|
সঠিক গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে শক্তিশালী রাষ্ট্র
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
![]() সঠিক গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে শক্তিশালী রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হোঁচট খেলে বা সামরিক শাসনের মত পরিস্থিতি তৈরি হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রকাশ। জনগণ ভোটের মাধ্যমে ঠিক করে দেয় কে তাদের শাসন করবে, কোন নীতিতে দেশ পরিচালিত হবে এবং কোন আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। কিন্তু যখন এই প্রক্রিয়ায় অর্থ ও পেশিশক্তি প্রভাব বিস্তার করে, তখন নির্বাচন তার মৌলিক চরিত্র হারায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন বরাবরই সংবেদনশীল বিষয়।ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল জনগণের ভোটের অধিকার। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের আস্থা গভীর সংকটে পড়েছে।
ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, ভয়ভীতি, কালো টাকার অবাধ ব্যবহার এবং পেশিশক্তির দাপট নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বারবার। এতে মানুষের মধ্যে এই ধারণা জন্মেছে যে নির্বাচন আর তাদের জন্য নয়। অর্থের প্রভাব নির্বাচনকে একটি অসম প্রতিযোগিতায় পরিণত করে। একজন সৎ, যোগ্য ও জনসম্পৃক্ত প্রার্থী যদি বিপুল অর্থশক্তির অধিকারী না হন, তবে তিনি নির্বাচনী মাঠেই টিকে থাকতে পারেন না। পোস্টার, ব্যানার, প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, কর্মী ব্যবস্থাপনা- সবকিছুই আজ অর্থনির্ভর। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগেই অনেক যোগ্য মানুষ পিছিয়ে পড়েন। রাজনীতি ধীরে ধীরে একটি ব্যয়বহুল পেশায় পরিণত হয়, যেখানে আদর্শ নয়, অর্থই হয়ে ওঠে প্রধান শর্ত। এই অর্থনির্ভর রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। যাঁরা বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্বাচিত হন, তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। দুর্নীতি তখন আর বিচ্যুতি থাকে না, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়।সরকারি প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, নীতিনির্ধারণে জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় বাড়ে, বৈষম্য গভীর হয় এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। পেশিশক্তির ব্যবহার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরো ভীতিকর করে তোলে। ভোটকেন্দ্র দখল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং নির্বাচনী সহিংসতা ভোটাধিকারকে অর্থহীন করে দেয়। অনেকে ভোট দিতে গেলেই আতঙ্কে থাকেন, কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে যেতেই চান না। এমনকি কোথাও কোথাও ভোটার উপস্থিতি থাকলেও প্রকৃত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকে না। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন আর উৎসব মুখর থাকে না, পরিণত হয় আতঙ্কের দিনে।পেশিশক্তির দাপট রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে। এতে সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। বিরোধী মতকে দমন করাই রাজনৈতিক সাফল্যের প্রধান কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তরুণসমাজ রাজনীতিকে একটি সহিংস ও অনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। এতে রাজনীতিতে নতুন ও সৎ নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হয় এবং অপরাধপ্রবণতার বিস্তার ঘটে।অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন ছাড়া প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র গড়ে ওঠে না। সংসদ বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তখন প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারে না। আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণ সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী না হয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হয়। এর ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরো পিছিয়ে পড়ে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার দুর্বল হয়ে যায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থা রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তাদের ভোটের মূল্য আছে, তখন তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করে। নাগরিক দায়িত্ববোধ বাড়ে, আইন মানার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা আসে। বিপরীতে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ায়। অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পাশাপাশি কার্যকর ও নিরপেক্ষ হতে হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং কালো টাকার ব্যবহার দমনে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ছাড়া কোনো নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।রাজনৈতিক দলগুলোর দায়ও এখানে কম নয়।প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে অর্থ ও বাহুবলের বদলে যোগ্যতা, সততা ও জনগ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দলীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রচর্চা না হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। দলের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচন কখনোই অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত হবে না। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী অনিয়ম, সহিংসতা এবং অর্থের অপব্যবহার তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও সাহসী হতে হবে। নাগরিক সমাজকে ভোটারদের সচেতন করতে হবে, যাতে তাঁরা ভয় বা লোভের কাছে নিজেদের ভোট বিক্রি না করেন। সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। অর্থ ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচন কেবল একটি নৈতিক দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রশ্ন। উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো রাজনৈতিক বৈধতা। অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতই হোক, জনগণের সম্মতি না থাকলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে শক্তিশালী গণতন্ত্রের ওপর ভর করে।গণতন্ত্রের অপরিহার্যতা শুধু রাজনৈতিক কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক ন্যায়, মানবাধিকার এবং সাম্যের প্রতিফলন। সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, শ্রমিক ও কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ এসব দিক গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করে। গণতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক সংহতিও নিশ্চিত হয়। গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। এটি কেবল একটি কাঠামোগত প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সরকারের কার্যকারিতা এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা শক্তিশালী হবে এবং দেশের রাজনীতি হবে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ এবং জনগণের কল্যাণমুখী। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য। ডেল্টা টাইমস/রায়হান আহমেদ তপাদার/সিআর/এমই |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |