|
এলো প্রাণের ভাষার মাস
রেহানা ফেরদৌসী
|
![]() এলো প্রাণের ভাষার মাস ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস: সাতচল্লিশের দেশ ভাগ থেকেই উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের। উত্তাল করে তুলেছিল গোটা দেশ-রাজপথ। উর্দুর দাবিকে অগ্রাহ্য করে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীব্র স্লোগানে কেঁপে উঠেছিল আকাশ-বাতাস। প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল ভাষার মর্যাদা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে ভারতবর্ষ এবং পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে ভাষা সমস্যা। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু সম্মেলনে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ঘোষণা দেন, ‘পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু’। তার সঙ্গে সুর মেলান আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন। তখনও ভাগ হয়নি দেশ। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি ও মুসলিম লিগের সভাপতি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভায় বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ পরবর্তীতে কার্জন হলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলার পর কয়েকজন ছাত্র ‘না’ ‘না’ বলে চিৎকার করে প্রতিবাদ করেছিলেন, যা জিন্নাহকে অপ্রস্তুত করেছিল। এ ঘটনার পর জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপিও দিয়েছিল একদল ছাত্র। এতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। সেই থেকে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন। দীর্ঘ এ আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে চলতে থাকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। প্রতিবাদ করেন বরেণ্য বাঙালি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। মনিঅর্ডার ফর্ম, পোস্ট কার্ড, খাম ও কাগজের মুদ্রা থেকে বাদ যায় বাংলা। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে বাঙালি। বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন ক্রমে দানা বেঁধে ওঠে। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনের প্রথম সূত্রপাত করে তমদ্দুন মজলিস। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুসংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে নিহত হন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরো অনেকে। তাদের এ আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা। অবশেষে ৫৪ সালের ৯ মে গণপরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলা। সেই থেকে বাংলা হয়ে ওঠে বাঙালির গর্বের ভাষা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের কর্মসূচি: ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই মাস ব্যাপী বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ইত্যাদি কর্মসূচির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনাকে স্মরণ করা হবে। রক্তের সিঁড়ি বেয়ে রচিত হয়েছিল ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জনের এক অমোঘ ইতিহাস। বাংলা ভাষা পেয়েছিল বাঙালির মাতৃভাষার মর্যাদা। সে পথ ধরেই এসেছিল গণঅভ্যুত্থান, স্বাধিকার আন্দোলন ও সর্বশেষ প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। বাঙালি চৌহদ্দী পেরিয়ে ফেব্রুয়ারি এক দিন পৌঁছায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বাঙালির কাছে এ মাস ভাষার মাস, দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস। তাই বাঙালি জাতি পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ভালোবাসা জানায় ভাষা শহীদদের প্রতি। বাংলাভাষী মানুষের নিজ ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা, বিশ্বের সব জাতিগোষ্ঠীকে এনে দেয় নিজ মুখের ভাষায় কথা বলার অধিকার। সাদা-কালোয়, শোকে-আনন্দে, চিৎকার করে কথা বলার মাস প্রাণের ভাষায়, মায়ের ভাষায়। মুখে নিয়ে প্রাণের বর্ণমালা, গল্পে উচ্চারণে গানে, ফেব্রুয়ারি আলোকিত হয়ে উঠবে স্বমহিমায়, গৌরবে, আনন্দে। চলনে বলনে বাঙালি নতুন করে শপথ নেবে ভাষার মর্যাদা রক্ষায়, শুদ্ধ করে বাংলা উচ্চারণের। কেননা ভাষার জন্য এমন রক্তক্ষরণ, প্রাণের এমন অর্ঘ্য কে, কবে, কোথায় দিয়েছে বিশ্বে! লেখক: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ডেল্টা টাইমস্/রেহানা ফেরদৌসী/আইইউ |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |