|
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে গভীর স্নায়ুচাপে ইউরোপ ও ন্যাটো
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে গভীর স্নায়ুচাপে ইউরোপ ও ন্যাটো ট্রাম্পের ইচ্ছার সঙ্গে ন্যাটোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব নানামুখী। যেমন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চান। আধা স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ। ডেনমার্ক ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এখন ট্রাম্প যদি সত্যিই গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে চান, তবে সেটা ন্যাটোর ওপর সরাসরি আঘাত হবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোটের সব সদস্যকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ করার আহ্বান জানায়। জোটের বেশির ভাগ সদস্য এখন এটা করছেন।ইউক্রেনের জন্য স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে আরও অগ্রগতি আনার লক্ষ্যে তথাকথিত 'কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং'-যার সদস্যদের বড় অংশই ইউরোপীয় নেতা-ফ্রান্সের প্যারিসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর একটি পরিকল্পনা নব্বই শতাংশ এগিয়ে গেছে-এমন জোরালো দাবি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। ফলে ওই বৈঠকে উপস্থিত কেউই আমেরিকানদের পাশে রাখার বিষয়টি ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাননি। প্যারিসের জাঁকজমকপূর্ণ বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ছিল সেই বড় অস্বস্তিকর বাস্তবতা; অস্বীকার করা যায় না এমন সমস্যা হলেও সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছিল। গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ-এর আয়তন জার্মানির ছয় গুণ। এটি আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত, তবে এটি ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড চান। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সেটি প্রয়োজন।প্যারিসের বৈঠকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া বহু নেতার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তিনি।ব্রিটেনেরও গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো-মিত্র তিনি। এই দেশগুলোর কোনোটিই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিরূপ করতে চায় না,। কিন্তু ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে থাকায় ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার ফাঁকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ ইউরোপের শক্তিধর ছয়টি দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেয়।বিবৃতিতে বলা হয়, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে মিলেই যৌথভাবে নিশ্চিত করতে হবে এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই।ডেনমার্ক যাতে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি না করে সেজন্য দেশটির প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, তারা গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে-সবই একতরফা, দ্বীপটি কেনার বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে। ইউরোপীয় নেতাদের জন্য ভীতিকর বার্তা হিসেবে হাজির হলো হোয়াইট হাউসের সেই বিবৃতি, যা প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, 'কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার সবসময়ই একটি বিকল্প'। এটি অবশ্য প্রথমবার নয় যে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে ইউরোপে-বন্ধ দরজার আড়ালে-অনেকে এই ধারণা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন। কিন্তু সপ্তাহান্তে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সামরিক হস্তক্ষেপের পর কেউ আর হাসছে না। অবদমিত হওয়ার ঝুঁকিতে ইউরোপ ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অভিপ্রায়কে গুরুত্ব দিতে হবে এবং ইউক্রেন, বৈঠক শেষ করে নেতারা সত্যিই গভীর উদ্বেগ নিয়ে বেরিয়ে যান। এখানে হাস্যকর যে বৈপরীত্য কাজ করছে তা হচ্ছে; বহিরাগত শক্তি রাশিয়ার আগ্রাসী ভূখণ্ডগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে ইউক্রেন নামের একটি ইউরোপীয় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্বসহ একাধিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রনেতা ট্রাম্প প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছেন। ঠিক সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র সার্বভৌম ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে তার প্রেসিডেন্টকে আটক করেছে এবং একই সঙ্গে আরেকটি ইউরোপীয় দেশের (ডেনমার্ক) সার্বভৌমত্বকে সক্রিয়ভাবে হুমকি দিয়ে চলেছে। ডেনমার্ক বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ যে ট্রান্সআটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোটের ওপর নির্ভর করে এসেছে সেটির ইতি ঘটবে। অনেকে মনে করিয়ে দিতে পারেন, ট্রাম্প কখনোই ন্যাটোর বড় ভক্ত ছিলেন না। গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে কোপেনহেগেন। দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির আওতায়, গ্রিনল্যান্ডে ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে-স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত সময়ে সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা থাকলেও এখন তা কমে প্রায় ২০০ জনে নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আর্কটিক নিরাপত্তা বিষয়ে নজরদারি শিথিল করার অভিযোগ ছিল যা এখন পর্যন্ত আছে। ডেনমার্কও সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষায় নৌযান, ড্রোন ও বিমানসহ ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ডেনমার্কের সঙ্গে কথা বলার কোনো আগ্রহই দেখায়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, গ্রিনল্যান্ড 'অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে আছে। চারদিকে রুশ ও চীনা জাহাজে ভরা। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে গ্রিনল্যান্ড আমাদের দরকার, আর ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না'। কিন্ত ডেনমার্ক এই শেষ বক্তব্যটি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা বলেছেন, 'এই পুরো পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিল-ট্রাম্পের মুখোমুখি হলে ইউরোপ মৌলিকভাবে কতটা দুর্বল'। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের সপ্তাহান্তের মন্তব্যের পর ডেনমার্কের নর্ডিক প্রতিবেশীরা দ্রুত মৌখিকভাবে পক্ষে দাঁড়ালেও, ইউরোপের তথাকথিত 'বিগ থ্রি'-লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিন-প্রথমে ছিল নীরব। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস আগেও একই কথা বলেছেন। কোপেনহেগেনের প্রতি সংহতি জানাতে ডিসেম্বর মাসে এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গ্রিনল্যান্ড সফর করেছিলেন। এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনার অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে, প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, 'কমান্ডার-ইন-চিফের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহার সবসময়ই একটি বিকল্প'। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের কামিল গঁদ বলেন, 'ডেনিশ সার্বভৌমত্বের পক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি অংশীদার দেশ এবং ন্যাটো মিত্র যুক্তরাজ্য-সবার একটি অভিন্ন বিবৃতি থাকলে সেটি ওয়াশিংটনের কাছে শক্তিশালী বার্তা পাঠাত'। আর এখানেই মূল সমস্যা। ট্রাম্পের সোজাসাপ্টা ভঙ্গি যেটিকে কেউ কেউ তার দমনমূলক কৌশল বলেন, সেটি ইউরোপীয় নেতাদের অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে ফেলেছে। গত বছর ট্রাম্প যখন ইইউ পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, ব্লকটি আত্মসম্মান গিলে প্রতিশোধ না নেওয়ার অঙ্গীকার করে।অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, মূল কারণ হলো ইউরোপ তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় যে মার্কিন সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল তা হারানোর আশঙ্কা ছিল। ট্রাম্পের মুখোমুখি হলে ইউরোপ মৌলিকভাবে কতটা দুর্বল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করছেন অনেকে।আর এখন গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক- যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইইউ দেশগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজন আছে। ফলে কোপেনহেগেনের পক্ষে সেই দেশগুলো কতটা ঝুঁকি নেবে তা নিয়েও দ্বিধা রয়েছে। কাজেই ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জুলিয়ান স্মিথ বলেছিলেন, এই পরিস্থিতি 'ইইউ ভেঙে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে' এবং একই সঙ্গে ন্যাটোর জন্যও এক অস্তিত্বগত সংকট। গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার টিম যা বলছে, ইউরোপের তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। এর মানে শুধু সংযমের আহ্বান নয়। ইউরোপের শীর্ষ শক্তিগুলো হয়তো জরুরি বিকল্প পরিকল্পনা শুরু করতে পারে। আসন্ন মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স ও দাভোসের মতো আন্তর্জাতিক ফোরাম-যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন-সেগুলোকে কীভাবে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানো যায় তা ভাবতে পারে এবং নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো সাহসী ও উদ্ভাবনী ধারণাও বিবেচনায় নিতে পারে। ভূগোলের কথায় ফিরলে, ডেনমার্ক ন্যাটোর ছোট সদস্যদের একটি-যদিও অত্যন্ত সক্রিয়। আর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর সবচেয়ে বড় শক্তিশালী সদস্য-অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে। এই মুহূর্তে ইউরোপে যে গভীর স্নায়ুচাপ বিরাজ করছে, তা এখন স্পষ্ট। ট্রাম্প তো ন্যাটোকে হুমকি দিয়ে বলেই রেখেছেন, যদি জোটের অন্য সদস্যরা নিজেদের হিস্যার চাঁদা না দেয়, তবে তিনি রাশিয়াকে ‘যা খুশি তা-ই’ করতে উৎসাহ দেবেন। ন্যাটোর জন্মের সময় কেউ হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি তাদের এ দিনও দেখতে হবে। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |