|
উন্নয়ন, অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম সোপান নির্বাচন
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() উন্নয়ন, অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম সোপান নির্বাচন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য নয়, কেবল যেন শুধু প্রচারের জন্য। আমরা সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এত কিছু চাই না। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে আমরা শুধু একটু শান্তি চাই। দেশে দেশে শান্তির অর্থের রকমফের আছে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে শান্তি মানে অর্থনীতি ভালো থাকা।সেখানে অর্থই শান্তির চাবি।আবার ফিলিস্তিনিদের কাছে শান্তি মানে যুদ্ধ বন্ধ। বাংলাদেশের জনগণের কাছে শান্তির মানে খুবই সহজ এবং ছোট্ট। এ দেশের মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। এ দেশে মানসম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই। পরিশ্রম করে এমন উপার্জন করতে চাই যা দিয়ে কারও কাছে হাত না পেতে চলা যায়। যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি চায় এ দেশের মানুষ। অথবা নিজের মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী বাধাহীনভাবে নিজের ব্যবসা করতে চায়। দেশে এখন প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য মিলিয়ে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশ পেরিয়ে গেছে। গত দেড় বছরে বেকার মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। অনেকে চাকরি হারিয়েছে।যারা বেকার,তারা অধিকাংশই তরুণ। এরা প্রাণশক্তিতে ভরপুর। কিন্তু দীর্ঘ বেকারত্ব এদের মেধা ও উদ্যম গ্রাস করে ফেলেছে। এদের অনেকে হতাশ হয়ে বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। এসব বেকার তরুণ শুধু একটা চাকরি চায়। এটাই তাদের জন্য শান্তির ঠিকানা। বাংলাদেশে গত দেড় বছরে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই নানান বাস্তবতায় তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নির্ভয়ে এবং নিরাপদে ব্যবসা করতে চান। দেশের বড় বেসরকারি উদ্যোক্তারাই অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাঁরাও এক কঠিন সময় অতিক্রম করছেন। বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ চান তাঁরা।তাঁরা চান নিরাপত্তা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ। একজন শিল্প উদ্যোক্তা চান ভাবনাহীনভাবে কাজ করতে, তিনি যেন প্রতিহিংসার শিকার না হন। এটাই তাঁর শান্তির ঠিকানা। এ দেশের সাধারণ মানুষ চায় সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যায় নিশ্চিন্তে ঘরে ফিরতে। পথে যেন সে মবের শিকার না হয়। তার চলার পথ রুদ্ধ করে যেন আন্দোলনের নামে হয়রানি না করা হয়। সে চায় রাতে নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে ঘুমাতে। একজন গৃহিণী চান তাঁর বাজেটের মধ্যে যেন সংসারের জিনিসপত্র কিনতে পারেন। বাজারে গিয়ে যেন পণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দিশাহারা না হন। বাজেটের মধ্যে জিনিসপত্রের মূল্য থাকাটাই তাঁর কাছে চরম শান্তির। একজন মা চান তাঁর সন্তান যেন মানসম্মত শিক্ষা পায়। সন্ত্রাস, উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে যেন তাঁর সন্তানের শিক্ষাজীবন ব্যাহত না হয়। শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতায় তাঁর সন্তান যেন অকালে ঝরে না যায়। সন্তানকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারাটাই একজন অভিভাবকের পরম শান্তি।একজন অসুস্থ মানুষের একমাত্র চাওয়া সুচিকিৎসা। তিনি যেন সরকারি কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে প্রতারিত না হন। আমাদের দেশের মানুষের চাহিদা খুবই সামান্য। দুই বেলা ঠিকমতো খেতে পারলে, নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারলে, আয় অনুযায়ী চলতে পারলে এ দেশের মানুষ মহাখুশি। পৃথিবীর খুব কম দেশের মানুষ এত অল্পতে সন্তুষ্ট থাকে। এ দেশের মানুষ সামান্য আনন্দ প্রাণ ভরে উপভোগ করে। একটু ভালোবাসা পেলে তার জন্য জীবন উৎসর্গ করে। প্রচন্ড আবেগ আর ভালোবাসা এ দেশের মানুষের প্রাণশক্তি। তাই এ দেশের মানুষকে খুশি করা খুব সহজ। তারা আর কিছু চায় না, একটু শান্তি চায়। তাই আগামী নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে এত আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতি দরকার নেই। সবাই মিলে একটি শান্তির বাংলাদেশ গড়ে তুলুন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরানোই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। আসন্ন নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তাই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়,সেজন্য রাজনৈতিক দল,সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হচ্ছে গণতন্ত্র।গণতন্ত্র হচ্ছে সুশাসন, উন্নয়ন, অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার অন্যতম সোপান। গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজের মানুষের তথা রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নির্বাচনপ্রক্রিয়া হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি সর্বজন স্বীকৃত রীতি ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভোট প্রদানের মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এর মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন ঘটে এবং সরকার পরিবর্তন হয়। বিগত দিনে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যার কারণে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য অবাধ,সুষ্ঠু,নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনগণের ন্যায্য অধিকার, আকাঙ্ক্ষা পূরণসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থে এই নির্বাচনে করণীয় হচ্ছে: নির্বাচনকালীন প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করা ও তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার প্রদান করা; ভোট গ্রহণের আগে বিভিন্ন বুথে খালি বাক্স সরবরাহের পর অবশিষ্ট শূন্য ব্যালট বাক্সসমূহ যদি থাকে, এমন নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে, যাতে তা প্রার্থী অথবা নির্বাচনি এজেন্ট অথবা পোলিং এজেন্টদের কাছে দৃশ্যমান থাকা নিশ্চিত হয়; ভোট চলাকালে ব্যালট বাক্স পরিপূর্ণ হয়ে গেলে ব্যালট ভর্তি বাক্স বা বাক্সগুলো সংশ্লিষ্ট বুথেই রাখা, যাতে তা সংশ্লিষ্ট সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং নির্বাচনি এজেন্ট এবং অথবা পোলিং এজেন্টদের নিকট দৃশ্যমান থাকে; ভোট শেষে ব্যালট গণনার জন্য কেবল ভোট গ্রহণে ব্যবহৃত ব্যালট বাক্সসমূহ খোলা এবং প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক স্বাক্ষরিত ফলাফল শিট ভোট কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে হস্তান্তর না করে কেউ যেন ভোট কেন্দ্র ত্যাগ না করে তা নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রের মূল শক্তি একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। ১২-ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। জাতি আশা করছে, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদ ও সরকার গঠিত হওয়ার পর আমরা একটি সুস্থির গণতান্ত্রিক সমাজ পাব। এবারের সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী ছাড়াও আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিক্ষক, চিকিৎসক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, কৃষক, গৃহিণীসহ অন্য পেশাজীবীরা প্রার্থী হওয়ায় সংসদে তারাও যেতে পারেন এবং যাওয়াই উচিত। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঝুঁকিটা পেশায় নয়। ঝুঁকিটা হলো যারা সংসদ সদস্য হবেন তাদের মানসিকতায়। যদি কোনো সংসদ সদস্য তাঁর পেশার স্বার্থ, নিজের বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের সুবিধাকেই ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থ’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে সমস্যাটা থেকেই যায়। কারণ সংসদ সদস্যের কাজ কোনো নির্দিষ্ট এলাকা, অঞ্চল বা পেশাগোষ্ঠীর স্বার্থ দেখা নয়। তাঁর দায়িত্ব হলো ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় এমন আইন প্রণয়ন করা, যা পুরো দেশ ও জনগণের জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতে কোথাও একই ধরনের বৈষম্য দেখা দিলে সেই আইন দিয়েই সমাধানের পথ তৈরি করা।এই প্রশ্নগুলোই ভোটারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশ ও জনগণের চাহিদাকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে সক্ষম হবেন কিনা-এ বিবেচনাই হওয়া উচিত ভোট দেওয়ার মূল মানদণ্ড। সেটা প্রার্থীর বেড়ে ওঠা, তাঁর বিগত দিনের কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ধনী-গরিব বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য হলো, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সুনাগরিক হিসেবে সমাজে প্রার্থী ও তাঁর নিজের এবং বৃহত্তর পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপনের ধরন কী রকম, সেটা দেখা ও বিবেচনায় নেওয়া। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা বদলের দিন নয়। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের সুযোগ। সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্র রক্ষার দায় কোনো একক পক্ষের নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনকালীন সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ-সবার সম্মিলিত ও ন্যায়ানুগ উদ্যোগেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। বিভাজনের রাজনীতি নয়, গণতান্ত্রিক নীতির প্রশ্নে এক সুরে অবস্থান নেওয়াই আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ গণতন্ত্র দুর্বল হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়, আর গণতন্ত্র সুদৃঢ় হলে রাষ্ট্র শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সামনের নির্বাচন সেই সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-যা হারানোর নয়, বরং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করাই আজকের প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |