ডিজিটাল সুরক্ষা
ইমদাদ ইসলাম
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫২ পিএম

ডিজিটাল সুরক্ষা

ডিজিটাল সুরক্ষা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যাম একটি ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতারকচক্র তাদের প্রতারণার কৌশল প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করে। প্রতারকচক্র এখন ডিজিটাল মাধ্যম নানাভাবে ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে যাচ্ছে। গণমাধ্যম এসব সংবাদ আমরা প্রায়শই দেখতে পাই। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যম ব্যবহার করে নানা কৌশলে তারা অপরাধ করে চলছে। এইচএসসি পাশ সুজন তালুকদার আর আবিরা জাহান কলি দুজন মিলে প্রতারণার জাল পেতে ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত তারা। মঞ্জুর মোরশেদ নামে এক ধনাঢ্য ব্যক্তির সঙ্গে ২০১৮ সালে কলির ফেসবুকে পরিচয় হয়। এরপর থেকে কলি নানা কৌশলে প্রেমের ফাঁদে ফেলে মঞ্জুর মোরশেদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে যখন হুমকি দেয়, তখন মঞ্জুর মোরশেদ বুঝতে পারেন তিনি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর তিনি তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের গ্রেফতার করে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর একেক করে বেরিয়ে আসে তাদের প্রতারণার কাহিনি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের অষ্টম শ্রেণি পাশ সেন্টু দেবনাথ, নিজেকে প্রধান বিচারপতির পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে উল্লেখ করে মি. পলক এম নামে একটি ফেসবুক আইডি খোলে। বন্ধুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সে সুপ্রিমকোর্টের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত পোস্টও দিতেন। ফেসবুকে তার বন্ধু তালিকায় অধিকাংশই মেয়ে।

ফেসবুকে পরিচিত এক তরুণী ও তার দুই আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সেন্টু দেবনাথ। পরে ওই তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। দেশে প্রতিদিন এমন ঘটে যাওয়া অসংখ্য ডিজিটাল প্রতারণার কিছু ঘটনা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারি,আর অধিকাংশ আমরা জানতেও পারিনা। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এক জরিপে বলা হয়েছে, সাইবার অপরাধের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অন্য অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা,যা মোট সংগঠিত অপরাধের কম-বেশি এক চতুর্থাংশ। যৌন হয়রানিমূলক একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি/ভিডিও (পর্নোগ্রাফি) ব্যবহার করে হয়রানির পরিমাণ নয় শতাংশের বেশি। অপরাধীরা সব কিছু জেনে বুঝে পরিকল্পিতভাবে টাকা আয়ের লক্ষ্যে অপরাধ করছে। আর সাইবার স্পেস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞরা তাদের শিকারে পরিণত হচ্ছে। চাকরির নামে, অনলাইনে ব্যাবসা করার নামে প্রতারণা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। প্রবাসীদের টার্গেট করে ইমো আইডি হ্যাক করেও প্রতারণা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রতারণার শিকার অধিকাংশ মানুষই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে চায় না। তারা এটাকে ঝামেলা মনে করে। এ কারণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারে না। অনলাইন জুয়াও সমাজের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রতারণার ধরন যেমন বদলেছে, বেড়েছে মাত্রাও। দেশে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ভয়ংকর সব প্রতারণা হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারক ও প্রতারণার অভিনব সব কৌশল। বদলে যাচ্ছে প্রতারণার ধরনেও। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোনে ওৎ পেতে থাকা প্রতারকরা নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। প্রতারকরা কখনো জিনের বাদশা সেজে, কখনো ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণা করছে। আবার কখনো রাইড শেয়ারিংসহ নানা কৌশলে প্রতারণা করা হচ্ছে। অনেকে সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ করছেন না। ফলে অনেক ঘটনা থেকে যাচ্ছে অজানা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অবস্থাটা এমন দাড়িছে যেন প্রতি এক গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে একেকজন প্রতারক। তারা বলছেন, এদের খপ্পর থেকে দূরে থাকার একমাত্র মাধ্যম সচেতনতা। পাশাপাশি লোভের ফাঁদে পা না দেওয়ারও পরামর্শ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, অনলাইন প্রতারণার সাধারণ ধরনগুলো হচ্ছে; ফিশিং আক্রমণ, ফেক ই-কমার্স স্ক্যাম, অনলাইনে আয়ের নামে প্রতারণা, অনলাইন গেম ও ক্যাসিনো, ইনভেস্টমেন্ট স্ক্যাম, অনলাইন ব্ল্যাকমেইলিং ইত্যাদি। প্রতারকরা বিভিন্ন ব্যাংক বা সংস্থার নামে ফেক ই- মেইল বা মেসেজ পাঠিয়ে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস বা পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেয়। সেই মেসেজে তারা কোনো লিংকে ক্লিক করতে বলে, যেখানে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড নম্বর ইত্যাদি চাওয়া হয়। সেই লিংকে ক্লিক করে তথ্য দিলেই প্রতারকেরা সেই তথ্য ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা বা অন্যকোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। 

বিভিন্ন ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটে বাজার মূল্যের থেকে কম মূল্যে আকর্ষণীয় অফার দিয়ে প্রতারণা করা হয়। পণ্য কিনে টাকা পরিশোধের পর সেই পণ্য আর হাতে আসে না অথবা নিম্নমানের পণ্য পাঠানো হয়। এ ধরনের ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটে ব্র্যান্ডেড পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেয়, কিন্তু তাদের ক্যাশ অন ডেলিভারি অপশন এবং তাদের পণ্যে রিভিউ বা কাস্টমার ফিডব্যাক থাকে না।

সমাজে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা বিভিন্ন লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব দিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে। প্রতারকরা বিভিন্ন পরিচিত কোম্পানির নামে ফেক চাকরির বিজ্ঞাপন দেয় এবং চাকরির আবেদন করার সময় রেজিস্ট্রেশন ফি এর নামে টাকা নেয়। সাধারণত ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমেইলে প্রথমে যোগাযোগ করে পরে কিছু তথ্য নিয়ে অনলাইন আয়ের জন্য লোভ দেখায়। প্রথম দিকে খুবই সাধারণ কিছু কাজ, যেমন কোনো ফেসবুক পেজে লাইক দেওয়া বা কোনো গ্রুপে জয়েন করলে ১০০-২০০ টাকা দেবে। বিশ্বাস অর্জন করে পরে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কৌশলে বিভিন্ন নামে টাকা চায়। অনেকে লোভ করে প্রতারককে টাকা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়। 

জুয়া শব্দটি প্রতারকরা বলে না। প্রতারকরা সাধারণত বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া বা তাদের পেইড এজেন্টদের মাধ্যমে সহজে অনলাইন গেম খেলে নিশ্চিত আয় করার সুযোগ রয়েছে মর্মে চটকদার প্রচারণা চালায়। এ ধরনের অনলাইন গেম এমনভাবে ডিজাইন করা যাতে ইউজারদের দীর্ঘ মেয়াদে তাদের সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়। প্রথমে সামান্য টাকা আয় করলেও পরবর্তীতে এই লোভ থেকে ইউজার আর বের হতে পারে না, অনলাইন গেম তাদের জীবন ধ্বংস করে দেয়।

প্রতারকরা খুব কম সময়ে টাকা বিনিয়োগ করে বেশি লাভের লোভ দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকায়। কয়েক দিনে বা মাসে টাকা দ্বিগুণ করবে, বিভিন্ন স্কিম ও প্ল্যানে বিনিয়োগ করলে খুব তাড়াতাড়ি অনেক টাকা লাভ হবে এসব বলে ও দেখিয়ে মানুষকে ঠকায়। এ ছাড়েও আজকাল ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়েও অনেক প্রতারণা হচ্ছে। প্রতারকরা নিজেদের তৈরি ফেক ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারকরা ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করে, এছাড়া বিভিন্ন এডিটিং সফটওয়্যার বা এআই ব্যবহার করে নিকট পরিচিত মানুষদের আপত্তিকর অডিও-ভিডিও পাঠিয়ে প্রতারণা করে। এ প্রতারকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডেটিং অ্যাপে প্রথমে ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্রতারণা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতি। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হলেও নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় অনেকেই সহজেই প্রতারকদের ফাঁদে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকার মানুষ, প্রবাসী শ্রমিক এবং নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতারকরা এসব দুর্বলতাকে পুঁজি করেই কৌশলে নিজেদের জাল বিস্তার করছে। 
 
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সাইবার অপরাধ দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও বাস্তবতা হলো—ভুক্তভোগীদের অভিযোগ না করার প্রবণতা বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই সামাজিক সম্মানহানি বা আইনি জটিলতার ভয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা গোপন রাখেন। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভুক্তভোগীবান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা, দ্রুত আইনি সহায়তা এবং গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা না গেলে ডিজিটাল প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
 
মূলত ডিজিটাল প্রতারকরা মানুষের অসচেতন ও লোভকে পুঁজি করে প্রতারণা করে। সাধারণত সহজ-সরল এবং ডিজিটাল সাক্ষরতাহীন মানুষই প্রতারকদের প্রধান টার্গেট। ডিজিটাল প্রতারণা থেকে রক্ষা পাওয়ায় জন্য সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই। একটু সচেতনতা এবং বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করে প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতারণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।কোনো প্রকার লোভের বসবতি হয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কারো সাথে কোনো প্রকার পাসওয়ার্ড শেয়ার করা যাবে না। অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কারো সাথে কোনো লেনদেন করার পূর্বে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।  
 
ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি অসচেতন ব্যবহারে তা ভয়াবহ বিপদের কারণও হয়ে উঠছে। ডিজিটাল প্রতারণা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে নয়, ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম—সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন ব্যবহারই পারে এই নীরব অপরাধযজ্ঞ থেকে সমাজকে রক্ষা করতে।


লেখক: তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা, 
খাদ্য মন্ত্রণালয়। পিআইডি ফিচার


ডেল্টা টাইমস্/ইমদাদ ইসলাম/আইইউ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]