তৃতীয় লিঙ্গের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার ও প্রতিবন্ধকতা
রেহানা ফেরদৌসী:
প্রকাশ: রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

তৃতীয় লিঙ্গের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার ও প্রতিবন্ধকতা

তৃতীয় লিঙ্গের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার ও প্রতিবন্ধকতা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার হলেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের প্রতিকূলতা রয়েছে। সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ২৩৪ জন। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ সামাজিক অবহেলার ভয়ে পরিচয় গোপন করে ভোটার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। কাগজে-কলমে এ জনগোষ্ঠীর ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও মানসিক গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতিতে থমকে আছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভোটাধিকারের বাস্তবায়ন।

নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভূমিকা বর্তমানে ভোটাধিকার প্রয়োগ, প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ এবং প্রচারণায় সক্রিয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়ে উঠেছেন, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র নিশ্চিত করছে। তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। মূলত ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদের সভায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি হিজড়াদের পৃথক লিঙ্গীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ সময় উল্লেখ করা হয় যে, তারা শিক্ষাসহ অন্যান্য সব মৌলিক অধিকারে অগ্রাধিকার পাবে। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়, ‘সরকার বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করিয়া স্বীকৃতি প্রদান করিল’। ২০১৯ সালে হিজড়ারা স্বতন্ত্র লিঙ্গীয় পরিচয়ে ভোটাধিকার লাভ করে। এর আগে তারা নারী ও পুরুষ হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতেন।

এ নির্বাচনে লিঙ্গ কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে নজরুল ইসলাম ঋতু প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। এবারও তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী নির্বাচন করছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এই আনোয়ারা ইসলাম রানী। ওই নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের জয়লাভ করলেও তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হন রানী। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে এবারও ভোটের মাঠে রংপুর-৩ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তৃতীয় লিঙ্গের একমাত্র প্রতিনিধি আনোয়ারা ইসলাম রানী।

এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারণায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রামে এবার ১৬টি সংসদীয় আসনে ৬৯ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান। এ নিয়ে তাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই। এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের তৃতীয় লিঙ্গের ৫৬ জন ভোট দিয়েছিলেন। গতবারের চেয়ে এবার ১৩ জন ভোটার বেড়েছে। চট্টগ্রামে এবার মোট ভোটার ৬৫ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৬। এর মধ্যে পুরুষ ৩৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮১২ ও মহিলা ভোটার ৩১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৯৫। নোয়াখালীর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দুই হাজারের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বসবাস করলেও ভোটার তালিকায় তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নিবন্ধিত রয়েছেন মাত্র ১৪ জন। ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের জানানো হয়নি, আবার পরিচয়পত্র সংক্রান্ত জটিলতাও বড় বাধা। তবে ময়মনসিংহে তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয়ে এবার ভোট দেবেন ৪১ জন। যদিও জেলায় এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক শ।অর্থাৎ বাস্তবে সংখ্যা বেশি কিন্তু নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা কম।

নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সমাজের মূলধারায় যুক্ত হয়ে নিজেদের আইনগত ও সামাজিক অধিকারের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছেন। ইসির মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, ভোটকেন্দ্রে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের জন্য নেই আলাদা কোনো ব্যবস্থা, নেই নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ। ফলে নারী বা পুরুষের লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, বিদ্রƒপ ও মশকরার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই ভোট দিতে যেতে চান না। আইনি কাঠামো থাকার পরও শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভোটাধিকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় না। সংখ্যায় অল্প হলেও এই জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু এ অব্যবস্থাপনা তাদের ভোটাধিকারকে কার্যত নিরুৎসাহিত করছে।যার ফলে ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারান। এই মনোভাব শুধু একজনের নয়, একাধিক তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের মনোভাবও প্রায় একই।
তৃতীয় লিঙ্গের ভোট প্রদানে বাস্তবতা : তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত হলেও এর বাস্তব প্রয়োগে প্রশাসনিক উদাসীনতা বড় সমস্যা। তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বৈষম্যহীন পরিবেশ না থাকলে এই অধিকার কাগজেই থেকে যাবে। নির্বাচন কমিশন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ভোটার তালিকায় তাদের অন্তর্ভুক্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কেবল আইনগত স্বীকৃতি দিলেই হবে না, ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবে এই কাজ একা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সচেতনতা, সংবেদনশীল প্রশাসন ও বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণে বৈষম্যের এ চক্র ভাঙতে হবে। কেননা তৃতীয় লিঙ্গের অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সহ সম্পাদক,সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ডেল্টা টাইমস/রেহানা ফেরদৌসী/সিআর/এমই

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
  এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।

ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. জাহাঙ্গীর আলম, নির্বাহী সম্পাদক: মো. আমিনুর রহমান
প্রকাশক কর্তৃক ৩৭/২ জামান টাওয়ার (লেভেল ১৪), পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত
এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২১৯ ফকিরাপুল, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত।
ফোন: ০২-২২৬৬৩৯০১৮, ০২-৪৭১২০৮৬০, ০২-৪৭১২০৮৬২, ই-মেইল : [email protected], [email protected]