|
আসছে নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় হোক
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() আসছে নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় হোক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, যা কোনো কারণে ব্যাহত হলে দেশ পুনরায় আওয়ামী যুগের তমসায় আচ্ছন্ন হবে। তবে বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস অতটা সুখের নয়। ব্রিটিশ শাসকরা যেমন উপমহাদেশে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি গ্রহণ করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি রেখা টেনে নিরাপদে ভারত শাসন করেছিল, সেই একই ধারায় আওয়ামী লীগ ‘একাত্তরের চেতনা’কে পুঁজি করে বাংলাদেশের জনগণের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে আওয়ামী দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে চেষ্টা করেছিল। শেখ হাসিনার সাড়ে পনেরো বছর টিকে থাকার মূলমন্ত্রই ছিল তাঁর ও তাঁর দলের ‘একাত্তরের চেতনা’। একাত্তরের চেতনা দিয়ে আওয়ামী লীগ শুধু জামায়াতকে নয়, বিএনপিকেও আঘাত করেছিল। শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারম্যানের পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকার করতে চাননি। তাঁর মাজার অপসারণ করতে চেষ্টা করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর নির্মম নিপীড়ন চালিয়ে তাঁকে তিলে তিলে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ শেখ হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। সংবিধানের ভিত্তিতে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রমাণ করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায়ও এগিয়ে বাংলাদেশ। এখন সবার প্রত্যাশা সেই ‘গণতন্ত্র’ যার মানে জনগণের ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গের সমাবেশে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেন এইভাবে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত এবং জনগণের জন্য পরিচালিত সরকার’-যা যুগে যুগে নতুন শক্তি সঞ্চয় করে হয়েছে অজেয়, বিকল্পহীন এক ব্যবস্থা। সেই ধারায় এগিয়ে চলেছে উন্নয়ন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আসন্ন নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হামলা, সংঘর্ষ এবং ভাঙচুরের খবরে শঙ্কিত হওয়ার কারণ রয়েছে। কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা প্রমাণ করে যে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহনশীলতা ক্রমশ তলানিতে চলে যাচ্ছে। সম্মিলিতভাবে থামানো না গেলে নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসবে, ততই নির্বাচনী সহিংসতার তাণ্ডব বাড়বে এবং তা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েও যেতে পারে। এতে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রাপথ হবে বিঘ্নিত। সহিংসতার ভয়াবহতা যে প্রবল গণতান্ত্রিক সংকট তৈরি করে, তা অতীতে বারবার দেখা গেছে। সহিংসতায় গণতান্ত্রিক সুশাসন ও অংশগ্রহণ মূলক-অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন কলঙ্কিত হয়েছে। মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। নির্বাচনপূর্ব এবং পরবর্তী সহিংসতার রেশ ধরে চলেছে হিংসা ও বিদ্বেষ। রাজনীতির গতিপথ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে নিপতিত হয়ে হারিয়েছে সুস্থ ও স্বাভাবিক ধারা। সহিংসতার কারণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি বলতে গেলে বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে গিয়েছিল অতীতের দিনগুলোতে। বর্তমানেও যদি সেই অবক্ষয়ের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়, তা শুধু নির্বাচনই নয়, গণতান্ত্রিক আশাবাদের জন্যও বিপদের কারণ হবে।কিন্তু বাস্তবে, শক্তি, দাপট বা অস্ত্র নয়, গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো অবাধ ও ভীতিহীন পরিবেশে ভোটাধিকার, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি।অবাক করার বিষয় হলো, এই সারসত্য ভোটের আগে খুব কমই মান্য করা হয়। গণতান্ত্রিক যুক্তিবোধ ও সহনশীলতাও ঝাপসা হয়ে আসে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার উদগ্র উত্তেজনায়। যেকোনো মূল্যে বিজয়ী হওয়ার উন্মাদনা আচ্ছন্ন করে রাখে সমগ্র নির্বাচনী পরিবেশকে; যা ভোটার ও প্রতিপক্ষের নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে। নির্বাচনী সহিংসতার ভীতিকর, সংকুল ও নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এক পক্ষ যদি আরেক পক্ষকে দমন ও নস্যাৎ করতে চায়, তাহলে ভোটাররা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে মতামত প্রয়োগে বাধাগ্রস্ত হতে পারেন। সহিংসতার আবহে পেশিশক্তির দাপটে জনমত হতে পারে ভূলুণ্ঠিত। তা ছাড়া, যখন ব্যালটের বদলে লাঠি আর পেশিশক্তি প্রধান হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্রের পরাজয় ঘটে। ফলে নির্বাচনপূর্ব সংঘর্ষগুলো কেবল রাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং ক্ষমতার দাপট দেখানোর ও শক্তি প্রদর্শনের মহড়া। এটি কোনোভাবেই একটি সুস্থ ধারার নির্বাচনের লক্ষণ এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত হতে পারে না। যদিও খবর পাওয়া গেছে যে,অনেক স্থানে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে, কিন্তু কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। যারা সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করেছে বা প্রচারণায় হামলা চালিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, এই সন্ত্রাস দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে এবং দিন দিন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বিশেষত, রাজনৈতিক দলগুলো যদি শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায়ে সচেষ্ট ও সক্রিয় না হয়, তাহলে অবনতিশীল পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি আশা করা যায় না। এজন্য আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলগুলোর সবচেয়ে বড় দায়িত্বশীলতা হবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহিংসতা বর্জন করা। রাজনৈতিক সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে প্রথাগত নিরাপত্তার ঝুঁকি ও ভোটারদের সামনে বিপদ তৈরি না করা।দলীয় কর্মীদের সহিংস আন্দোলনের প্রশিক্ষণ না দেয়া এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। ভুয়া খবর রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মনিটরিং সেল থাকতে হবে; যাতে সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় ও গুজবের কারণে সংঘাত ছড়িয়ে না পড়ে। নির্বাচন কোনো যুদ্ধ নয়, এটি জনমতের প্রতিফলন ঘটানোর একটি উৎসব। রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, সন্ত্রাস ও দাপট দিয়ে ক্ষমতা দখল করা গেলেও জনগণের হৃদয় জয় করা যায় না। যখন পুরো জাতি চায় একটি সংঘাতমুক্ত, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, তখন বুলেটের চেয়ে ব্যালটের শক্তি বেশি হতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে জনমত ও ব্যালটের শক্তি বিজয়ী হলেই গণতান্ত্রিক রূপান্তর সফলতা লাভ করবে। তা না হলে, নির্বাচনী সহিংসতা গণতন্ত্রের যাত্রাপথকে রুদ্ধ করতে পারে। যা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য বড় বিপদ ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন রেখেই উন্নতির নতুন সোপানে উন্নীত হবে। দেশের কল্যাণে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার জন্য এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথ মসৃণ ও গতিশীল হবে। গণতন্ত্রের বিজয় সুনিশ্চিত হবে, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |