আজান এর মাধ্যমে ঐক্যের আহ্বান
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৫৩ এএম আপডেট: ২০.০১.২০২৬ ১০:৫৯ এএম

আজান এর মাধ্যমে ঐক্যের আহ্বান

আজান এর মাধ্যমে ঐক্যের আহ্বান

ইসলামে প্রতি ওয়াক্তে এবং জুমার নামাজে যোগ দেওয়ার জন্য মুসল্লিদের নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আহ্বান জানানো হয়। এবং আজান নামাজ পড়ার সেই আহ্বান। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,‘আর তোমরা যখন নামাজের জন্য ডাকো, তখন তারা তাকে হাসি-তামাশা ও খেলার জিনিস বলে নেয়।’ (সূরা মায়িদা : ৫৮) প্রার্থনার জন্য আহ্বান করতে খ্রিষ্টানরা ঘণ্টা বা কাঠের বাজনা ব্যবহার করে। ইহুদিরা শিঙা ফুঁকত। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) মদিনায় আজানের প্রবর্তন করেন। ইসলামে প্রথম মুয়াজ্জিন ছিলেন বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ)। ইসলাম ধর্মে প্রতিদিন পাঁচবার নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়।
আজান কেমন করে এলো :

আবু উমাইর ইবনে আনাস (রাঃ) বরাতে তার এক আনসারি চাচার বর্ণনা করা হাদিস আছে। তিনি বলেন, নবী (সাঃ) নামাজের জন্য লোকদের কীভাবে একত্র করা যায়, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তা দেখে কেউ পরামর্শ দিলেন, নামাজের সময় হলে একটা পতাকা ওড়ানো হোক। সেটা দেখে একে অন্যকে সংবাদ জানিয়ে দেবে। রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর কাছে সেটা পছন্দ হলো না। কেউ প্রস্তাব করলেন, ইহুদিদের মতো শিঙা ধ্বনি দেওয়া হোক। তিনি সেটিও পছন্দ করলেন না। কারণ, রীতিটি ছিল ইহুদিদের। কেউ ঘণ্টা ধ্বনি ব্যবহারের প্রস্তাব করলে তিনি বলেন, ‘ওটা খ্রিষ্টানদের রীতি।’ আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদ (রাঃ) বিষয়টি নিয়ে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)এর চিন্তার কথা মাথায় নিয়ে চলে গেলেন। এরপর (আল্লাহর পক্ষ থেকে) স্বপ্নে তাকে আজান শিখিয়ে দেওয়া হলো। পরদিন ভোরে তিনি রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এর কাছে গিয়ে বিষয়টি জানিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল,আমি কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। এমন সময় এক আগন্তুক এসে আমাকে আজান শিক্ষা দিলেন।’ একইভাবে ওমর খাত্তাব (রাঃ) ২০ দিন আগেই স্বপ্নযোগে আজান শিখেছিলেন। কিন্তু তিনি তা গোপন রেখেছিলেন। এরপর (আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদের স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলার পর) তিনিও তার স্বপ্নের কথা নবী (সাঃ)কে জানালেন। নবী (সাঃ)বললেন, ‘তুমি আগে বললে না কেন?’ ওমর খাত্তাব (রাঃ)বললেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদ এ নিয়ে আমার আগেই বলে দিয়েছেন। এ জন্য আমি লজ্জিত।’ রাসুলাল্লাহ (সাঃ)বললেন, ‘বিলাল, ওঠো। আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদ তোমাকে যেভাবে নির্দেশ দেয়, তুমি তা-ই করো।’ এরপর বিলাল (রাঃ)আজান দিলেন। আবু বিশর বলেন, ‘আবু উমাইর (রাঃ) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আনসারদের ধারণা-আবদুল্লাহ ইবনে জায়িদ (রাঃ) ওই দিন অসুস্থ না থাকলে রাসুলাল্লাহ (সাঃ) তাকেই মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৮)

আজান কখন দেয়া হয়?
আজানের ইতিহাস শুরু হয় মদিনায় হিজরতের পর (৬২২ খ্রিস্টাব্দ),প্রথম মুয়াজ্জিন হিসেবে হযরত বিলাল (রাঃ)প্রথম আজান দেন এবং পরবর্তীতে মক্কা বিজয়ের পর কাবা শরীফের ছাদ থেকে আজান দেন।

আজানের প্রচলন ও বিস্তার :

● প্রথম আজান: মদিনায় মসজিদে নববীতে প্রথম আজান দেন হযরত বিলাল (রাঃ)।
● কাবা থেকে আজান: মক্কা বিজয়ের পর (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ), বিলাল (রাঃ)-ই প্রথম কাবা শরীফের উপর থেকে আজান দিয়েছিলেন।
● আজানের শব্দগুলো (যেমন: আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) প্রায় ১৪০০ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে একই ভাষায় উচ্চারিত হয়ে আসছে, যা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

আজান দিনে পাঁচবার দেয়া হয় :

১. ফজর : ভোরে, সূর্যোদয়ের আগে।
২.যোহার : দুপুরে, সূর্য যখন মধ্যগগনে থাকে।
৩.আসর : বিকেলে, সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে।
৪. মাগরিব : সন্ধ্যায়, সূর্যাস্তের পর।
৫. ইশা : রাতে, সন্ধ্যার পর।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য ছাড়াও আজান দেওয়া হয় বিভিন্ন সময়ে, যেমন :

১. জুমার নামাজের জন্য : শুক্রবারে জুমার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, যা সাধারণত যোহার এর সময়ে হয়।
২. ঈদের নামাজের জন্য : ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, যা সাধারণত সকালের দিকে হয়।
৩. জানাজার নামাজের জন্য : মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয় না, তবে ঘোষণা করা হয়।
৪.সেহরির সময় : রমজান মাসে সেহরির সময় আজান দেওয়া হয়, যা ফজরের নামাজের আগে হয়।
৫.ইফতারের সময় : রমজান মাসে ইফতারের সময় আজান দেওয়া হয়, যা মাগরিবের নামাজের সময় হয়।
৬.বিশেষ ঘটনা বা দুর্যোগের সময় : কখনও কখনও বিশেষ ঘটনা বা দুর্যোগের সময় আজান দেওয়া হয়, যেমন ভূমিকম্প বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়।

এছাড়াও, কিছু মসজিদে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য আজান দেওয়া হয়, যা সাধারণত রাতের শেষ ভাগে হয়। তবে, এটি সব মসজিদে প্রচলিত নয়। সাধারণত, আজান দেওয়া হয় নামাজের সময় হওয়ার ১৫-৩০ মিনিট আগে, যাতে মুসুল্লিরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন। আজান শুধু নামাজের আহ্বানই নয়-এর প্রতিটি বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও অলৌকিক ব্যাখ্যা।

 আজানের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অলৌকিক ব্যাখ্যা :

১.    আল্লাহু আকবার (৪ বার)
অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
অলৌকিক দিক : মানুষের মনে দিনে হাজারো ভয়, চিন্তা ও ব্যস্ততা আসে। আজান শুরুতেই ৪ বার বলা হয়Ñযেন হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায় যে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহ।

২.    আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (২ বার)
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
অলৌকিক দিক : এটি মানুষের আত্মাকে শিরক ও অহংকার থেকে মুক্ত করে এবং একত্ববাদে স্থির রাখে।

৩.    আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (২ বার)
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মোহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল
অলৌকিক দিক : এখানে বোঝানো হয়েছে-আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর সঠিক পথ শুধু রাসূল (সা.)-এর অনুসরণ।

৪.    হাইয়া আলাস সালাহ (২ বার)
অর্থ: নামাজের দিকে এসো।
অলৌকিক দিক : নামাজ শুধু ইবাদত নয়-এটি মানুষের মানসিক শান্তি ও শৃঙ্খলার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা।

৫.    হাইয়া আলাল ফালাহ (২ বার)
অর্থ: সফলতার দিকে এসো।
অলৌকিক দিক : দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা নামাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছেÑএখানে সেটিই ঘোষণা করা হয়।

৬.    আল্লাহু আকবার (২ বার)
অর্থ: আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
অলৌকিক দিক : নামাজের পথে যাওয়ার আগে আবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়Ñসব কাজের চেয়ে আল্লাহ মহান।

৭.    লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (১ বার)
অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
অলৌকিক দিক : আজানের শেষ বাক্যও তাওহিদÑযেন জীবন শুরু ও শেষ হয় আল্লাহর একত্বে।

আজানের জবাব :

আজান শুনলে মুসলমানরা আজানের জবাব দেয়, যা আজানের শব্দাবলীর অনুরূপ, তবে "হাইয়া আলাস সালাহ" এবং "হাইয়া আলাল ফালাহ" এর জবাবে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই) বলা হয়।

বৈজ্ঞানিক দিক (চিন্তার খোরাক) :

●  আজান মানুষের মস্তিষ্কে আলফা ওয়েভ তৈরি করে, যা মানসিক চাপ কমায়।
●  আজান শুনলে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়।
●  এটি প্রাকৃতিকভাবে মেডিটেশনের মতো কাজ করে।

আধ্যাত্মিক বিস্ময় :

●    আজান বাতাসে ভেসে ফেরেশতারা সাক্ষী হন।
●    আজানদানকারী কিয়ামতের দিন দীর্ঘ গলা বিশিষ্ট হবেন।
●    মানুষ, জিন, পশু-সবাই আজানের সাক্ষ্য দেবে।

আজান কেবল শব্দ নয় এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদিনের ডাকে দেওয়া এক অলৌকিক আমন্ত্রণ। যে কান দিয়ে আজান শোনে, সে কান কখনোই নিঃসঙ্গ থাকে না।

লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]