নির্বাচন এলেই বিদেশিদের আনাগোনা কেন বেড়ে যায়
রায়হান আহমেদ তপাদার:
প্রকাশ: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:১৪ এএম

নির্বাচন এলেই বিদেশিদের আনাগোনা কেন বেড়ে যায়

নির্বাচন এলেই বিদেশিদের আনাগোনা কেন বেড়ে যায়

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। আর মাত্র কয়েক পরই বাংলাদেশে ভোট। ইতোমধ্যে এই ভোটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নড়াচড়া দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ওদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে বাংলাদেশ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ ততই বাড়ছে। ভারত, চীনের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্র দুটি নির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বললেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর কূটনীতিকরা এটি নিয়ে সরব রয়েছে। ক্রমেই ভোটের আলাপ জোরালো হচ্ছে কূটনীতিক মহলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় ধরনের বিভাজন আছে। আর বিগত কয়েক দশকে নির্বাচন এলে এই বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। আর এই সময়ে বিভাজনকে কেন্দ্র করে বিদেশি কূটনীতিকদের একধরনের ভূমিকা পালন করতে ও দেখা যায়। তারা তখন বেশি মাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠেন।বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিরা বিভাজিত রাজনীতির মেরুকরণে তাদের তৎপরতাকে ব্যবহার করতে চায়। আর বিরোধীদের তৈরি করে দেয়া এই সুযোগটাকে কাজে লাগান এসব কূটনীতিক। বিরোধীদের তৈরি করে দেওয়া বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালান। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা কতগুলো পদক্ষেপ নেন। কিছু কথাবার্তাও বলে থাকেন। আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা, তাই কূটনীতিকদের এই ভূমিকা আবার দেখা যাচ্ছে। তারা কিছু কথাবার্তা বলছেন, তৎপরতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা জানি, নির্বাচনের আগে অনেক কিছুই এখানে হবে। অনেক কিছুই ঘটবে। এগুলো নিয়ে চিন্তার কিছু দেখছি না। বিদেশিরা নিজেদের স্বার্থ বেশি দেখেন। তাদের নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য যদি ঠিক থাকে, তাহলে তারাও চুপ হয়ে থাকবেন। তারা নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখে সম্পর্ক তৈরি করেন।

একটি দেশ যখন কথা বলবে, অন্য দেশ কেন মেনে নেবে? স্বাভাবিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের ইস্যুতে বক্তব্য দিচ্ছে; রাশিয়াও পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছে। কারণ, পৃথিবী আর আগের মতো নেই। এগুলো নতুন কিছু নয়। তবে দেশের অর্থনীতি, অর্থনীতির কাঠামো যদি ভালো হয়, বিদেশিরা এমন সুযোগ নিতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা দেশগুলো কিন্তু অনেক দেশের অগণতান্ত্রিক সরকারের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকে। সেসব দেশের সরকারদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কথা বলে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে আমরা প্যালেস্টাইনকে দেখতে পাই। সেখানে ইসরায়েল সরকারের দখলদারিত্ব, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কিন্তু পশ্চিমারা এখনো নিশ্চুপ রয়েছে। বরং তাদের প্রচ্ছন্ন মদতে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি এসব অগণতান্ত্রিক নিপীড়নের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যখন দাবি জানিয়ে আসছে যে, প্যালেস্টাইনে গণহত্যার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে, তখনো পশ্চিমাদের ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকছে। পশ্চিমা দেশগুলো যদি এতই গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকত, তাহলে ইসরায়েলের প্রতি তাদের এই সমর্থন অব্যাহত থাকছে কেন। আমরা এটাও দেখেছি, আফগানিস্তানে তারা ২০ বছর ধরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখলেও কোনো গণতান্ত্রিক কাঠামো সেখানে তৈরি হয়নি। মিসরে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার জন্য তারা সেনা পরিচালিত সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। এ রকম একাধিক উদাহরণ থেকে দেখা যায়, সেখানে গণতন্ত্র বা মাবাধিকারের বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। সুতরাং তাদের ভূমিকা কতটুকু গণতন্ত্রের সপক্ষে থাকে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। মুল কথা হচ্ছে, আমাদের দেশের রাজনীতির বিভাজন যত দিন থাকবে, তত দিন এসব বিষয় থাকবে। কিন্তু এতে গণতন্ত্রের কী লাভ হবে, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। এদিকে চীন রাজনৈতিক বিষয়ে পশ্চিমা কূটনীতিকদের তৎপরতাকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ মনে করছে।

চীন কোনো দলের পক্ষে নয় রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে যায়। তাই কোনো দল ক্ষমতায় থাকল, না থাকল সেটি তাদের বিষয় নয়।ঠিক একইকথা খাটে ভারতের হাইকমিশনারের বিষয়েও। এখন পর্যন্ত হাইকমিশনারের মুখ থেকে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ আলোচনায় আসেনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই বেড়ে যায় বাংলাদেশের রাজনীতি আর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকসহ প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বড় দলগুলোর যোগাযোগ। কখনো কখনো তাদের উৎসাহী অবস্থান কূটনীতিকদের নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়েও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র।এবারের বিশেষত্ব বড় কূটনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে মেরুকরণ। কারণ ইতোমধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আবার পশ্চিমা দেশগুলোর বিপরীতে থাকা চীনের রাষ্ট্রদূত ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে কারও অধিকার নেই বলে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবার এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে দেশের যে অবস্থান, চীন তা সমর্থন করে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ আছে কিনা? দেশের অনেক রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটে এবং বিশেষ করে নির্বাচনের আগে। বিশ্লেষকদের অনেকে আবার নির্বাচনের আগে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতাকে হস্তক্ষেপ বলতে রাজি নন। তারা মনে করেন, নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকায় তা মেটাতে বিদেশি কূটনীতিকেরা একধরনের চাপ তৈরির চেষ্টা করেন। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়ী করেন বিশ্লেষকেরা।

এ ছাড়া বিদেশিদের বক্তব্য যদি কোনো দলের বিপক্ষে যায়, তখন সেই দল সেটিকে চাপ এমনকি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে থাকে। ফলে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বিদেশি কূটনীতিকদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকেরা বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছেন। আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ যেন নিশ্চিত করা যায়-এমন বক্তব্য দিচ্ছেন পশ্চিমা কূটনীতিকেরা। যদিও বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের ক্ষেত্রে এবার প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনীতিকদের অনেকের বক্তব্যে কোনো না কোনো পক্ষে তাদের অবস্থান প্রকাশ পাচ্ছে। সে কারণেই বিদেশি হস্তক্ষেপ বা চাপের বিষয় নিয়ে এবার বেশি আলোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের এমন স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকলেও তারা নির্বাচনের আগে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতাকে হস্তক্ষেপ বলতে রাজি নয়। এ ব্যাপারে তারা একমত বলে মনে হয়েছে। যদিও দেশের কোনো বিষয়ে এমনকি জাতীয় অনেক ইস্যুতেও দুই দলের একমত হওয়ার নজির খুব কম। তবে বর্তমান বিশ্বরাজনীতির কারণে বাংলাদেশে বিদেশি কূটনীতিকেরা ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ নিচ্ছেন কিনা, এই প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেশের ন্যূনতম কোনো ইস্যুতেও ঐকমত্য নেই। দেশের বড় রাজনৈতিক দলের এই বিরোধের সুযোগ নিয়ে প্রভাবশালী দেশগুলো বিভিন্ন সময় অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলে থাকে; আর নির্বাচনের আগে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে বিদেশিদের তৎপরতার বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন কূটনীতিকরা। 

যদিও বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। বাংলাদেশে যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ আছে, সেই পটভূমিতে এই বিশ্বে এক দেশ অন্য দেশের অংশীদার হিসেবে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে। এটি যেমন কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ; আবার উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও তারা কথা বলে থাকে। তবে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা এখনো প্রতিষ্ঠা করা যায়নি বিধায় বিদেশিরা এমন সুযোগ নিচ্ছেন বা পাচ্ছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের কারণে বিদেশিদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ যত দিন জিইয়ে থাকবে এবং নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারবেন না; তত দিন অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের কথা বলার বা চাপ সৃষ্টির সুযোগ থেকে যাবে। রাজনৈতিক বড় দলেরও এর সঙ্গে দ্বিমত থাকার কথা নয়। তারা কি কখনো সমাধানের পথে হাঁটবেন-সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। নির্বাচন এলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা নিজেরাই সক্রিয় হয়ে ওঠেন; আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও তাদের সক্রিয় করে তোলার উপাদান জোগান দেয়। বিদেশি কূটনীতিকদের উন্মুক্ত তৎপরতা এখনো চলছে, ভবিষ্যতেও চলতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস নিয়ে নানা মন্তব্য করেন বিদেশি কূটনীতিকরা। তবে বাস্তবে দেশের রাজনৈতিক দুর্বলতা কূটনীতিকদের তৎপরতা বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়। আমাদের দেশের রাজনীতিতে যতদিন পর্যন্ত সুস্থ ধারা ফিরে না আসবে, ততদিন বিদেশিদের নাক গলানোর প্রবণতাও দূর হবে না। এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বড় দুর্বলতা যে, আমরা নিজেদের নাক কেটেও পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে চাই।রাজনীতিবিদরা নিজেরা নিজেদের শুধরে না নিলে বিদেশিদের আনাগোনা কখনোই বন্ধ হবে না। আর তাতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বই ভালো কিছু হবে না। তাই সময় থাকতে সময়ের মূল্য দিতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য।

ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]