শবে বরাত: রহমতের রাতে মাগফেরাতের প্রার্থনা
রেহানা ফেরদৌসী
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৮ পিএম

শবে বরাত: রহমতের রাতে মাগফেরাতের প্রার্থনা

শবে বরাত: রহমতের রাতে মাগফেরাতের প্রার্থনা

শবে বরাত (লাইলাতুল বরাত) শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী পবিত্র রজনী, যা ইসলামের ইতিহাসে সৌভাগ্যের রাত হিসেবে গণ্য। শবে বরাত ফার্সি ‘শব’=রাত, ‘বরাত’=ভাগ্য। এই রাতে আল্লাহ পাক তার বান্দাদের গুনাহ মাফ করেন, রিজিক নির্ধারণ করেন এবং ভাগ্য লিখে দেন। এই রাতে তওবা, নফল নামাজ ও পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। এই রাতে ইবাদত-বন্দেগী ও দিনে রোজা রাখার ফজিলত রয়েছে, যেখানে আগামী বছরের রিজিক ও হায়াত লিপিবদ্ধ হয় বলে বর্ণিত আছে।

শবে বরাতের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট:
* ঐতিহাসিক উৎপত্তি: ইসলামি গবেষণা অনুযায়ী, নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শাবান মাসের ১৪ তারিখ রাতে নফল নামাজ ও কবরস্থান জিয়ারত করতেন, যা থেকে এই রাতের গুরুত্ব তৈরি হয়।
* হাদিসের বর্ণনা: বিভিন্ন হাদিসে অর্ধ-শাবানের (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন বলে বর্ণিত হয়েছে।
* তাৎপর্য: এটি মূলত 'লাইলাতুল বরাত' বা মুক্তির রাত। এ রাতে নফল ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত, জিকির এবং পরদিন রোজা রাখার বিশেষ প্রথা চালু রয়েছে।
* উপমহাদেশের সংস্কৃতি: বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এই রাতটি অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশের সাথে পালিত হয়, যেখানে মসজিদে ইবাদত এবং ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি বিতরণের প্রথা দীর্ঘদিনের পুরনো।
* ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে এটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ হলেও সৌদি আরবে এই রাতের বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নেই, তবে শিয়া মাজহাব একে ইমাম মাহদির জন্ম রাত হিসেবে পালন করেন।

পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা আদ-দুখানের ১-৪ নং আয়াতে বর্ণিত 'লাইলাতুম মুবারাকা' বা বরকতময় রাতকে শবে বরাত বা শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাত হিসেবে তাফসীর করা হয়েছে ।
কোরআনের আয়াত (সূরা আদ-দুখান, ৪৪:১-৪):
১. হা-মীম।
২. শপথ স্পষ্ট কিতাবের,
৩. আমি একে (কোরআন) এক মুবারক বা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।
৪. এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় (তাকদির বা ভাগ্য) ফয়সালা করা হয়।

ব্যাখ্যা ও প্রেক্ষাপট:

* অনেকে এই 'লাইলাতুম মুবারাকা' (বরকতময় রাত) দ্বারা রমজান মাসের লাইলাতুল কদরকে বুঝিয়েছেন।
* আবার অনেকেই মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যখন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়।

শবে বরাতের মাহাত্ব্য ও তাৎপর্য:

* এই রাতে আল্লাহ তাআলা মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া তার সৃষ্টির প্রতি মনোযোগ দেন এবং অসংখ্য মানুষকে মাফ করে দেন।
* শবে বরাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা হয়, যেখানে আগামী এক বছরের রিজিক ও ভাগ্য নির্ধারিত হয়।
* রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এই রাতে ইবাদত করার এবং পরের দিন (১৫ই শাবান) রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
* এই রাত নিজের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ।

হাদিস ও ফজিলত:

* ক্ষমা ও রহমত: হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, "পনেরো শাবানের রাত যখন আসে, তখন তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব"।
* শবে বরাতের ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবান এর রাতে তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন"
* আমল: হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, "এটা হলো অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন"।
* রিজিক ও হায়াত লিখন: নবী করিম (সা.) বলেছেন, এ রাতে আগামী এক বছরের রিজিক ও হায়াত লিপিবদ্ধ করা হয় এবং আমলগুলো আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয়।
* শর্ত: মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করা হয়।

শবে বরাতে বর্জনীয় বিষয়:

শয়তান মানুষকে এই রাতে নেক আমল থেকে বিরত রাখার জন্য কিছু কুসংস্কারের প্রচলন ঘটিয়েছে। কিছু মানুষ এগুলোকে নেক কাজ মনে করে শুধু বিভ্রান্তই হচ্ছে। এ জাতীয় কিছু কুসংস্কারমূলক কাজ হলো-
১. আতশবাজী, পটকা ইত্যাদি ফুটানো ও তারাবাতি জ্বালানো।
২. মসজিদ, ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ও অন্যান্য জায়গায় আলোকসজ্জা করা। এসব অপচয়ের শামিল। তাছাড়া এটি অন্য ধর্মীয় উৎসবের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার কারণে অবশ্যই পরিত্যাজ্য ও বর্জনীয়। হাদীস শরীফে এসেছে- "রাসূল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে।"
৩. রসনা বিলাসী হয়ে, রান্নার পেছনে সময়, অর্থ এবং শ্রম ব্যয় করে ক্লান্ত হয়ে এ রাতের তাওবা-ইত্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি করার ধৈর্য্য ও ইচ্ছা কমে যায় ।

সুতরাং এগুলোও পরিহার করা আবশ্যক। এ রাতে আনুষ্ঠানিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ বর্জন করে নিবিড়ভাবে নফল ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা উচিৎ, যাতে আমরা বরকতপূর্ণ রাতের বরকত লাভে ধন্য হয়ে আল্লাহর সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।

শবে বরাত হলো আল্লাহর রহমত পাওয়ার এবং গুনাহ থেকে মুক্তি লাভের একটি বিশেষ রাত। মহান রব আপনি, আমি সহ পৃথিবীর সকল মুসলিম উম্মাহ কে এ রাতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে, একাগ্রতার সাথে তার ইবাদত করার তৌফিক দান করুন এবং কবুল করুন...আমীন।

লেখক: সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


ডেল্টা টাইমস্/রেহানা ফেরদৌসী/আইইউ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]