাস্তব কাঠামোর দাবি। বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিয়ে ঐক্য নির্মাণ-এই দর্শনই আধুনিক রাষ্ট্রের শক্তি। তার বিভিন্ন বক্তব্যে যে আশার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। তা আমাদের বিভেদ মুক্ত ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য ঘটনাবহু এবং বেদনাময় একটি বছর। আমরা হারিয়েছি বেগম খালেদা জিয়ার মতো একজন গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে। একই বছরে হারিয়েছি জুলাই যোদ্ধা, সময়ের সাহসী কণ্ঠ, আধিপত্যবাদবিরোধী সোচ্চার নেতা ওসমান হাদিকে। যিনি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে ভোগবাদ ও তোষামোদমুক্ত, দুর্নীতি-চাঁদাবাজিবিরোধী রাজনীতির কথা বলেছিলেন। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন; রাষ্ট্রের গভীর ক্ষত সারিয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিলেন। এসব ক্ষতি জাতিকে শোকাহত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও তুলেছে-আমরা কোন পথে হাঁটছি?গত ৫৪ বছরে এ দেশের মানুষ বহু স্বপ্ন দেখেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির জালে সেই স্বপ্নগুলো বারবার থমকে গেছে। 

২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্স, ভাঙচুর, অবরোধ, অগ্নিসংযোগ-এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সমাজকে অস্থির করেছে। রাজনীতির নামে নৈরাজ্য রাষ্ট্রের বিশ্বাস যোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিরাপদ করেছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে আইনের শাসন, নৈতিক রাজনীতি ও সামাজিক ঐক্য। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিসরে যে শালীনতার ইঙ্গিত মিলেছে,তা আমাদের আশান্বিত করছে। পতিত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না।অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকা থেকে ভারত, জাতিসংঘ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেগম জিয়ার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তার নেতৃত্ব কেবল জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও গুরুত্ব বহন করে।দেশপ্রেম, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীনতা বিশ্বরাজনীতিতে সম্মান পায়-এ সত্য আবারও প্রমানিত হলো। সুতরাং আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বেগম খালেদা জিয়ার অনুসৃত নীতিকে  আমরা কীভাবে কাজে লাগাব? রাজনৈতিক বিভাজন গুছিয়ে যদি উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়-তবে ২০২৬ সাল সত্যিই নতুন যাত্রার সূচনা হতে পারে। তবে এর জন্য দরকার দুর্নীতিমুক্ত ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাজনীতি। দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিকের নিরাপদ জীবন এসবকিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশাসন। পুরোনো ভোগবাদী ও তোষামোদ নির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে জ্ঞানভিত্তিক, কল্যাণকর রাজনীতির সূচনা করতে হবে।যদিও এই রূপান্তর মোটেও সহজ নয়। তবে তা অসম্ভবও নয়। 

কোন জাতি যখন  সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন যেকোনো অসম্ভবও সম্ভব হয়। এখানেই খালেদা জিয়ার জীবনের শিক্ষা আমরা কাজে লাগাতে পারি। বেগম খালেদা জিয়া আমাদের শিখিয়েছেন যে নেতৃত্ব মানে সাহস; রাজনীতি মানে নৈতিকতা; রাষ্ট্র মানে নাগরিকের সম্মান। তার প্রয়াণ বস্তুতপক্ষে আমাদের সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের। আমরা কি সেই পুরোনো বিভেদের পুনরাবৃত্তি করব নাকি নতুন ঐক্যের সূচনা করব। সুতরাং রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে সিদ্ধান্তটা আমাদেরকেই নিতে হবে। শোককে যদি আমরা শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, বিভাজনকে যদি ঐক্যে পরিণত করতে পারি। তবে খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একটি বিদায় নয় বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা হবে। বেগম জিয়ার ভাবনার সাথে তারেক রহমানের নতুন ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় ঐক্য। তিনি বারবার ব্যক্ত করছেন যে, বিভাজনের রাজনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই সব মত ও পথের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনই তার মূল লক্ষ্য। মায়ের অভাব পূরণ হওয়ার নয়; কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা এবং তাদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বই এখন তার জীবনের প্রধান ব্রত। তার লক্ষ্য- এমন এক বাংলাদেশ গড়া যেখানে বিচারহীনতা নয়, বরং ন্যায়বিচার হবে শেষ কথা। বর্তমানে তারেক রহমানের কাছে দল এবং দেশ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দলই পারে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র উপহার দিতে। নিশ্চয়ই তারেক রহমান দলকে এমনভাবে গড়ে তুলবেন যাতে তৃণমূলের ভূমিকা প্রাধান্য পাবে। যেটি তিনি দেড়যুগ আগে শুরু করেছিলেন। একই সঙ্গে চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবে তরুণদের যে ভূমিকা ছিল, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে আগামীর নেতৃত্বে মেধাবী ও সৎ তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ পরিচালনায় নজির তৈরি করবেন তারেক রহমান।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]