|
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদিও এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছে অর্থনৈতিক ধসের কারণে, কিন্তু খুব দ্রুতই এটি রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে এক বিশাল চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপট, সামাজিক সহনশীলতার অভাব,শাসক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা-সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠছে। তেহরানের আকাশে এখন কেবল বারুদের গন্ধ নয় বরং অজানা আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত কয়েক বছরে একের পর এক বন্ধু হারিয়ে এখন প্রায় নিঃসঙ্গ। এক বছর আগে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা দিয়েই এই পতনের শুরু বলে দাবি করা হয়েছে দ্য আটলান্টিকের এক নিবন্ধে। এই নিবন্ধে বলা হয়েছে, এরপর ইসরায়েলি হামলায় একে একে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে ইরানের গর্ব অক্ষশক্তি। লেবাননের হিজবুল্লাহকে কার্যত নিরস্ত্রীকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খামেনির জন্য সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে সুদূর ভেনেজুয়েলা থেকে। দীর্ঘদিনের মিত্র নিকোলাস মাদুরো যখন সিক্সথ অ্যাভিনিউয়ের কোনো আদালতকক্ষে বন্দি হিসেবে হাজির হন, তখন তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে কম্পন সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও এখন আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে। একদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে রাস্তায় সাধারণ মানুষের তীব্র বিক্ষোভ; সবমিলিয়ে খামেনির শাসনের ভিত নড়বড়ে বলে দাবি করছে পশ্চিমারা। যদিও তেহরান বলছে, শত্রুর চাপে তারা মাথা নত করবে না। সবধরনের হুমকি মোকাবেলায় ইরান পুরোদস্তুর প্রস্তুত। গত বছর ইসরায়েল ও আমেরিকার সাথে ইরানের ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরান নিজেদের জয়ী দাবি করেছিলো, তবে পশ্চিমা অক্ষের দাবি সম্পূর্ণ তার বিপরীত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অপারেশনকে সফল দাবি করে গত বছরের ইরান হামলার সাথে তুলনা করে যে হুঙ্কার দিয়েছে, তাতে ইরানের কপালে চিন্তার ভাঁজ না পড়ে উপায় নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্বরাজনীতির মোড়ল হিসেবে পরিচিত রাশিয়া ও চীন এই পুরো সংকটে কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই নির্লিপ্ততা ইরানকে এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইরানের কট্টরপন্থীরা এখন মনে করছেন, টিকে থাকতে হলে কেবল সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে।অন্যদিকে, ইরানের পশ্চিমপন্থি কথিত উদারপন্থীরা আওয়াজ তুলছেন ভিন্ন এক দাবিতে। তারা বলছেন, সরকারের বৈধতা আসতে হবে জনগণের কাছ থেকে। তাদের দাবি, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের ঘটনা ইরানের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খামেনিবিরোধী ইরানিদের হাস্যরসেও ফুটে উঠছে ক্ষোভ। অনেকেই বলছেন, জনগণের ভোটে ক্ষমতা না ছাড়লে শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তির হাতেই এই শাসনের অবসান ঘটবে। তবে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই আলোচনায় এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম নির্বাসিত প্রিন্স রেজা পাহলভি। তিনি নিজেকে ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। রাজপথের বিক্ষোভে তার সমর্থনে স্লোগানও শোনা যাচ্ছে। যদিও পাহলভি সরাসরি সামরিক হামলার পক্ষপাতী নন, তবে তার সমর্থক এবং ঘনিষ্ঠজনরা মার্কিন ও ইসরায়েলি তৎপরতাকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমেরিকা কি আসলেই পাহলভিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়? ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সেখানে ক্ষমতা বিরোধী দলের কাছে নয় বরং মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। এমনকি ভয়েস অব আমেরিকার ফার্সি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে ইরানের বর্তমান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। ফলে বিকল্প কোনো শক্তির খোঁজ সম্ভবত ইরানের ভেতরেই চলছে। ইরানের বর্তমান প্রশাসন দাবি করছে, এই বিক্ষোভের পরিপূর্ণ উস্কানি আসছে বিদেশ থেকে। তেহরান এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গভীর ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখছে। বিপরীতে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করা ট্রাম্প খামেনির জন্য বড় হুমকি বলেই মানছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা।পশ্চিমাদের চোখে ইরানের শাসনব্যবস্থা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ইসরায়েলি গোয়েন্দা মহলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো গভীরভাবে পড়লে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। ইরানের অভ্যন্তরে এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার এখনই পতনের দিকেও যাচ্ছে না। এই মাঝামাঝি অবস্থা তেহরানকে একটি নিরাপত্তা ধূসর অঞ্চলে নিয়ে পরিণত করেছে। এর ফলে ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একধরনের হিসাবি দ্বিধা তৈরি হয়েছে। সেই দ্বিধাই ইরানের জন্য পরিণত হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদে। সেই সম্পদ হলো সময়।ইরানের রাজপথের অস্থিরতা কেন শাসকের সময়কেন্দ্রিক রাজনীতির পক্ষে কাজ করছে, তা বুঝতে হলে তেল আবিবের দৃষ্টিকোণ থেকে হুমকির যুক্তি নতুন করে পড়তে হবে। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ২০২৫ সালে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, ইরান যেন আগের অবস্থায় ফিরে যেতে না পারে। বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি, কারণ এতে ইরান চুক্তিহীন অবস্থার ছায়া এবং কম নজরদারির সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে। প্রচলিত সামরিক যুক্তি অনুযায়ী, এমন হুমকির জবাব হওয়া উচিত আগাম হামলা অথবা অন্তত সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ, যাতে প্রতিপক্ষ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। শাসন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে ইনস্টিটিউটটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে ইরানের শাসনব্যবস্থার বৈধতা কমে গেলেও ক্ষমতাকাঠামো এখনো অটুট রয়েছে। ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, তেহরানের রাজপথের বাস্তবতা বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। প্রখ্যাত সামরিক বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, অসন্তোষ থাকলেও এসব বিক্ষোভের এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব নেই এবং তাৎক্ষণিক ভাবে সরকার উৎখাত করার সক্ষমতাও তৈরি হয়নি। আট বছর ব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বড় ধরনের বিদেশি হামলা জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে পারে। দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট সতর্ক করে বলেছে, একটি সামরিক হামলা বিক্ষোভের গতিপথ উল্টে দিতে পারে। বিভাজন আরও গভীর হওয়ার বদলে, সরকার তখন যেকোনো ভিন্নমতকে চিহ্নিত করে দমন করার অজুহাত পাবে। ফলে তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এক জটিল কৌশলগত সংকটে পড়েছেন। তারা যদি আক্রমণ চালায়, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। আবার আক্রমণ না করলে ইরান এই অবকাশকে ব্যবহার করে নিজেকে পুনর্গঠনের সময় পায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কৌশলের ভেতরে কেবল টিকে থাকার চেয়েও শক্তিশালী একটি গোপন লক্ষ্য লুকিয়ে আছে। নিয়ন্ত্রিত মাত্রার বিশৃঙ্খলা বজায় রেখে তেহরান কার্যত নিষ্ক্রিয়তার ভার নিজের কাঁধ থেকে তেল আবিবের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে যে ইসরায়েল ছিল সর্বক্ষণ সতর্ক ও উদ্যোগী অবস্থানে, এখন তারা কৌশলগত বিভ্রান্তিতে নেমে এসেছে। এই বিভ্রান্তি শুধু ইসরায়েলি হামলা বিলম্বিত করছে না, বরং তেহরানের জন্য হামলার উদ্যোগ নেওয়ার একটি সুযোগও খুলে দিচ্ছে।ইরানের এই বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বেশ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন বিষয়টিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ২ জানুয়ারি ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, 'ইরান যদি শান্তিকামী বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে'।৫ জানুয়ারি তিনি আবারও তেহরানকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দেন। ইরানের শাসকদের কাছে এই ধরনের ভাষা সরাসরি ইরাক বা আফগানিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি গত জুনে ইরান-ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধের পরপরই শুরু হয়েছে। যুদ্ধের সময় জনগণের মধ্যে যে সংহতি দেখা গিয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অভাবে দ্রুতই বিলীন হয়ে গেছে।হাসান রুহানি এবং মোহাম্মদ খাতামির মতো সাবেক প্রেসিডেন্টরাও এই শাসনতান্ত্রিক সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ইরানের এই বিক্ষোভ সম্ভবত এখনই সরকারের পতন ঘটাবে না, আবার এটি কেবল সাময়িক কোনো অস্থিরতাও নয়। যুদ্ধ- পরবর্তী হতাশাজনক পরিস্থিতি, বাইরের হস্তক্ষেপ এবং সংস্কারের প্রতি অনাস্থা ইরানকে একটি অস্থির ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |