|
জাতীয় স্বার্থের মানসিকতা পোষণ করাই রাজনীতি
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() জাতীয় স্বার্থের মানসিকতা পোষণ করাই রাজনীতি একাত্তরে অল্প সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে তখনকার বাঙালি কূটনীতিবিদদেরও ভূমিকা ছিল। তাঁরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন দেশের পাকিস্তানি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশন থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে দক্ষ কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। আধুনিক যুগে বৈদেশিক সম্পর্ক চাট্টিখানি বিষয় নয়। সম্রাট আকবরের সময় অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো-মন্দে বিশেষ কিছু আসত-যেত না। কূটনীতি একালে এক কঠিন বিষয়। ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কই হোক বা বন্ধুপ্রতিম সম্পর্কই হোক, মনে করার কারণ নেই যে সবাই সব সময় ভাইয়ের মতো মমতা মাখানো বা বন্ধুর মতো অন্তরঙ্গ আচরণ করবে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে।বৈদেশিক সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর। আমি তোমাকে দেব, তুমি আমাকে দেবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থ। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রেম-প্রীতির ব্যাপার নয়; দেওয়া-নেওয়ার বিষয়; মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষার বিষয়।একটি দেশের চালিকাশক্তি রাজনীতি। মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়, রাষ্ট্রকে বিকশিত করে। নানান মত ও পথের পার্থক্য গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সবকিছুর অতি রাজনীতিকরণ দেশের ক্ষতি করে। জনগণকে করে বিভক্ত, উন্নয়ন করে বাধাগ্রস্ত। একটি রাষ্ট্রের কিছু বিষয় থাকে, যা রাজনীতির ঊর্ধ্বে দলমতনির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য। যারাই ক্ষমতায় আসুক এসব বিষয়ে কোনো পরিবর্তন হয় না। রাষ্ট্রের মৌলিক কিছু বিষয় আছে যা রাজনীতির বাইরে রাখা হয়।যেমন ব্যবসাবাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি। উদাহরণ হিসেবে বলাই যায়; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যিনিই প্রেসিডেন্ট হোন না কেন, মার্কিন-ইসরায়েল নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশে সংঘটিত গণ অভ্যুত্থানের পর কী হয়েছে? শ্রীলঙ্কায় গণ অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য সে দেশের ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে অন্তর্র্বর্তী সরকার। সে দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানান। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য সরকার এবং বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করে। শ্রীলঙ্কা শিক্ষা, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে রাজনীতি থেকে দূরে রেখে রাষ্ট্র সংস্কার করে। নেপালের গণ অভ্যুত্থানের পরও অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতির অঙ্কন যেন স্বাভাবিকভাবে চলে তা নিশ্চিত করা হয়েছে।সেদিক থেকে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারাই একটা করে নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। আগের শিক্ষানীতি বাতিল করেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে জাতি পাঁচটি শিক্ষানীতি পেয়েছে। ফলে শিক্ষাই আজ দিশাহারা। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন তারা তাদের সমর্থকদের দিয়ে ক্রীড়া সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছে। ক্রীড়াবোদ্ধা, সাবেক খেলোয়াড়দের বাদ দিয়ে ক্রীড়া সংগঠনগুলো হয়ে গেছে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে বসিয়েছে নিজের লোক। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তারা তাদের লোকদের অঢেল সম্পদের মালিক বানাতে চায়। টেন্ডার, তদবির বাণিজ্য করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাসীনদের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েন। ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য ছাড়া এ দেশে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদদের অনেকেই শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার সুযোগ খোঁজেন। ফলে ব্যবসাবাণিজ্যে রাজনীতিকরণ হয়। আমার লোক-তাদের লোকে বিভক্ত করা হয় ব্যবসায়ীদের। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় যখন একটা সরকার বিদায় নেয়, তখন শুরু হয় দোসর খোঁজার প্রতিযোগিতা! অথচ কেউ বিবেচনা করে না কেন, কোন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের সরকারের কাছে যেতে হতো। নানাভাবে তাঁকে হয়রানি করা হয়। এর ফলে ঝুঁকিতে পড়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার কর্মচারী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। সবচেয়ে বড় কথা, অর্থনীতির চাকা থেমে যায়।সামগ্রিকভাবে ক্ষতি হয় দেশের মানুষের। এ দুষ্টচক্রে বন্দি হয়ে আছে আমাদের বেসরকারি খাত। যে কারণে অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। শিল্পবাণিজ্যে শুধু নয়, আমাদের দেশে সর্বত্র চলে অতি রাজনীতিকরণ।ক্ষমতাসীনদের প্রিয়জন না হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হওয়া যায় না। আমলা থেকে চিকিৎসক, শিক্ষক থেকে সাংবাদিক সব পেশাজীবী দলীয় রাজনীতিতে বিভক্ত। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে অথবা ক্ষমতায় যেতে পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে বাধ্য করেন। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। রাজনীতিবিদদের কারণে ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আমলাতন্ত্র সবখানেই সৃষ্টি হচ্ছে বিভক্তি। দলীয়করণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসব পেশা। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে রাজনীতিতে। এটা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। একজন ব্যবসায়ীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসবে দেশের স্বার্থে তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেই হবে একজন ব্যবসায়ীর বা শিল্পপতির। এটা তিনি কোনো দলকে নন, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে সম্মান করছেন। এ কারণে যেন তিনি আগামীতে ভোগান্তির শিকার না হন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। কিন্তু এ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের কাছে জনগণের প্রত্যাশা তারা যেন অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখে। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক শুধু পেশাদার কূটনৈতিক কর্মকর্তা এবং বড় বড় পণ্ডিত ও রাজনৈতিক নেতাই ভালো বোঝেন তা নয়। দেশের সাধারণ মানুষও কম ডিপ্লোম্যাট নয়। একজন পানের দোকানি পর্যন্ত বোঝেন কোথায় দেশের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে আর কোথায় বিঘ্নিত হচ্ছে। কিন্তু তাঁর করার কিছু নেই। রাষ্ট্রের অর্থভান্ডার থেকে যাঁদের বেতন-ভাতা দিয়ে রাজার হালে রাখা হয়, তাঁরা যদি দেশের স্বার্থরক্ষায় অসমর্থ হন, তাহলে সাধারণ মানুষের হতাশা প্রকাশ ছাড়া করার কিছু থাকে না। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও আজ একধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের রাজনৈতিক ব্যাপারে হতাশার মধ্যে যোগ হয়েছে কূটনৈতিক বিষয়েও হতাশা। কূটনীতিকের কাজ জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ। বাংলাদেশের মতো দেশ সামরিক শক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারে না। সেটা তার কাম্যও নয়। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কোনো দেশই গানবোট ও ডিপ্লোমেসিতে যায় না।নতজানু না হয়েও সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানই শ্রেষ্ঠ পথ। দর-কষাকষি হবে বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশে, তবে নিজের অবস্থানে দৃঢ় থেকে। তার জন্য একজন কূটনীতিককে তাঁর দেশের রাজনৈতিক পলিসি শুধু নয়, জানতে হবে ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে। যে দেশে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, সে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে।বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা কেবল অস্ত্রের ভাষা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। এ কারণেই ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সুসংহতকরণের একটি সাংবিধানিক মুহূর্ত, যাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যুগুলোকে সমাধানের পথে নেওয়াও সম্ভব হতে পারবে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে প্রথাগত সামরিক শক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি ও জননিরাপত্তার মতো অপ্রথাগত বিষয়গুলোকেও নিশ্চিত করা জরুরি। এমনকি জাতীয় স্বার্থে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে উল্লেখযোগ্য খাতগুলো পরিচালিত হোক, তা হলেই দেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |